হাইলাইটস:

  • নরওয়ের ক্রীড়ানীতির মূলমন্ত্র—শৈশবে আনন্দ, বহুমুখী খেলাধুলা ও স্বাধীন পছন্দ।
  • নয় বছর বয়স পর্যন্ত নেই লিগ তালিকা, ট্রফি বা ফলাফলের প্রকাশ।
  • আর্লিং হালান্ড, মার্টিন ওডেগার্ডদের বেড়ে ওঠা ফুটবলের পাশাপাশি হ্যান্ডবল, স্কিইং ও অন্যান্য খেলায়।
  • ব্রাজিলের প্রতিভা-কেন্দ্রিক মডেলের বিপরীতে নরওয়ের ধৈর্যনির্ভর পদ্ধতি এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনায়।
  • ব্রাজিলকে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পর নরওয়ের সাফল্যের পেছনে এই দর্শনই বড় কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বাংলাস্ফিয়ার: পূর্ণ সময়ের বাঁশি বাজতেই যেন অঙ্ক মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। মাত্র ৫৫ লক্ষ মানুষের একটি দেশ, যারা ২৮ বছর পর আবার বিশ্বকাপে ফিরেছে, তারা কিনা পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেল।

ম্যাচ চলাকালীন একদিকে ছিল ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র-এর ক্ষিপ্র পায়ের জাদু, অন্যদিকে নরওয়ের এরলিং হালান্ডের অদম্য শক্তি। কিন্তু এই দুই দলের তারকাদের শৈশবের দিকে তাকালে একেবারে ভিন্ন এক গল্প সামনে আসে।

ব্রাজিলের নেইমার, ম্যাথিউস কুনহা কিংবা ভিনিসিয়ুস বেড়ে উঠেছেন এমন এক ব্যবস্থায়, যেখানে ছোটবেলাতেই প্রতিভা চিহ্নিত করে ফুটবল-কেন্দ্রিক প্রশিক্ষণে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে হালান্ড, মার্টিন ওডেগা আন্তোনিও নুসা বেড়ে উঠেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিবেশে।

২০০৭ সালে নরওয়ের জাতীয় ক্রীড়া সংস্থা নরওয়েজীয় অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিক কমিটি এবং কনফেডারেশন অব্ স্পোর্টস। শিশুদের খেলাধুলা নিয়ে তাদের নীতিমালাকে নতুনভাবে সাজায়। ১৯৮৭ সালে প্রণীত আটটি মৌলিক অধিকারের সংশোধিত সংস্করণে বলা হয়, প্রতিটি শিশুর খেলাধুলার অধিকার, নিরাপত্তা এবং আনন্দ নিশ্চিত করাই হবে মূল লক্ষ্য। নরওয়ের সব নিবন্ধিত ক্লাব ও প্রশিক্ষকের জন্য এই নিয়ম বাধ্যতামূলক।

এই নীতিমালার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো—নয় বছর বয়স পর্যন্ত কোনো লিগ তালিকা নেই, ফলাফলের প্রকাশ নেই, ট্রফি নেই। শিশুরা শুধু স্থানীয় ক্লাবের হয়ে খেলবে।

১১ বছর বয়সে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ মিললেও তখনও ফলাফল বা র‌্যাঙ্কিং প্রকাশ করা হয় না। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার অনুমতি মেলে ১৩ বছর বয়সের পর।

এই আটটি অধিকারের মধ্যে দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—এক, দক্ষতা অর্জনের আনন্দ; দুই, নিজের পছন্দমতো একাধিক খেলায় অংশ নেওয়ার স্বাধীনতা। অর্থাৎ কোনো শিশুকে খুব অল্প বয়সে একটি খেলার মধ্যে আটকে দেওয়া হবে না। বরং সে বিভিন্ন খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করবে এবং পরে নিজের পছন্দের খেলাটি বেছে নেবে।

এই নীতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ হালান্ড নিজেই। নিয়ম কার্যকর হওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। তাঁর বাবা, সাবেক ফুটবলার আলফ-ইঙ্গে হালান্ড জানিয়েছেন, পরবর্তী আট বছর হালান্ড ফুটবলের পাশাপাশি হ্যান্ডবল, অ্যাথলেটিক্স এবং ক্রস-কান্ট্রি স্কিইং খেলেছেন। এমনকি নরওয়ের হ্যান্ডবল সংস্থাও তাঁকে নিজেদের দলে নিতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু ১৪ বছর বয়সে তিনি শেষ পর্যন্ত ফুটবলকেই বেছে নেন।

আজ তাঁর খেলার ধরন দেখলেও সেই বহুমুখী শৈশবের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। হেড করতে উঠে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতায় যেন হ্যান্ডবলের লাফানোর অভ্যাস কাজ করে। আবার শটের শক্তি ও ভারসাম্যে ধরা পড়ে স্কিইং থেকে শেখা শরীরের কার্যকর ব্যবহার। অবশ্যই এগুলোর সঙ্গে পরবর্তী দীর্ঘ ফুটবল অনুশীলনের অবদানও রয়েছে, কিন্তু ছোটবেলার সেই অভিজ্ঞতা তাঁর শরীরে এখনও রয়ে গেছে বলেই মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

