হাইলাইটস
* দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার পথে বিমানবন্দরে জানানো হয়, চীনে ফেরার ভিসা বাতিল।
* সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে প্রতিবেদন লিখতেই ক্রমশ বাড়তে থাকে সরকারি চাপ ও নজরদারি।
* নজরদারি, সেন্সরশিপ এবং ভয়ের পরিবেশে সাংবাদিকতা কতটা কঠিন হয়ে উঠেছে, তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন লেখক।
ফেব্রুয়ারি মাসে কাজের একটি বৈঠকে যোগ দিতে আমি বেজিং থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার সোল-এ যাচ্ছিলাম। এই সফর খুবই সংক্ষিপ্ত হওয়ার কথা ছিল। সেই ভেবেই কয়েক দিনের পোশাক গুছিয়ে নিয়েছিলাম।বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় এক সীমান্তরক্ষী কর্মকর্তা আমার পাসপোর্টের দিকে তাকালেন, তারপর কম্পিউটারের পর্দায় চোখ বুলিয়ে আবার আমার দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণ পর তিনি আরেক সহকর্মীকে ডাকেন। তিনি আমাকে একটি পর্দা ঘেরা আলাদা কক্ষে নিয়ে যান।
সেখানে তিনি শান্ত গলায় জানালেন, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশে আমার ভিসা বাতিল করা হয়েছে। আমি সোল বিমানে উঠতে পারি, কিন্তু আর কখনও চীনে ফিরতে পারব না।
মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমার জীবনের এক বড় অধ্যায় শেষ হয়ে গেল। বিমানের গেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমি যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে, আমাকে চীন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
চীনা সরকার কোন বিষয়গুলোকে স্পর্শকাতর মনে করে, সে সম্পর্কে সবারই কিছু ধারণা আছে। দেশের শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত জীবন কিংবা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর দমন-পীড়নের মতো বিষয় অবশ্যই সেই তালিকায় পড়ে। আমি এসব নিয়ে কিছু প্রতিবেদন লিখেছি, কিন্তু আমার কাজের মূল ক্ষেত্র কখনওই তা ছিল না।
আমি বরং লিখতাম সাধারণ মানুষের গল্প। যে মানুষগুলো দ্রুত বদলে যাওয়া চীনের ভেতরে নিজেদের জীবনকে নতুন করে গড়ে তুলতে চাইছিল। কীভাবে তারা অর্থনৈতিক পরিবর্তন, প্রযুক্তির বিস্তার কিংবা সামাজিক রূপান্তরের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে, সেটাই ছিল আমার আগ্রহের কেন্দ্র।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই সাধারণ মানুষের জীবন নিয়েই লেখা আমার জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠেছিল।
আমার ভিসা বাতিলের কয়েক মাস আগে থেকেই পররাষ্ট্র মন্ত্রক আমাকে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করতে শুরু করে। আমি যখন নজরদারি ব্যবস্থা, করোনা কালে লকডাউনের অভিজ্ঞতা কিংবা মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ নিয়ে প্রতিবেদন লিখি, তখন সরকার দাবি করতে থাকে যে আমি নাকি ভুল তথ্য ছড়াচ্ছি।
শুধু অভিযোগেই থেমে থাকেনি তাঁরা। বহুবার আমাকে অনুসরণ করা হয়েছে, সাক্ষাৎকার নিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এমন কী একটি রক ব্যান্ড নিয়ে একেবারেই নিরীহ একটি প্রতিবেদন করার সময়ও সরকারি লোকজন এসে দাঁড়িয়েছিল।
তাই বহিষ্কারের খবর আমাকে বিস্মিত করলেও পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল না।
চীনা সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত অস্বচ্ছ। কেন ঠিক আমার ভিসা বাতিল করা হল, তার কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা আমি আজও পাইনি। তবে চীনে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে। কোন বিষয় স্পর্শকাতর আর কোনটি নয়, সেই পুরনো ধারণা এখন আর কার্যকর নয়।
সর্বত্র নজরদারির ছায়া।
দুই বছর ভিসার অপেক্ষায় থাকার পর ২০২২ সালে আমি অবশেষে বেজিংয়ে কাজ শুরু করি। তার আগে দূর থেকে মূল ভূখণ্ড চীন নিয়ে প্রতিবেদন করতাম। কিন্তু আমি জানতাম, মানুষের প্রকৃত গল্প দূরে বসে বলা যায় না।
আমি দেখতে চেয়েছিলাম এমন রাখালদের জীবন, যারা ভেড়া চরানোর পাশাপাশি লাইভস্ট্রিম করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। জানতে চেয়েছিলাম চাকরির খোঁজে যুব হোস্টেলে থাকা নতুন স্নাতকদের কথা। লিখতে চেয়েছিলাম সেই তরুণীদের নিয়ে, যারা নারীবাদ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে, যদিও সরকার সেই আলোচনা দমন করতে চায়।
