Home SportsFIFA 2026 তারকাদের চুলের জাদুকর, কিন্তু মেসিকেও চিনতেন না! বিশ্বকাপে আলোচনায় ব্রিটিশ হেয়ার স্টাইলিস্ট জায়েমা

তারকাদের চুলের জাদুকর, কিন্তু মেসিকেও চিনতেন না! বিশ্বকাপে আলোচনায় ব্রিটিশ হেয়ার স্টাইলিস্ট জায়েমা

Authored By Ankita Senapati
8 views 8 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস:

  • ইংল্যান্ড, ব্রাজিল, আমেরিকা ও কানাডার ফুটবলারদের চুল সাজিয়ে বিশ্বকাপে অনন্য উপস্থিতি জায়েমার
  • জুড বেলিংহ্যাম, মার্কাস রাশফোর্ড, ননি মাদুয়েকে, রাফিনিয়া—সবাই তাঁর ক্লায়েন্ট
  • কয়েক সপ্তাহ আগেও লিওনেল মেসিকে চিনতেন না, লামিন ইয়ামালের পরিবারের সঙ্গে ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
  • ফুটবল সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতেন না, তবু বিশ্বকাপ তাঁকে এনে দিয়েছে নতুন পরিচয় ও জনপ্রিয়তা
  • বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড দলের বৈচিত্র্যকে দেখছেন ঐক্যের প্রতীক হিসেবে

বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বকাপে অসংখ্য গল্প জন্ম নেয়। কিন্তু জায়েমার গল্পটি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী। লন্ডনের এই হেয়ার স্টাইলিস্ট একই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড, ব্রাজিল, আমেরিকা ও কানাডার ফুটবলারদের চুলের স্টাইল করেছেন, লামিন ইয়ামালের পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, অথচ কয়েক সপ্তাহ আগ পর্যন্ত লিওনেল মেসি দেখতে কেমন, সেটাই জানতেন না।

পুরুষ ফুটবলের প্রথম ম্যাচ দেখতে গিয়েও তিনি শেষ বাঁশি পর্যন্ত থাকতে পারেননি। মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ড ও মেক্সিকোর উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচের মাঝপথেই বেরিয়ে আসেন। কারণ, দর্শকদের উচ্ছ্বাস তাঁর কাছে অতিরিক্ত মনে হয়েছিল।

হাসতে হাসতেই জায়েমা বলেন, “আমি এখনো বুঝি না ফুটবল মানুষকে এত কাঁদায় কেন। তবে ইংল্যান্ড জেতার পর মানুষের আনন্দ দেখে আমারও ভালো লেগেছিল।”

মেক্সিকো সিটি থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে ফিরে ক্লান্তির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “ভোরবেলা ওঠা, গভীর রাত পর্যন্ত কাজ, মিস হয়ে যাওয়া ফ্লাইট—সব মিলিয়ে খুব ক্লান্ত। কিন্তু কেউ যদি ফোন করে, আমি আবার উড়ে যাব। মার্কাস রাশফোর্ড বা ননি মাদুয়েকে যদি চুল ঠিক করার জন্য ডাকেন, আমি প্রস্তুত।”

তিনি বলেন, তাঁর কাজের নীতি একটাই—সব সময় প্রস্তুত থাকা।

প্রথম ফুটবল ম্যাচেই বিস্ময়

আজতেকায় প্রথমবার পুরুষদের ফুটবল দেখতে গিয়ে জায়েমা অবাক হয়ে যান। চারদিকে চিৎকার, পানীয় ছোড়াছুড়ি, উত্তেজনা—সব মিলিয়ে তাঁর কাছে অভিজ্ঞতাটি ছিল নতুন।

“একজন আমার কানের পাশে দাঁড়িয়ে এত জোরে চিৎকার করছিল যে আর সহ্য হচ্ছিল না। চারদিকে পানীয় উড়ছে। মেক্সিকান সমর্থকেরা ভীষণ উচ্ছ্বসিত ছিল। শুনেছিলাম ইংল্যান্ড দলকে ভালোভাবে স্বাগত জানানো হয়নি। তখন শুধু প্রার্থনা করছিলাম, ঈশ্বর যেন ওদের জিতিয়ে দেন।”

