সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের বক্তব্য— স্বাস্থ্য মন্ত্রক, এনএমসি-সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত; লক্ষ্য আরও নিরাপদ ও স্বচ্ছ পরীক্ষা ব্যবস্থা
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-ইউজি (NEET-UG)-কে ভবিষ্যতে কম্পিউটারভিত্তিক (Computer-Based Test বা CBT) পদ্ধতিতে আয়োজনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে কেন্দ্র। সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা হলফনামায় কেন্দ্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রক, ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন (NMC), ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কেন ভাবা হচ্ছে এই পরিবর্তন?
প্রতি বছর ২০ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থী নিট-ইউজি-তে অংশ নেন। সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল, ডেন্টাল এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিজ্ঞান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির একমাত্র প্রবেশদ্বার এই পরীক্ষা।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনিয়ম এবং পরীক্ষা পরিচালনা নিয়ে বিতর্কের জেরে পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার দাবি জোরালো হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটেই কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষা চালুর সম্ভাবনা গুরুত্ব পাচ্ছে।
কী বলেছে কেন্দ্র?
সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্র জানিয়েছে, পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে কোনও পরিবর্তন হঠাৎ করে কার্যকর করা হবে না। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ সংস্থার মতামত এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষার সুবিধা কী?
কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষা চালু হলে পরীক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট পরীক্ষাকেন্দ্রে কম্পিউটারে বসেই প্রশ্নের উত্তর দেবেন। এই পদ্ধতি ইতিমধ্যেই জেইই (মেইন), বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা এবং একাধিক আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
এর বড় সুবিধাগুলি হল—
- দ্রুত মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশ
- প্রশ্নপত্র ছাপানো, পরিবহণ ও সংরক্ষণের খরচ কমানো
- প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কমানো
- উন্নত ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করা
চ্যালেঞ্জও কম নয়
তবে এত বড় পরীক্ষাকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিয়ে যাওয়া সহজ হবে না।
দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় পর্যাপ্ত কম্পিউটার-সমৃদ্ধ পরীক্ষাকেন্দ্র তৈরি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
এছাড়া, গ্রামীণ বা আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের অনেক পরীক্ষার্থীর কম্পিউটার ব্যবহারের অভিজ্ঞতা সীমিত। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ব্যবস্থা চালু হলে আগে থেকেই মক টেস্ট, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো জরুরি।
শিফটভিত্তিক পরীক্ষা হলে কী হবে?
যদি ভবিষ্যতে পরীক্ষা একাধিক শিফটে নেওয়া হয়, তাহলে প্রতিটি শিফটের প্রশ্নপত্রের কঠিনতার পার্থক্য নিরপেক্ষভাবে সামঞ্জস্য করার জন্য শক্তিশালী নর্মালাইজেশন ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তা না হলে ফলাফল নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। তাই শুধু ডিজিটাল হওয়াই নয়, পরীক্ষার ন্যায্যতা ও মান বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এখনই কি বদলে যাচ্ছে পরীক্ষা?
না। কেন্দ্র স্পষ্ট জানিয়েছে, এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
২০১৬ সালে সর্বভারতীয় মেডিক্যাল প্রবেশিকা হিসেবে নিট চালু হওয়ার পর থেকে পরীক্ষা কাগজ-কলমে (Pen-and-Paper Mode) অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ভাষার সংখ্যা বৃদ্ধি, পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন এবং পরিচালন পদ্ধতিতে একাধিক সংস্কারের পর এবার কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষার সম্ভাবনা সেই ধারাবাহিকতারই নতুন অধ্যায় হতে পারে।
আপাতত পরীক্ষার্থীদের কী করা উচিত?
এখনই উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই। কারণ, কেন্দ্র জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত বিবেচনা করেই ভবিষ্যতের রূপরেখা চূড়ান্ত হবে।
তবে এতটুকু স্পষ্ট—আগামী দিনে ভারতের সবচেয়ে বড় প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলির অন্যতম নিট-ইউজি আরও স্বচ্ছ, নিরাপদ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দক্ষ করে তুলতেই কেন্দ্র বড় পরিবর্তনের পথে এগোতে চাইছে।