আমি চেয়েছিলাম এমন একটি চীনকে তুলে ধরতে, যেখানে সৃজনশীলতা, উন্নতি ও উদ্ভাবনের পাশাপাশি রয়েছে বৈষম্য, অনিশ্চয়তা এবং কঠোর কর্তৃত্ববাদ।
কিন্তু খুব দ্রুত বুঝতে পারলাম, প্রায় প্রতিটি বিষয়ই কোনও না কোনওভাবে রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে।
একজন জৈব কৃষকের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। তিনি আবার শখের রক সংগীতশিল্পীও। স্থানীয় কর্মকর্তারা পুরো সাক্ষাৎকারে পাশে বসে রইলেন। কৃষক যখনই কোনও নেতিবাচক মন্তব্য করতে চাইতেন, তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে কথার মধ্যে ঢুকে পড়তেন। একবার তো তিনি শুধু বলেছিলেন, তাঁর অনেক প্রতিবেশী এখনও কীটনাশক ব্যবহার করেন। সেটুকুতেও আপত্তি ছিল কর্মকর্তাদের।
অন্য সময় পুলিশ কিংবা সাদা পোশাকের নিরাপত্তাকর্মীরা আমার পিছু নিতেন। আমি রাস্তায় কারও সঙ্গে কথা বলতে গেলেই তাঁরা উপস্থিত হতেন। ফলে অনেকেই ভয়ে আর কথা বলতে চাইতেন না।
এটি সম্ভব হতো বিশাল নজরদারি ব্যবস্থার কারণে। আমি কার সঙ্গে যোগাযোগ করছি, কোথায় যাচ্ছি, কীভাবে ভ্রমণ করছি, সবই যেন তাদের জানা থাকত। কখনও কখনও ট্রেন বা বিমান থেকে নামার আগেই কর্মকর্তারা স্টেশনে অপেক্ষা করতেন।
অর্থনীতির কথাও এখন স্পর্শকাতর।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেউ সরাসরি বলতেন না কেন আমাকে বাধা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, কেন্দ্রীয় সরকার কিছু বিস্তৃত বিষয়কে কার্যত নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।
অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলা এখন অনেক সময় জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কাজ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এমনকি যারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘অতিরিক্ত হতাশাবাদী’ মন্তব্য করেন, সেন্সরের নজর তাঁদের উপরও পড়ে।
এই বাস্তবতায় যারা তবুও আমার সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের প্রতি আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। তাঁদের কোনও ব্যক্তিগত লাভ ছিল না। শুধু চেয়েছিলেন, বাইরের পৃথিবী যেন তাঁদের দেশকে আরও বাস্তবভাবে চিনতে পারে।
চীন শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, শুধু বিস্ময়ও নয়
মে মাসে আমাকে অল্প সময়ের জন্য আবার চীনে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়, যাতে আমি চার মাস ধরে ফাঁকা পড়ে থাকা বাড়ি থেকে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে পারি।
সেই কয়েক সপ্তাহে আবারও মনে পড়ে গেল চীনের দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য ছোট ছোট দৃশ্য। অবসরপ্রাপ্ত মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত সংবাদ উপস্থাপকের খবর দেখছেন, কিংবা ট্যাক্সিচালকেরা রাইড-হেইলিং সংস্থার চাপে আয় কমে যাওয়ার অভিযোগ করছেন।
চীনের বাইরে থেকে এই দৃশ্যগুলো দেখা যায় না।
ফলে বাইরের পৃথিবী অনেক সময় শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার চোখ দিয়ে দেশটিকে দেখে। আবার কেউ কেউ শুধু ঝকঝকে অট্টালিকা, দ্রুতগতির বুলেট ট্রেন আর প্রযুক্তির বিস্ময় দেখেই চীনকে বিচার করেন।
এই দুই ছবির কোনওটিই পুরোপুরি ভুল নয়। কিন্তু কোনওটিই সম্পূর্ণও নয়।
আমার অভিজ্ঞতা বলছে, মানুষ চীনকে আরও গভীরভাবে জানতে চায়। পাঠকেরা প্রায়ই অনুরোধ করতেন, সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে আরও লেখা প্রকাশ করতে। কারণ বর্তমান সময়ে চীনকে ঘিরে আলোচনা যেন ক্রমেই সাদা-কালো হয়ে যাচ্ছে।
আমরা এখনও সেই গল্পগুলো বলার চেষ্টা করব, যদিও আমাদের অধিকাংশকেই এখন দেশের বাইরে থেকে কাজ করতে হচ্ছে। আমি ভবিষ্যতে চীনের বাইরে বসবাসকারী চীনা মানুষদের জীবন এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়েও লিখব।
তবু একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। কোনও দেশকে সত্যিকার অর্থে
বুঝতে হলে, সেই দেশের মাটিতে দাঁড়িয়েই তার গল্প শুনতে হয়।