লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দরে উদ্ধার বিস্ফোরক-সংযুক্ত ড্রোন; ‘হাইব্রিড হামলা’-র আশঙ্কা, বিদেশি শক্তির সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা
জার্মানির লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দরে বিস্ফোরক-সংযুক্ত একটি ড্রোন উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডব্রিন্ট একে দেশের নিরাপত্তার জন্য ‘নতুন মাত্রার হুমকি’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এটি কোনও অপেশাদার কাজ নয়; বরং ‘হাইব্রিড হামলা’-র অংশ হতে পারে। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, এর নেপথ্যে কোনও বিদেশি শক্তির ভূমিকা রয়েছে কি না।
বুধবার সকালে ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্গো ও সামরিক পরিবহন কেন্দ্র লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় বিস্ফোরক বহনকারী একটি ছোট ড্রোন দেখতে পান এক কর্মী। খবর পেয়ে নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত এলাকা ঘিরে ফেলে এবং বোমা নিষ্ক্রিয়কারী রোবটের সাহায্যে বিস্ফোরকটি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করা হয়। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কয়েকটি বিমানকে অন্য বিমানবন্দরে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডব্রিন্ট বলেন, “প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে, এটি অপেশাদারদের কাজ নয়। এটি একটি পেশাদার ‘হাইব্রিড হুমকি’-র অংশ হতে পারে।” তাঁর মতে, উদ্দেশ্য ছিল জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করা।
ঘটনার কিছুক্ষণ পর একটি ডিএইচএল কার্গো বিমান অবতরণের চেষ্টা বাতিল করে পুনরায় আকাশে ওঠার সময় একটি অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তুর সঙ্গে ধাক্কা খায়। পরে বিমানটি নিরাপদে অন্য একটি বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানটির সামান্য ক্ষতি হলেও কেউ হতাহত হননি। তদন্তকারীরা এই ঘটনাকেও একই তদন্তের আওতায় এনেছেন।
যদিও জার্মান সরকার এখনও প্রকাশ্যে কোনও দেশের নাম উল্লেখ করেনি, তবু লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দর ন্যাটো, জার্মান সেনাবাহিনী এবং ইউক্রেনের আন্তোনভ এয়ারলাইন্সের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হওয়ায় সন্দেহের তির রাশিয়ার দিকেই ঘুরেছে। অতীতেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নাশকতা ও ড্রোন-সংক্রান্ত ঘটনার জন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, যদিও মস্কো সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তদন্তকারীদের দাবি, কার্গো পরিচালনা এলাকার দক্ষিণ রানওয়ের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে বিস্ফোরক-সংযুক্ত একটি কোয়াডকপ্টার ড্রোন পাওয়া যায়। একই সঙ্গে কার্গো বিমানের সঙ্গে অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তুর সংঘর্ষের ঘটনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জার্মান সংবাদমাধ্যমের দাবি, ড্রোনটি একটি ইউক্রেনীয় আন্তোনভ কার্গো বিমানের কাছাকাছি উদ্ধার করা হয়। ওই বিমানে ইউক্রেনের প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে ‘Be Brave Like Kherson’ এবং ‘Be Brave Like Bucha’-র মতো স্লোগান লেখা ছিল।
বিস্ফোরকের ধরন নিয়েও ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। বিল্ড পত্রিকার দাবি, এটি সার ও পেট্রোলের মিশ্রণে তৈরি হতে পারে। তবে এনডিআর, ডব্লিউডিআর এবং জ্যুডডয়চে জাইটুং-এর যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড্রোনটিতে পেন্টাএরিথ্রিটল টেট্রানাইট্রেট (PETN) ছিল, যা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক সেমটেক্স-এর অন্যতম উপাদান।
জার্মানিতে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ওলেক্সি মাকেইয়েভ সরাসরি রাশিয়াকেই দায়ী করে বলেছেন, “রাশিয়া ছাড়া আর কে হতে পারে?” তবে এ বিষয়ে এখনও ক্রেমলিনের কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
বিরোধী গ্রিন পার্টি-র নেতা কনস্টান্টিন ফন নটজ দ্রুত ও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, যদি কোনও রাষ্ট্রের জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে, তবে তা শুধু সন্ত্রাসবাদ নয়, ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
জার্মান সংসদের গোয়েন্দা তদারকি কমিটির চেয়ারম্যান মার্ক হেনরিখমান মনে করছেন, হামলার লক্ষ্য সম্ভবত ইউক্রেনকে সহায়তাকারী কোনও গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা বা অবকাঠামো। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
ঘটনার জেরে মায়োরকা থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী বিমান-সহ কয়েকটি উড়ান অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর বিমানবন্দরের উত্তরাংশে পরিষেবা স্বাভাবিক হলেও দক্ষিণ রানওয়ে বন্ধ রাখা হয়।
পুলিশ ও সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর জানিয়েছে, যাত্রী বা বিমানবন্দরের কর্মীদের জীবনের কোনও তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নেই এবং যাত্রীবাহী বিমান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে জার্মানি-সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি, বন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের ওপর রহস্যজনক ড্রোন ওড়ানোর একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এর কয়েকটির জন্য ইউরোপীয় দেশগুলি রুশ গোয়েন্দাদের দায়ী করলেও রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে সেই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে জার্মানি অন্যতম বড় সমর্থক। বার্লিনের অভিযোগ, তার জেরেই রাশিয়া জার্মানির বিরুদ্ধে নাশকতা, গুপ্তচরবৃত্তি এবং বিভ্রান্তিমূলক প্রচার চালাচ্ছে। ক্রেমলিন অবশ্য সেই অভিযোগও অস্বীকার করেছে।
এদিকে জার্মান সংবাদপত্র ডি জাইট-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জার্মান ড্রোন নির্মাতা সংস্থা ডোনাউস্টাল-এর প্রধান স্টেফান থুমান-এর ওপর হামলার ষড়যন্ত্র করেছিল রুশ গোয়েন্দারা। একইভাবে, ২০২৪ সালে জার্মান অস্ত্র প্রস্তুতকারক রাইনমেটাল-এর প্রধান নির্বাহী আরমিন পাপারগার-কে হত্যার একটি কথিত ষড়যন্ত্রও নস্যাৎ করা হয়েছিল বলে মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রে দাবি করা হয়। এসব অভিযোগও রাশিয়া অস্বীকার করেছে।