হাইলাইটস:
- বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে প্রথমবার আন্তর্জাতিক ফুটবলে মুখোমুখি জুড বেলিংহ্যাম ও আর্লিং হালান্ড
- বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে একসঙ্গে খেলতে গিয়েই গড়ে ওঠে তাঁদের গভীর বন্ধুত্ব
- ক্লাব ফুটবলে আলাদা পথ বেছে নিলেও দু’জনের পারস্পরিক শ্রদ্ধা অটুট
- মেসি-রোনাল্ডো যুগের পর ফুটবলের নতুন মহাতারকা দ্বৈরথের প্রতীক হতে পারেন এই দুই তরুণ
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকারা। তবে শনিবার রাতে মিয়ামিতে ইংল্যান্ড-নরওয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে নজরের কেন্দ্রে হয়তো থাকবেন না ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেন। বরং বিশ্বের দুই উদীয়মান সুপারস্টার—ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যাম এবং নরওয়ের আর্লিং হালান্ড—ঘিরেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
গত তিন বছরে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে বেলিংহ্যাম এবং ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে হালান্ড বহুবার মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে এটাই তাঁদের প্রথম লড়াই। তাই বিশ্বকাপের এই কোয়ার্টার ফাইনালকে ঘিরে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। এমনকি বিনোদনধর্মী সাময়িকীতেও তাঁদের বন্ধুত্ব এবং আসন্ন দ্বৈরথ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
মেসি-রোনাল্ডো যুগ শেষের পথে। আগামী এক দশকে যদি ফুটবলের নতুন সুপারস্টার প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে ওঠে, তবে তার অন্যতম মুখ হতে পারেন বেলিংহ্যাম ও হালান্ড। যদিও কিলিয়ান এমবাপে কিংবা লামিন ইয়ামালের মতো তারকারাও সেই আলোচনায় রয়েছেন, তবু বেলিংহ্যাম-হালান্ড জুটির বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। তাঁদের সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে বন্ধুত্বের ভিত্তিতেই বেশি পরিচিত।
দু’জনের জন্মস্থানও খুব দূরে নয়। প্রায় ১৩০ মাইল ব্যবধানে জন্ম হলেও হালান্ড ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে নরওয়েতে ফিরে যান। ২০২০ সালে দু’জনেই বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে যোগ দেন। হালান্ড কিছুটা আগে এলেও, বেলিংহ্যামের আগমনও ছিল সমান আলোচিত। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ইংল্যান্ড থেকে জার্মানিতে পৌঁছনোর সময় সংবাদমাধ্যমকে ফাঁকি দিতে ডর্টমুন্ড কর্তৃপক্ষ তিনটি গাড়ি ব্যবহার করেছিল। ক্লাব তখনই বুঝেছিল, তারা শুধু একজন প্রতিভাবান ফুটবলার নয়, ভবিষ্যতের এক মহাতারকাকে দলে আনছে।
ডর্টমুন্ডের হয়ে অভিষেক ম্যাচেই গোল করে বেলিংহ্যাম সবাইকে চমকে দেন। সেই ম্যাচের পর সতীর্থ থরগান আজার বলেছিলেন, “ওর বয়স মাত্র ১৭, কিন্তু খেলে একজন পরিণত ফুটবলারের মতো।”
ছোটবেলা থেকেই নিজের এবং সতীর্থদের কাছে উচ্চমানের প্রত্যাশা ছিল বেলিংহ্যামের। কখনও কখনও মাঠে সতীর্থদের প্রকাশ্যে তিরস্কারও করেছেন তিনি। ২০২৩ সালে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হারের পর অধিনায়ক এমরে চান প্রকাশ্যেই তাঁকে সতর্ক করেছিলেন। অন্যদিকে হালান্ডের আবেগী বিস্ফোরণ সাধারণত নিজের দিকেই লক্ষ্য করে হতো; নিজের ভুলেই তিনি বেশি ক্ষুব্ধ হতেন।
ডর্টমুন্ডে একসঙ্গে কাটানো দুই বছর তাঁদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে। ক্লাবটি তখন তরুণ প্রতিভাদের বিশ্বমানের তারকায় পরিণত করার আদর্শ মঞ্চ হিসেবে পরিচিত ছিল। মাঠে যেমন বোঝাপড়া ছিল, মাঠের বাইরেও তেমনই ছিল তাঁদের বন্ধুত্ব। ক্লাবের প্রচারমূলক অনুষ্ঠানে মজার ছলে একে অপরকে নানা সংলাপ শুনিয়ে হাসির রোল তুলেছিলেন তাঁরা। সাধারণত সাক্ষাৎকারে গম্ভীর স্বভাবের হালান্ডও বেলিংহ্যামের পাশে থাকলে অনেক বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠতেন।
ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার পরও তাঁদের যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। ২০২৪ সালে এমন গুঞ্জনও উঠেছিল যে, বেলিংহ্যাম নাকি হালান্ডকে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। যদিও পরে হালান্ড সিটির সঙ্গেই দীর্ঘমেয়াদি নতুন চুক্তি করেন। তবু এতে স্পষ্ট, একজন ফুটবলার এবং মানুষ হিসেবে হালান্ডের প্রতি বেলিংহ্যামের শ্রদ্ধা কতটা গভীর।
২০২১ সালে দু’জনে মিলে ডর্টমুন্ডকে জার্মান কাপ জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। তখন আক্রমণের মূল ভরসা ছিলেন হালান্ড ও জেডন স্যানচো। বেলিংহ্যামও দারুণ খেললেও তখনও তিনি আজকের মতো দলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেননি। পরে হালান্ডের বিদায়ের পরই বেলিংহ্যাম ধীরে ধীরে দলের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হন।
ভবিষ্যতে কোনও এক ক্লাবে আবারও যদি এই দুই তারকা একসঙ্গে খেলেন, তাহলে তাঁরা কেমন ফুটবল উপহার দিতে পারেন, সেই কৌতূহল এখনও রয়ে গেছে। আপাতত অবশ্য সেই সম্ভাবনা দূরের। এখন তাঁদের সামনে একটাই লক্ষ্য—বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা।
শনিবারের এই লড়াই তাই শুধু ইংল্যান্ড বনাম নরওয়ে নয়; এটি ফুটবলের আগামী যুগের দুই সম্ভাব্য মহাতারকার প্রথম আন্তর্জাতিক মুখোমুখি। তবে মাঠে যতই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকুক, ম্যাচ শেষে বন্ধুত্বই যে শেষ কথা থাকবে, সে বিষয়ে খুব কম মানুষেরই সন্দেহ আছে।