- সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় ইংল্যান্ডের।
- ম্যানচেস্টারের ক্যাসলফিল্ড বাউলে আট হাজারের বেশি সমর্থকের সামনে আনন্দ মুহূর্তেই বদলে যায় হতাশায়।
- প্রথমে গোল করে এগিয়ে গিয়েও শেষ মুহূর্তে দুই গোল হজম করে হেরে যায় থমাস টুখেলের দল।
- পরাজয়ের পরও সমর্থকদের দাবি, এই দলের প্রাপ্য বীরের সম্মান; অনেকেই ফাইনালে স্পেনকে সমর্থনের কথা জানান।
পণ ছিল আকাশছোঁয়া। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ হিসেবে প্রচারিত এই লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের সামনে ছিল দুই লক্ষ্য—চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনাকে হারানো এবং ছয় দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পুরুষদের বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা।
কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হল না। স্নায়ুচাপের দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনা পরপর দুটি গোল করে ম্যাচ নিজেদের দিকে টেনে নেয়। আর তাতেই আরেকবার বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
ম্যানচেস্টারের ক্যাসলফিল্ড বাউলে ম্যাচ দেখতে জড়ো হয়েছিলেন আট হাজারেরও বেশি সমর্থক। খেলা শুরুর সময় আতশবাজি, গোলাপি-বেগুনি ধোঁয়া আর উল্লাসে মুখর হয়ে উঠেছিল গোটা প্রেক্ষাগৃহ। ইংল্যান্ড প্রথম গোল করার পর সেই উন্মাদনা আরও বেড়ে যায়। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার কয়েক মিনিট আগেই অনেক দর্শক নীরবে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে শুরু করেন।
ম্যাচের আগে ৩১ বছরের এলহাম মঘিমি বলেছিলেন, আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের অতীত খুব একটা সুখকর নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল লিওনেল মেসিকে ঘিরে।“মেসির উপস্থিতিই মানসিকভাবে বিরাট চাপ তৈরি করবে,” বলেছিলেন তিনি।২৯ বছরের জো জোনসের কথায়, “অনেক দিন পর এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ম্যাচ। যদি হারতেই হয়, তাহলে আর্জেন্টিনার কাছে হারটাই সবচেয়ে কষ্টের।”
অন্যদিকে ২৫ বছরের অলিভিয়া ক্র্যাবট্রি ছিলেন আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। বন্ধু জোডি ওয়ার্ড এবং লুইস মরিসকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, “খুব কঠিন ম্যাচ হবে, কিন্তু কাপ এবার ঘরেই ফিরবে। চারদিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে, সবাই দারুণ ইতিবাচক মেজাজে আছে।”
প্রথমার্ধে ছিল একের পর এক ফাউল, উত্তেজনা এবং ক্ষোভ। গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর রেফারিং নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বহু সমর্থক। ম্যানচেস্টারের বাসিন্দা ২৫ বছরের মিলি স্মিথ বলেন, “আর্জেন্টিনা খুব নোংরা ফুটবল খেলেছে। অথচ ইংল্যান্ডের পক্ষে কিছুই দেওয়া হচ্ছিল না।”দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ইংল্যান্ড গোল করতেই যেন বিস্ফোরিত হয় গ্যালারি। বজ্রধ্বনির মতো উল্লাসের সঙ্গে শুরু হয় সমর্থকদের জনপ্রিয় গান ডোন্ট টেক মি হোম।
সাত বছর আগে ভেনেজুয়েলা থেকে ইংল্যান্ডে আসা ৩২ বছরের মারিয়া দে নাপোলি সঙ্গী ভিক্টোরিয়া অ্যাটকিনসনের সঙ্গে আনন্দে চিৎকার করে ওঠেন।তিনি বলেন, “এ দেশ আমাকে আপন করে নিয়েছে। তাই আজ এই সংস্কৃতির আনন্দই উদযাপন করছিলাম। সবাই একসঙ্গে ছিল, সেটাই সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি।”কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। আর্জেন্টিনা ম্যাচে ফিরে আসতেই মুহূর্তে নেমে আসে নীরবতা। অনেক সমর্থক আঙুলের ফাঁক দিয়ে বড় পর্দার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
২৬ বছরের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র ক্রিশ্চিয়ান ম্যাকএলিস বলেন, “এটা সত্যিই বড় ধাক্কা। যদি টাইব্রেকারেও যেত, তবু ভেতরে ভেতরে খুব খারাপ লাগত।”
৩৬ বছরের আইনজীবী রাফ বারির মতে, গোটা বিশ্বকাপেই ইংল্যান্ড খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।“অন্য শীর্ষ দলগুলোর বিরুদ্ধে খেললে হয়তো আরও বড় ব্যবধানে হারতাম। কিন্তু তবুও দল সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছে। সেটাই তাদের লড়াইয়ের মানসিকতার প্রমাণ,” বলেন তিনি।২৫ বছরের লুকাস ক্ল্যাফাম অবশ্য ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করেছেন।“এতদূর আসাটাই বড় ব্যাপার। এই দীর্ঘ যাত্রা উপভোগ করতে হবে। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ এখনও বাকি আছে,” বলেন তিনি।
ম্যাচ শেষে প্রায় ফাঁকা হয়ে যাওয়া ক্যাসলফিল্ড বাউলের বাইরে বসে ছিলেন ৩০ বছরের রেচেল জর্জ। তাঁর চোখে জল।তিনি বলেন, “আমরা হেরে যাওয়ার পর আমি কেঁদেছি। খুবই কষ্টের সময়। কিন্তু চার বছর পর আবার সুযোগ আসবে। রবিবার ফাইনাল দেখার জন্য আমাদের পাবে বুকিং করা আছে। এবার আমরা স্পেনকে সমর্থন করব।”তাঁর সঙ্গী কনর ফোর্ডের আক্ষেপ, “অনেকেই খুব তাড়াতাড়ি উদযাপন শুরু করে দিয়েছিল। আতশবাজিও ফাটছিল। কিন্তু তবুও এই দলের ফুটবলারদের নিজেদের পারফরম্যান্স নিয়ে গর্ব করা উচিত। ওরা বীরের মতোই লড়েছে।”