হালান্ডের সঙ্গী স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সোরলোথ-এর গল্পও একই রকম। ট্রন্ডহাইমে বড় হওয়ার সময় তিনি ফুটবলের পাশাপাশি হ্যান্ডবল ও স্পিড স্কেটিং খেলেছেন। তাঁর বাবা ছিলেন ১৯৯৪ বিশ্বকাপে নরওয়ের ফুটবলার, আর মা ছিলেন হ্যান্ডবল খেলোয়াড়। ফলে নরওয়ের দুই শক্তিশালী স্ট্রাইকারই ফুটবলে আসার আগে অন্য খেলার মাধ্যমে নিজেদের শরীর ও দক্ষতা গড়ে তুলেছেন।

নরওয়ের গোলরক্ষক ওরিয়ান নাইল্যান্ড অবশ্য এই নীতিমালার আওতায় বড় হননি। কারণ নিয়ম চালুর সময় তাঁর বয়স ছিল ১৭। তবুও ছোটবেলায় তিনিও ফুটবলের পাশাপাশি হ্যান্ডবল ও আলপাইন স্কিইং খেলেছেন।

ব্রাজিলের বিপক্ষে তাঁর পারফরম্যান্সে সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন যেন স্পষ্ট ছিল। পেনাল্টি ঠেকানোর সময় স্কিয়ারের মতো পাশের দিকে ঝাঁপ, আর পরে ক্রিস্টোফার আজেরের পায়ে লেগে দিক বদলানো বল অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে হ্যান্ডবল গোলরক্ষকের ক্ষিপ্রতা খুঁজে পাওয়া যায়।

এই গল্প মূলত ধৈর্যের গল্প। এমন একটি দেশের গল্প, যারা শৈশবকে প্রতিযোগিতার চাপে নষ্ট না করে খেলাধুলার আনন্দকে গুরুত্ব দিয়েছে।

এটি নতুন কিছু নয়। চলতি বছরের শীতকালীন অলিম্পিকে নরওয়ে টানা চতুর্থবারের মতো পদক তালিকার শীর্ষে ছিল। ১৮টি স্বর্ণপদক জিতে তারা নিজেদের তুলনায় বহু গুণ বড় দেশগুলোকেও পিছনে ফেলেছে।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখনও ব্রাজিলের পথেই হাঁটে—ছোটবেলায় প্রতিভা খুঁজে বের করা, দ্রুত বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং একটি নির্দিষ্ট অবস্থানের জন্য তৈরি করা। এই পদ্ধতি অসাধারণ ফুটবলারও তৈরি করেছে। কিন্তু নরওয়ের সাফল্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—শিশুকে নিজের মতো করে বড় হতে দেওয়াই কি শেষ পর্যন্ত আরও কার্যকর পথ?

সবচেয়ে বড় কথা, নরওয়ের এই আটটি অধিকার কখনও বিশ্বকাপ জেতার জন্য তৈরি করা হয়নি। এগুলো তৈরি হয়েছিল যাতে একটি শিশু খারাপ খেললেও লজ্জিত না হয়। যাতে নয় বছরের প্রতিভাবান একটি শিশুও শুধু একটি শিশু হিসেবেই বেড়ে উঠতে পারে।

সাবেক নরওয়ে ও টটেনহ্যাম হটস্পার এফ.সি. গোলরক্ষক এরিক থর্স্টভেট একবার বলেছিলেন, “ফুটবলকে এমনভাবে ভালোবাসতে হবে, যেন সেটাই জীবনের সবচেয়ে প্রিয় কাজ হয়ে ওঠে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করো না।”

ব্রাজিলকে হারানোর পর নরওয়ের সমর্থকেরা ঐতিহ্যবাহী “ভাইকিং রো” উদ্‌যাপনে মেতে ওঠেন। বাইরে থেকে সেটি হয়তো শুধু বিজয়ের উল্লাস। কিন্তু এই দলের বেড়ে ওঠার গল্প জানলে সেই দৃশ্যের অর্থ বদলে যায়। তখন মনে হয়, এটি আসলে এমন সব বাবা-মায়ের আনন্দধ্বনি, যারা সন্তানকে নিজের মতো করে বড় হতে দিয়েছেন, নিজের পছন্দের খেলা বেছে নিতে দিয়েছেন, আর প্রতিটি সপ্তাহান্তে শুধু পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ জুগিয়েছেন।

এবার কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের সামনে ইংল্যান্ড। ইতিহাস গড়ার আরেকটি সুযোগ অপেক্ষা করছে। কিন্তু এই দলের প্রকৃত সাফল্য হয়তো শুধু ব্রাজিলকে হারানো নয়। বরং একটি ছোট দেশ দেখিয়ে দিয়েছে—শিশুকে আগে শিশু হতে দিলে, খেলাকে আগে আনন্দ হতে দিলে, সাফল্য অনেক সময় আপনাআপনিই এসে ধরা দেয়।