বাংলাস্ফিয়ার: বারুইপুরে ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনায় তদন্তে আরও বড় অগ্রগতি হল। রবিবার পুলিশ আরও দু’জনকে গ্রেফতার করেছে। তদন্তকারীদের দাবি, নতুন ধৃতদের মধ্যে একজনকে ঘটনাস্থলের ভাইরাল ভিডিওতে গুরুতর জখম ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলকে রাস্তায় টেনে নিয়ে যেতে দেখা গিয়েছে। এই দুই গ্রেফতারের ফলে মামলায় মোট গ্রেফতারের সংখ্যা বেড়ে সাতে দাঁড়াল। তদন্তকারীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতেই এই গ্রেফতারি হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের মধ্যে অন্যতম শামিম আলি খান। তদন্তকারীদের দাবি, ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে তাঁকে আহত ইন্দ্রজিৎকে টেনে নিয়ে যেতে দেখা যায়। ভিডিওর প্রতিটি ফ্রেম বিশ্লেষণ, মুখ শনাক্তকরণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য মিলিয়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করার পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অপর ধৃতের বিরুদ্ধেও গণপিটুনিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তকারীদের মতে, গোটা ঘটনার তদন্তে ভিডিও প্রমাণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, স্থানীয় বাসিন্দাদের মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ক্লিপ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কে প্রথম হামলা চালায়, কে মারধরে অংশ নেয়, কে আহত ইন্দ্রজিৎকে টেনে নিয়ে যায় এবং কে জনতাকে উস্কানি দেয়—প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদা করে নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।
পুলিশের দাবি, তদন্তে তাড়াহুড়ো না করে প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। কেবল ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকাই নয়, হামলায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের প্রমাণ মিললেই গ্রেফতার করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই আরও কয়েকজন সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চলছে। তদন্তকারীদের মতে, আগামী কয়েক দিনে আরও গ্রেফতার হতে পারে।
ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের মৃত্যু রাজ্যজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। নাবালিকা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর গুজবের জেরে তাঁকে অপরাধে জড়িত বলে সন্দেহ করা হয়। এরপরই উত্তেজিত জনতা তাঁর উপর হামলা চালায়। পরে তদন্তে পুলিশ জানায়, ওই ধর্ষণ-হত্যা মামলায় ইন্দ্রজিতের কোনও ভূমিকার প্রমাণ মেলেনি। পরিবারের অভিযোগ, সম্পূর্ণ নিরপরাধ একজন মানুষ গুজবের বলি হয়েছেন।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, ইন্দ্রজিৎ একজন পরিশ্রমী অটোচালক ছিলেন। ঘটনাদিনে শুধুমাত্র পরিচিত এক অভিযুক্তের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার সন্দেহ থেকেই তাঁকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও দেওয়া হয়নি। পরিবারের অভিযোগ, জনতার হাতে নির্মমভাবে প্রহৃত হওয়ার পরও তাঁকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের মৃত্যু সাধারণ অর্থে স্বতঃস্ফূর্ত গণপিটুনি নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের মতো বলেই প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন, তদন্তে কাউকে রেহাই দেওয়া হবে না এবং প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীদের একাংশের বক্তব্য, এই ঘটনা ফের প্রমাণ করল যে গুজবের ভিত্তিতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কতটা বিপজ্জনক। তাঁদের মতে, কোনও অভিযোগ থাকলে তদন্তের দায় পুলিশের, জনতার নয়। একজন নিরপরাধ ব্যক্তির প্রাণহানি বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
পুলিশ জানিয়েছে, ধৃত সাতজনের বিরুদ্ধে খুন, বেআইনি জমায়েত, দাঙ্গা এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র-সহ একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রয়োজনে মামলায় আরও ধারা যুক্ত করা হবে। তদন্ত শেষ হলে ডিজিটাল প্রমাণ, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আদালতে চার্জশিট পেশ করা হবে।
তদন্তকারীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভাইরাল ভিডিও এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রমাণের সাহায্যে অভিযুক্তদের শনাক্ত করার কাজ অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের দাবি, এই ঘটনায় জড়িত কাউকেই আইনের হাত থেকে রেহাই দেওয়া হবে না এবং তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আরও গ্রেফতার হতে পারে।