Home SportsFIFA World Cup 2026 সশস্ত্র পাহারায় ইরানের বিশ্বকাপ শিবির

সশস্ত্র পাহারায় ইরানের বিশ্বকাপ শিবির

নিরাপত্তা, ভিসা-বিতর্ক ও রাজনৈতিক বিভাজনের ছায়ায় টিজুয়ানায় টিম মেল্লির অস্থায়ী ঠিকানা

0 comments 19 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস:

  • আমেরিকায় থাকার পরিকল্পনা বাতিল করে শেষ মুহূর্তে মেক্সিকোর টিজুয়ানায় ঘাঁটি গড়েছে ইরান দল।
  • স্টেডিয়ামের বাইরে মেশিনগানধারী সশস্ত্র প্রহরা ও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
  • মার্কিন ভিসা না পাওয়ায় দলের ১৫ জন সাপোর্ট স্টাফ, এমনকি পুরো মিডিয়া বিভাগও বিশ্বকাপ কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছে না।
  • ইরানের খেলোয়াড়রা দেশের সরকারপন্থী ও সরকারবিরোধী দুই পক্ষের চাপের মধ্যে পড়েছেন।
  • ফুটবলের চেয়ে রাজনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যুই যেন বেশি প্রভাব ফেলছে ইরানের বিশ্বকাপ যাত্রায়।

বাংলাস্ফিয়ার: টিজুয়ানার এস্তাদিও কালিয়েন্তের বাইরে সারাদিন ঘুরে বেড়িয়েছে খোলা ছাদের সামরিক ট্রাক। হেলমেট ও মুখোশ পরা সশস্ত্র রক্ষীরা সেই ট্রাকে বসে মেশিনগান হাতে পাহারা দিয়েছেন পুরো এলাকা। কয়েক ঘণ্টা পরপর তারা স্টেডিয়ামের প্রধান ফটকের সামনে দিয়ে টহল দিয়েছে।

মেক্সিকোর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এই শহরে এখন এটাই স্বাভাবিক দৃশ্য। যে স্টেডিয়ামটিকে স্থানীয় লিগের বেশিরভাগ দল অপছন্দ করে তার দূরবর্তী অবস্থান এবং কঠিন কৃত্রিম টার্ফের জন্য, সেই জায়গাই এখন ইরান জাতীয় ফুটবল দলের বিশ্বকাপ ঘাঁটি।

আসলে পরিকল্পনা ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। ইরান দলের থাকার কথা ছিল আমেরিকার অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের টাকসনে, বিশাল কিনো স্পোর্টস কমপ্লেক্সে। সেখানে একাধিক প্রশিক্ষণ মাঠসহ আন্তর্জাতিক মানের পরিকাঠামো ছিল। কিন্তু আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ইরানের রাষ্ট্রপ্রধান ও একাধিক শীর্ষ নেতার মৃত্যুর পর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি এতটাই বেড়ে যায় যে সেই পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়।

তার ফলেই শেষ মুহূর্তে বিশ্বকাপ শিবির সরিয়ে আনা হয় টিজুয়ানায়।

ক্লাব টিজুয়ানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফিফার কাছ থেকে তারা মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এই সিদ্ধান্তের খবর পান। তারপর থেকেই প্রায় ১৮ ঘণ্টা করে কাজ করে মাঠ প্রস্তুত করতে হয়েছে। কারণ পুরো কমপ্লেক্সে প্রাকৃতিক ঘাসের মাত্র একটি মাঠ রয়েছে, আর সেটিই ব্যবহার করছে ইরান।

শুধু মাঠ তৈরি নয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রবেশ করতে হলে পরিচয়পত্র একবার নয়, বারবার পরীক্ষা করা হচ্ছে। দলের অনুশীলনের সময়সূচি, ভিডিও ধারণের স্থান কিংবা খেলোয়াড়দের সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ—সবকিছুই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।

দলটি কাছাকাছি একটি হোটেলে থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাই মেশিনগানধারী প্রহরা, গোপনীয়তা এবং তথ্যের কড়াকড়ি।

তবে এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেও ইরানিদের সবচেয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন স্থানীয় মেক্সিকানরাই।

ক্লাব টিজুয়ানার কর্মীরা খেলোয়াড়দের স্বাগত জানাতে মাঠের চারপাশে ফার্সি ভাষায় একটি বিশাল ব্যানার টাঙিয়েছেন। সেখানে লেখা, “ইরানি চিতা, টিজুয়ানায় স্বাগতম।”

প্রতিদিন অনুশীলনে যাওয়ার সময় হোটেলের বাইরে জড়ো হচ্ছেন স্থানীয় সমর্থকেরা। তারা খেলোয়াড়দের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, অটোগ্রাফ চাইছেন, ছবি তুলছেন।

একজন সমর্থক এএফপিকে বলেন, “আমেরিকা যা করছে, তাতে আমি লজ্জিত।” আরেকজনের মন্তব্য, “তারা সবাইকে সন্ত্রাসী মনে করে। এটা ভুল।”

