Home খবরবাংলাদেশ গ্রেপ্তার–কারাবাসের ভয় নেই, বাংলাদেশে ফিরব: দিল্লির ভাষণে শেখ হাসিনা

গ্রেপ্তার–কারাবাসের ভয় নেই, বাংলাদেশে ফিরব: দিল্লির ভাষণে শেখ হাসিনা

দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার অনুষ্ঠানে দেওয়া ভার্চুয়াল বক্তব্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
39 views 5 minutes read
A+A-
Reset

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বাংলাস্ফিয়ার: সম্ভাব্য গ্রেপ্তার, কারাবাস কিংবা আদালতের রায় কার্যকরের ঝুঁকি সত্ত্বেও বাংলাদেশে ফিরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশের মানুষ দুর্ভোগে থাকার সময় তিনি তাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে পারেন না।

শেখ হাসিনা বলেন, “আমি জানি, আমাকে আটক করা হতে পারে। কারাগারে পাঠানো হতে পারে। সাজানো মামলায় দেওয়া রায় কার্যকরের চেষ্টা করা হতে পারে। কিন্তু ভয় জনগণের প্রতি আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে না।”

দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ বক্তব্যে উল্লেখ না করলেও তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, “আমি জনগণকে বিশ্বাস করি, তাদের ভালোবাসি এবং তাদের কাছেই ফিরে যাব।”

জুলাই–আগস্টের আন্দোলন নিয়ে যা বললেন

বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের আন্দোলন এবং তার সরকারের পতনের ঘটনা নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

তার দাবি, কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনকে পরিকল্পিতভাবে সরকার পরিবর্তনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া হয়েছিল। প্রকৃত শিক্ষার্থীদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে সংগঠিত কয়েকটি গোষ্ঠী সহিংসতা ও প্রচারণার মাধ্যমে সাংবিধানিক ব্যবস্থার বাইরে ক্ষমতা দখলের পথ তৈরি করেছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তার সরকার কোটা ব্যবস্থা বাতিল করেছিল। ২০২৪ সালে আদালতের সিদ্ধান্তের পর সরকার আপিল করেছিল এবং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।

তিনি দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের গণভবনে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি তিনজন মন্ত্রী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। এরপরও কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে তার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে পরিণত করা হয়।

আন্দোলনের সময় বাংলাদেশ টেলিভিশন, সেতু ভবন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মেট্রোরেল স্টেশন, কারাগার, থানা, সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় এবং বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনাও বক্তব্যে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হত্যা, পুলিশ স্টেশনে হামলা এবং অস্ত্র লুটের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের জীবন ও সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব ছিল কি না।

তদন্ত বন্ধের অভিযোগ

শেখ হাসিনা বলেন, আন্দোলনে হতাহত এবং সহিংসতার ঘটনা তদন্তে তার সরকার ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল। পরে ১ আগস্ট কমিশনটি তিন সদস্যের করা হয়।

তবে সরকার পরিবর্তনের পর সেই তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তার ভাষায়, “তারা বিচার চায়নি, ক্ষমতা চেয়েছে। তারা তদন্ত চায়নি, প্রমাণ চাপা দিতে চেয়েছে।”

এই অভিযোগের পক্ষে বক্তব্যে কোনো নথি উপস্থাপন করেননি তিনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক রাজনৈতিক নিপীড়ন চলছে বলেও অভিযোগ করেন দলটির সভাপতি।

তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের হত্যা, গুম, গ্রেপ্তার এবং বাড়িছাড়া করা হচ্ছে। নারী কর্মীদের হেফাজতে নির্যাতন ও অপমানের শিকার হতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিচারক, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, পেশাজীবী, শ্রমিক, কৃষক, রিকশাচালক এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরাও হামলা ও মামলার শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেন শেখ হাসিনা।

বক্তব্যে তিনি হতাহত, গ্রেপ্তার, মামলা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তবে বাংলাস্ফিয়ারের পক্ষে এসব পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভাঙার প্রসঙ্গ

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাড়ি ও স্মৃতি জাদুঘর ভেঙে ফেলার ঘটনাকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “তারা মুক্তিযুদ্ধকে মুছে দিতে চায়। তারা বঙ্গবন্ধুকে মুছে দিতে চায়। যে ভিত্তির ওপর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তারা সেই ভিত্তির বিপরীতে দেশের ইতিহাস নতুন করে লিখতে চায়।”

মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ধ্বংস এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানের অভিযোগও তোলেন তিনি।

অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ

দেশের অর্থনীতি, শিল্প, কর্মসংস্থান, ব্যাংক খাত এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে বক্তব্যে দাবি করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে, খেলাপি ঋণ ও দারিদ্র্য বেড়েছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে এবং কয়েক শ শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

বিপরীতে নিজের সরকারের সময় পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, এসব প্রকল্প লোকদেখানো ছিল না; এগুলো দেশের সক্ষমতা তৈরির অংশ ছিল। সামাজিক কর্মসূচিগুলোও দাতব্য সহায়তা নয়, বরং মানুষের মর্যাদায় বিনিয়োগ ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান

বাংলাদেশের বর্তমান সংকট শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয় বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। তার মতে, এ পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, উন্নয়ন এবং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জনগণের পাশে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

যেসব দাবি জানালেন

বক্তব্যে শেখ হাসিনা কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন। সেগুলো হলো—

  • আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
  • রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি
  • রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা মামলা প্রত্যাহার
  • বাক্‌স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা
  • সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা
  • বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা
  • আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের পরিবর্তে জনগণের স্বার্থে পরিচালনা করা

এসব দাবি শুধু একটি দলের জন্য নয়; বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের পাশে দাঁড়াতে ফিরবেন

শেখ হাসিনা বলেন, তার দেশে ফেরা কিংবা আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্য শুধু রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া নয়।

তিনি বলেন, “এটি বাংলাদেশকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার বিষয়। উন্নয়ন, অগ্রগতি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও স্থিতিশীলতার পথে দেশকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়।”

১৯৭১ সালে বন্দিজীবন, ১৯৭৫ সালে পরিবারের সদস্যদের হারানো, ছয় বছরের নির্বাসন এবং বিভিন্ন সময়ে তাকে হত্যার প্রচেষ্টার প্রসঙ্গ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হিসাব তিনি অনেক আগেই পেছনে ফেলে এসেছেন।

নিজের ভবিষ্যতের চেয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন বলেও মন্তব্য করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী।

“জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগানের মধ্য দিয়ে বক্তব্য শেষ করেন তিনি।

প্রেক্ষাপট

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার প্রায় ১৫ বছরের টানা শাসনের অবসান ঘটে। এরপর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।

২০২৫ সালে জুলাই–আগস্টের আন্দোলন দমনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের একটি আদালত তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। শেখ হাসিনা অভিযোগ ও রায় প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles