বাংলাদেশের প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ সাকিব আল হাসানের মাগুরার পৈতৃক বাড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ ও ভাঙচুরের ঘটনাকে ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বুধবার রাতে এই হামলার ঘটনা ঘটে। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ভারতে অনুষ্ঠিত শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল সাংবাদিক বৈঠকে অনলাইনে উপস্থিত হয়েছিলেন সাকিব। সেই ঘটনার পরপরই এই হামলা হওয়ায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলার অভিযোগ তুলেছে আওয়ামী লীগ।
দলীয় সূত্র এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বুধবার রাত প্রায় ৮টা ৪৫ মিনিট নাগাদ মাগুরা শহরের কেশবমোড় এলাকায় সাকিব আল হাসানের পৈতৃক বাড়ি লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা ছোড়া হয়। হামলাকারীরা বাড়ির একটি অংশে ভাঙচুরও চালায় বলে অভিযোগ। ঘটনাস্থলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগ তাদের সরকারি এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে দাবি করেছে, “বাংলাদেশের বিশ্বখ্যাত ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসানের বাড়িতে নৃশংস পেট্রোল বোমা হামলা হয়েছে। শেখ হাসিনার সাংবাদিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই ঘটনা ঘটেছে।” একই সঙ্গে দলটির অভিযোগ, সাংবাদিক বৈঠক সম্প্রচার বা প্রচার করলে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছিল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি-সহ বিরোধী শক্তিরা।
দলের বক্তব্য, এই হামলা কেবল একজন ক্রিকেটারের বাড়িতে হামলা নয়, বরং বিরোধী মত ও রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে ভয় দেখানোর একটি প্রচেষ্টা। আওয়ামী লীগ দাবি করেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের নেতা-কর্মী এবং সমর্থকদের ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলা ও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
যদিও বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী বা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) এই অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি। হামলার দায়ও এখনও পর্যন্ত কোনও সংগঠন স্বীকার করেনি। ফলে ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং হামলাকারীদের পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই গেছে।
সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সফল অলরাউন্ডার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিন দেশের প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতেও সক্রিয় হন। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মাগুরা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
বুধবার ভারতের নয়াদিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার (এফসিসিএসএ) উদ্যোগে আয়োজিত ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বক্তব্য রাখেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা এবং সমর্থকরা। শেখ হাসিনা সেই অনুষ্ঠানে আগামী ডিসেম্বর, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ‘বিজয়ের মাসে’, দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল বলেও দাবি করেন।
হাসিনার ওই বক্তব্যের পরই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে কড়া প্রতিক্রিয়া আসে। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ভারতে অবস্থানরত একজন দণ্ডিত ও পলাতক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া দুই দেশের সম্পর্কের জন্য অনুকূল নয়। এই ঘটনায় তারা ‘গভীর হতাশা’ প্রকাশ করে।
এই আবহেই সাকিব আল হাসানের বাড়িতে হামলার ঘটনায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রকাশ্যে যুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের বক্তব্য না আসা পর্যন্ত ঘটনাটির রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় সতর্ক থাকারও পরামর্শ দিচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা।
পুলিশ এখনও পর্যন্ত হামলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে কি না বা কোনও গ্রেপ্তার হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি। ফলে হামলার নেপথ্যের কারণ, পরিকল্পনাকারী এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক যোগসূত্র নিয়ে তদন্তের দিকেই এখন নজর থাকবে।