কিন্তু মাঠের বাইরের সমস্যাগুলো এখানেই শেষ নয়।

রবিবার লস অ্যাঞ্জেলেসে ফিফা-নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে যাবে ইরান। কিন্তু দলের সঙ্গে যেতে পারবেন না ফেডারেশনের ১৫ জন কর্মী। তাদের মধ্যে রয়েছে পুরো মিডিয়া অপারেশনস বিভাগ।

এক কর্মকর্তা জানান, সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করবেন কে, ম্যাচের পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব নেবেন কে—তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। মজা করে তিনি বলেছেন, শেষ পর্যন্ত হয়তো দলের কিটম্যানকেই সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে।

আজকের অনুশীলনে সংবাদমাধ্যমকে খুব অল্প সময়ের জন্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। কোনো খেলোয়াড়কে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। কারণ, তারা যা-ই বলুন না কেন, তা নিয়ে বিতর্ক হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ইরানের ভেতরে সরকার ও সরকারপন্থীরা যেকোনো মন্তব্যকে জাতীয় ঐক্যের বিরুদ্ধে বলে আক্রমণ করতে পারে। আবার বিদেশে থাকা সরকারবিরোধী প্রবাসী ইরানিরা অভিযোগ তুলতে পারেন যে এই দল একটি দমনমূলক রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছে। এই দুই মেরুর মাঝখানে রয়েছেন সেইসব সাধারণ ইরানি, যারা শুধু ফুটবল দেখতে চান এবং চান তাদের দল ভালো খেলুক।

কিন্তু খেলোয়াড়দের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। তারা যেন রাজনৈতিক বালুচরে আটকে পড়েছেন। নড়লেই ডুববেন, আবার স্থির থাকলেও মুক্তি নেই। তবু দলকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার ছিল পুনরুদ্ধারমূলক অনুশীলনের দিন। আগের দিন ক্লাব টিজুয়ানার অনূর্ধ্ব-২১ দলকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে ইরান। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিই সম্ভবত তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রস্তুতি ম্যাচ।

কারণ আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইরান এখন কার্যত একঘরে। বহু দেশ তাদের বিরুদ্ধে খেলতে অনিচ্ছুক। ফলে অভিজ্ঞ ও টানা চারবার বিশ্বকাপে ওঠা এই দলটির জন্য মানসম্মত প্রস্তুতি ম্যাচ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

ক্যারিবীয় দেশ গ্রেনাডার বিরুদ্ধে নির্ধারিত একটি প্রীতি ম্যাচও হঠাৎ বাতিল হয়ে যায়। তাই বাধ্য হয়ে অনূর্ধ্ব-২১ দলের বিপক্ষেই খেলতে হয়েছে।

চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে ইরানকে ঘিরে অন্য ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা গিয়েছিল।

২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছিল। প্রথম ম্যাচে গ্যালারিতে উপস্থিত অনেক সমর্থক উচ্চারণ করেছিলেন সেই আন্দোলনের স্লোগান—“নারী, জীবন, স্বাধীনতা”।

কিন্তু পরের ম্যাচগুলোতে পরিস্থিতি বদলে যায়। অভিযোগ ওঠে, শত শত নিরাপত্তাকর্মী ও বিপ্লবী গার্ডের সদস্য কাতারে গিয়ে দর্শকদের নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন।

এবার সেই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ বহু ইরানি কর্মকর্তা মার্কিন ভিসা পাননি। তবে তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি।

ইরান দলের প্রতি সমর্থন দেশজুড়ে একরকম নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বৃহৎ ইরানি প্রবাসী সমাজের একটি বড় অংশ এই দলকে সমর্থন করে না। আর তাদের কেন্দ্রই লস অ্যাঞ্জেলেস অঞ্চল, যেখানে ইরান তাদের তিনটি গ্রুপ ম্যাচের মধ্যে দুটি খেলবে। ফলে বিভাজনের মধ্যেও আরও বিভাজন রয়েছে। সমর্থকদের মধ্যেও রয়েছে মতাদর্শিক সংঘাত।

কিন্তু ফিফা বরাবরের মতোই দেখাতে চাইছে যে এসবের কিছুই নেই। যেন ইরানের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ কেবল ফুটবল নিয়েই, আর রাজনীতির কোনো ভূমিকা নেই।

বাস্তবতা অবশ্য অনেক বেশি জটিল। টিজুয়ানার সশস্ত্র পাহারায় ঘেরা এই শিবির সেই বাস্তবতারই প্রতীক—যেখানে একটি ফুটবল দল বিশ্বকাপ খেলতে এসেছে, কিন্তু তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের উপর ভর করে আছে যুদ্ধ, কূটনীতি, নির্বাসন, পরিচয় এবং বিভক্ত জাতির দীর্ঘ ছায়া।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles