ফুটবলকে দীর্ঘদিন বলা হয়েছে ‘রেফারির খেলা’। মাঠে একজন রেফারি ও তাঁর সহকারী যা দেখেছেন, সেটাই ছিল চূড়ান্ত সত্য। ভুল হয়েছে, বিতর্ক হয়েছে, বড় দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ছোট দলও অন্যায়ের শিকার হয়েছে—তবু খেলা এগিয়ে গেছে। কিন্তু প্রযুক্তির যুগে সেই বাস্তবতা বদলাতে শুরু করে। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর (VAR) চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবিক ভুল কমিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা। অথচ কয়েক বছরের মধ্যেই এই প্রযুক্তি নিজেই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলির একটি হয়ে উঠেছে।
আজ প্রশ্ন উঠছে—ভিএআর কি সত্যিই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে, নাকি ফুটবলের স্বাভাবিক গতি, আবেগ ও সৌন্দর্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে?
ভিএআরের ধারণা সহজ। মাঠের বাইরে বসে থাকা ভিডিও রেফারিরা একাধিক ক্যামেরার ফুটেজ দেখে মাঠের রেফারিকে গুরুত্বপূর্ণ চারটি ক্ষেত্রে সাহায্য করেন—গোল, পেনাল্টি, সরাসরি লাল কার্ড এবং ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা। নীতিগতভাবে এটি কেবল ‘স্পষ্ট ও সুস্পষ্ট ভুল’ সংশোধনের জন্য তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ রেফারির প্রতিটি সিদ্ধান্ত নয়, শুধুমাত্র বড় ধরনের ভুল হলে হস্তক্ষেপ করার কথা।
কিন্তু বাস্তবে সমস্যার শুরু এখানেই। কোন ভুলকে ‘স্পষ্ট’ বলা হবে, তার নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। ফলে একই ধরনের ঘটনায় এক ম্যাচে ভিএআর হস্তক্ষেপ করে, অন্য ম্যাচে করে না। এই অসঙ্গতিই বিতর্কের সবচেয়ে বড় উৎস।
অফসাইডের সিদ্ধান্ত ভিএআরের সবচেয়ে আলোচিত ক্ষেত্র। আধুনিক প্রযুক্তি খেলোয়াড়ের শরীরের বিভিন্ন অংশ মেপে মিলিমিটারের ব্যবধানে অফসাইড নির্ধারণ করে। ফলে এমনও হয়েছে, একজন ফুটবলারের কাঁধ, হাঁটু বা পায়ের আঙুল কয়েক মিলিমিটার এগিয়ে থাকায় গোল বাতিল হয়েছে। আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত সঠিক হলেও বহু ফুটবলপ্রেমীর প্রশ্ন—এটাই কি অফসাইড আইনের উদ্দেশ্য ছিল? আক্রমণাত্মক ফুটবল উৎসাহিত করার বদলে এই ধরনের অতিসূক্ষ্ম বিচার অনেকের কাছে অযৌক্তিক বলে মনে হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষার সমস্যা। গোল হওয়ার পর খেলোয়াড়, দর্শক এবং টেলিভিশনের সামনে বসা কোটি মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আনন্দ প্রকাশ করেন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই দেখা যায়, রেফারি কানে হাত দিয়ে অপেক্ষা করছেন। কখনও এক মিনিট, কখনও তিন মিনিট পর্যন্ত খেলা থেমে থাকে। তারপর ঘোষণা আসে—গোল বাতিল। এই বিলম্ব ফুটবলের স্বাভাবিক আবেগকে ভেঙে দেয়। গোল উদ্যাপনের যে মুহূর্তটি ফুটবলের প্রাণ, ভিএআরের যুগে সেটি অনেক সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে যায়।
আরও একটি বড় অভিযোগ, প্রযুক্তি থাকলেও সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত মানুষেরই। ভিডিও দেখেন মানুষ, ব্যাখ্যা করেন মানুষ, সিদ্ধান্তও নেন মানুষ। ফলে ব্যক্তিগত বিচারবোধ বা ব্যাখ্যার পার্থক্য থেকেই যায়। বিশেষ করে হ্যান্ডবল, ফাউল, পেনাল্টি বা বিপজ্জনক ট্যাকলের মতো ঘটনায় একই ধরনের সংঘর্ষ এক ম্যাচে পেনাল্টি, অন্য ম্যাচে সাধারণ খেলা হিসেবে গণ্য হয়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি মানবিক বিতর্ক দূর করতে পারেনি।
স্বচ্ছতার অভাবও সমালোচনার অন্যতম কারণ। দর্শক বা খেলোয়াড়রা অনেক সময় জানতেই পারেন না, ভিএআর কক্ষে কী আলোচনা হয়েছে, কোন যুক্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ক্রিকেটে তৃতীয় আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের যুক্তি অনেকটাই দৃশ্যমান। রাগবিতে রেফারি ও ভিডিও কর্মকর্তার কথোপকথনও সম্প্রচার করা হয়। কিন্তু ফুটবলে দীর্ঘদিন সেই ব্যবস্থা ছিল না। ফলে সন্দেহ, ক্ষোভ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আরও বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কিছু প্রতিযোগিতায় দর্শকদের কাছে সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হলেও তা এখনও সর্বত্র চালু হয়নি।
ভিএআরের আরেকটি সমালোচনা হল, এটি খেলার ছন্দ নষ্ট করে। ফুটবল এমন একটি খেলা, যেখানে অবিরাম গতি ও প্রবাহই সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। বারবার খেলা থেমে যাওয়া, ভিডিও পর্যালোচনার জন্য অপেক্ষা এবং সিদ্ধান্ত বদল—এসব ম্যাচের স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত করে। বিশেষ করে বড় প্রতিযোগিতার নকআউট ম্যাচে কয়েক মিনিটের বিরতি খেলোয়াড়দের মানসিক অবস্থাও বদলে দিতে পারে।
তবে ভিএআরের পক্ষে শক্তিশালী যুক্তিও রয়েছে। প্রযুক্তি চালুর আগে অসংখ্য বড় টুর্নামেন্ট ভুল সিদ্ধান্তে প্রভাবিত হয়েছে। ২০১০ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের স্পষ্ট গোল না দেওয়া, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো মারাদোনার ‘হ্যান্ড অব গড’, কিংবা অসংখ্য ভুল অফসাইড ও পেনাল্টির ঘটনা আজও ফুটবল ইতিহাসে আলোচিত। ভিএআর চালুর পর এমন বহু ভুল সংশোধন হয়েছে, যা অতীতে অসম্ভব ছিল। অনেক অবৈধ গোল বাতিল হয়েছে, আবার বৈধ গোলও স্বীকৃতি পেয়েছে। ন্যায়বিচারের দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে একটি অগ্রগতি।
পরিসংখ্যানও দেখায়, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের নির্ভুলতা ভিএআরের ফলে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি সামগ্রিকভাবে ভুল কমিয়েছে। কিন্তু ফুটবল শুধুমাত্র পরিসংখ্যানের খেলা নয়; এটি আবেগ, গতি এবং অনিশ্চয়তারও খেলা। তাই প্রযুক্তিগত নির্ভুলতা বাড়লেও দর্শকের অভিজ্ঞতা সবসময় উন্নত হয়েছে, এমন দাবি করা কঠিন।
এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি নতুন সমাধানের দিকে এগোচ্ছে। আধা-স্বয়ংক্রিয় অফসাইড প্রযুক্তি সিদ্ধান্তের সময় কমিয়েছে। আরও উন্নত বল-ট্র্যাকিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মত, ভিএআর ব্যবহারের ক্ষেত্র আরও সীমিত করা উচিত, যাতে শুধুমাত্র প্রকৃত বড় ভুলেই হস্তক্ষেপ করা হয়। একই সঙ্গে সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দর্শকদের সামনে প্রকাশ এবং ভিডিও রেফারির সঙ্গে মাঠের রেফারির কথোপকথন সম্প্রচারের দাবিও জোরদার হচ্ছে।
আসলে ভিএআর নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে প্রযুক্তি নয়, বরং ফুটবলের দর্শন। ফুটবল কি শতভাগ প্রযুক্তিনির্ভর নির্ভুলতার খেলা হবে, নাকি কিছু মানবিক ভুল মেনেও খেলার স্বাভাবিক প্রবাহ ও আবেগ অক্ষুণ্ণ রাখা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।
ভিএআর তাই এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার প্রতীক। এটি যেমন অসংখ্য অন্যায় সিদ্ধান্ত সংশোধন করেছে, তেমনই নতুন ধরনের বিতর্কও সৃষ্টি করেছে। প্রযুক্তি নিজে কখনও নিরপেক্ষ বিচারক হতে পারে না; তাকে পরিচালনা করেন মানুষ, আর মানুষের বিচার সবসময় ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে। তাই ভিএআরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে প্রযুক্তির উন্নতির পাশাপাশি তার ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ, দ্রুত, ধারাবাহিক ও বোধগম্য করা যায় তার ওপর।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অনিশ্চয়তা। সেই অনিশ্চয়তাকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা সম্ভব নয়। ভিএআরের প্রকৃত সাফল্যও সম্ভবত সেখানে নয়; বরং এমন এক ভারসাম্য খুঁজে পাওয়ায়, যেখানে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে, কিন্তু ফুটবলের প্রাণ—তার গতি, আবেগ ও স্বতঃস্ফূর্ততা—অক্ষুণ্ণ থাকবে। ততদিন পর্যন্ত ভিএআরকে ঘিরে বিতর্ক থামার কোনও লক্ষণ নেই।