তিনি ম্যাচের শেষ পর্যন্ত থাকেননি। তবে পরে জানতে পারেন, জুড বেলিংহ্যামের জোড়া গোলে ইংল্যান্ড জিতেছে।

জুড বেলিংহ্যাম যে ফুটবলার, সেটাই জানতেন না

বিশ্বকাপ শুরুর আগে ইংল্যান্ড দলের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে একের পর এক বিস্ময়ের মুখোমুখি হন জায়েমা।

তিনি বলেন, “আমি জানতামই না জুড একজন ফুটবলার। পরে কথা বলতে গিয়ে জানলাম, আমার জন্মদিন, জুডের জন্মদিন আর এবেরেচি এজের জন্মদিন একই—২৯ জুন। পরে ওদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসরণ করে দেখলাম, কোটি কোটি অনুসারী!”

আরেকটি মজার অভিজ্ঞতা ছিল জর্ডান হেন্ডারসনকে নিয়ে।

“তিনি আমার ব্যাগ বহন করতে সাহায্য করেছিলেন। ওয়াই-ফাই নিয়ে সমস্যায় পড়লে বারবার তাঁর কাছেই যেতাম। আমি জানতামই না উনি ইংল্যান্ড দলের খেলোয়াড়। সবাই ভীষণ ভদ্র ব্যবহার করেছে।”

১৭ বছরেই নিজের সেলুন

জায়েমার আসল নাম মে জিকে। পূর্ব লন্ডনের প্লাইস্টোতে তাঁর বেড়ে ওঠা।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে বার্কিংয়ের একটি শপিং সেন্টারে আফ্রো-ক্যারিবীয় হেয়ার সেলুন খুলেছিলেন তিনি। পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন ১৫ বছর বয়সে।

“বন্ধুরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন উপভোগ করছিল, আমি তখন ব্যবসার পরিকল্পনা করছিলাম। আজ যা অর্জন করেছি, তা আমাকে অবাক করে না। কারণ এর জন্য দীর্ঘদিন পরিশ্রম করেছি।”

বাস্কেটবল থেকে ফুটবল

প্রথমে তাঁর কাজ নজরে আসে আমেরিকার নারী বাস্কেটবল লিগ ডব্লিউএনবিএ-র খেলোয়াড়দের। কিংবদন্তি আজা উইলসন তাঁর কাজের প্রশংসা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন এবং প্যারিস অলিম্পিকে আমন্ত্রণ জানান।

সেখানেই পরিচয় হয় লেব্রন জেমস, স্টিফেন কারি ও কেভিন ডুরান্টের মতো তারকাদের সঙ্গে।

জায়েমা বলেন, “অনেকে অবাক হতেন যে আমি ওদের চিনতাম না। কিন্তু সেটাই ওদের ভালো লাগত। আমি সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছি, একসঙ্গে খেয়েছি, হাসি-ঠাট্টা করেছি।”

রাশফোর্ডের নতুন লুক

বিশ্বকাপের আগে ননি মাদুয়েকে ও মার্কাস রাশফোর্ড তাঁকে ইংল্যান্ড শিবিরে ডাকেন।

মাদুয়েকে সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, “ও ভীষণ মজার মানুষ।”

রাশফোর্ড সম্পর্কে তিনি বলেন, “ও বলেছিল, আগে কখনও এভাবে চুল বেঁধে দেখেনি। তাই আমাকে নিজের মতো করে স্টাইল বেছে নিতে দেয়। আমি ওর মুখের গঠন, ব্যক্তিত্ব সব দেখে এমন একটি স্টাইল করি, যাতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে।”

চুল সাজিয়ে তিনি আমেরিকার বিমানে ওঠেন। বিমানে ঘুমিয়ে পড়েন। নেমেই দেখেন ফোনে অসংখ্য বার্তা।

“রাশফোর্ড গোল করেছে। ও বলল, নতুন চুলের স্টাইল সবাই লক্ষ্য করেছে। তখনই বুঝলাম, বিশ্বকাপ কত বড় মঞ্চ।”

রাফিনিয়ার নতুন পরিচয়

ব্রাজিল তারকা রাফিনিয়ার বিখ্যাত বেণী করা চুলও জায়েমার সৃষ্টি।

তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, রাফিনিয়ার জন্য আমরা একটি নতুন পরিচিত লুক তৈরি করেছি। ও অসাধারণ মানুষ।”

মেসিকে চিনতেন না

ফুটবল সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতার সবচেয়ে বিস্ময়কর উদাহরণ লিওনেল মেসিকে নিয়ে।

হাসতে হাসতে জায়েমা বলেন, “ইংল্যান্ড দলের ছেলেরাই আমাকে প্রথম মেসির কথা বলেছিল। কয়েক সপ্তাহ আগ পর্যন্ত আমি জানতামই না উনি দেখতে কেমন।”

এক নারী ফুটবলারকে তিনি বলেছিলেন, “মেসি সামনে দাঁড়ালেও হয়তো চিনতে পারব না।”

উত্তরে সেই ফুটবলার বিস্ময়ে বলেছিলেন, “আমি হলে শুধু মেসির সঙ্গেই ছবি তুলতে চাইতাম।”

তবে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নাম তিনি আগে থেকেই শুনেছিলেন।

লামিন ইয়ামালের পরিবারের সঙ্গে বন্ধুত্ব

জায়েমার সবচেয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা লামিন ইয়ামালকে ঘিরে।

তাঁকে ডাকা হয়েছিল ইয়ামালের মায়ের চুলের স্টাইল করার জন্য।

“আমি তাঁদের বাড়িতে গেছি, পরিবারের সঙ্গে বসে খেয়েছি, দাদির সঙ্গে গল্প করেছি। তখন জানতামই না লামিন বিশ্বের অন্যতম বড় ফুটবলার।”

পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করার পর বন্ধুরা তাঁকে জানায়, তিনি আসলে কাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন।

জায়েমা বলেন, “ওদের পরিবার খুবই বিনয়ী। লামিনের মা আমাকে বলেছিলেন, কীভাবে দু’জন মানুষের সাহায্যে তাঁদের কঠিন সময় কেটেছিল। সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই ছেলের নাম রাখা হয় লামিন ইয়ামাল। গল্পটা শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিয়েছিল।”

তিনি আরও বলেন, ইয়ামালের ছোট ভাই কেইন অসাধারণ প্রাণবন্ত এবং আফ্রিকান নাচ খুব পছন্দ করে।

হালান্ডের চুলও কি সাজাবেন?

এরলিং হালান্ডের নামও প্রথম শুনেছেন সম্প্রতি।

“দেখলাম লম্বা স্বর্ণালি চুল। পরে ওর ছবি দেখে বুঝলাম, আগে বেণীও করেছে। সুযোগ পেলে কাজ করতেই পারি।”

তবে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ নরওয়ের হয়ে খেলায় আপাতত সেই সম্ভাবনা নেই।

জায়েমা জানান, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে ঘানা দলও তাঁকে ডাকতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি বিনয়ের সঙ্গে না বলেছেন।

বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ফুটবল

২০২১ সালের ইউরো ফাইনালে পেনাল্টি মিস করার পর মার্কাস রাশফোর্ড, বুকায়ো সাকা ও জেডন সাঞ্চো যে বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন, সে ঘটনা আগে জানতেন না জায়েমা।

সব শুনে তিনি হতবাক।

“যাঁরা বর্ণবাদী মন্তব্য করেন, তাঁরা আবার চান এই ছেলেরাই দেশের হয়ে খেলুক। এত অপমানের পর কেউ কীভাবে নিজের সেরাটা দেবে?”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খেলোয়াড়দের নিয়ে পোস্ট করার পর তিনিও বর্ণবাদী মন্তব্য দেখেছেন।

তাঁর মতে, “মানুষ বোঝে না এই তরুণদের কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।”

শেষে ইংল্যান্ড দল সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন, “এই দলটা বিভিন্ন জাতিগত পরিচয়, সংস্কৃতি আর ব্যক্তিত্বের এক সুন্দর মিলন। ফুটবলের কাজ মানুষকে এক করা। আমার কাজ শুধু ওদের সুন্দর দেখানো নয়, মানুষকে দেখানো—এই ফুটবলাররা মাঠের বাইরেও অসাধারণ মানুষ।”

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles