Home SportsFIFA 2026 বিশ্বকাপের শেষ দৃশ্য: ট্রাম্প–ইনফান্তিনোর প্রদর্শনী, মেসির বিদায় আর ফুটবলের নতুন যুগের সূচনা

বিশ্বকাপের শেষ দৃশ্য: ট্রাম্প–ইনফান্তিনোর প্রদর্শনী, মেসির বিদায় আর ফুটবলের নতুন যুগের সূচনা

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
12 views 6 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • স্পেনের হাতে বিশ্বকাপ তুলে দেওয়ার মুহূর্তেও কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
  • নজিরবিহীন আয়োজন, বিপুল অর্থ ও তারকাদের ভিড়ে ফুটবল অনেক সময়ই যেন গৌণ হয়ে পড়েছিল।
  • ফোলারিন বালোগুন বিতর্ক ফিফার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
  • ১৫ বিলিয়ন ডলারের আয় ফিফাকে আরও বড় বিশ্বকাপ আয়োজনের পথে উৎসাহিত করবে।
  • সব বিতর্কের মধ্যেও স্পেনের জয় ছিল দলগত ফুটবলের সাফল্য, আর মেসির অশ্রুসিক্ত বিদায় ছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে মানবিক মুহূর্ত।

শেষটা যেন ঠিক সেইভাবেই হল, যেমনটা জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প চেয়েছিলেন।

বিশ্বকাপ ফাইনালের দীর্ঘ, প্রায় অন্তহীন দিনের শুরুতে ট্রফিটি আনা হয়েছিল বিলাসবহুল লুই ভুইতঁর বিশেষ ট্রাঙ্ক থেকে—একটি দৃশ্য যা পুরো টুর্নামেন্টের জাঁকজমক, বিপুল ব্যয় আর প্রদর্শনপ্রিয়তার প্রতীক হয়ে থাকবে। ম্যাচ শেষে ইনফান্তিনো ও ট্রাম্প একসঙ্গে মঞ্চে উঠে হাস্যোজ্জ্বল স্পেন অধিনায়ক রদ্রির হাতে ট্রফি তুলে দেন। তবে মুহূর্তটি খানিকটা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, যখন দলীয় ছবি তোলার সময়ও ট্রাম্প মঞ্চ ছাড়তে দেরি করেন। শেষ পর্যন্ত বিব্রতবোধ ঝেড়ে তাঁরা নেমে যান, আর সোনালি কনফেটির ঝলকে নিউ জার্সির স্টেডিয়াম ছাপিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এই অভূতপূর্ব বিশ্বকাপের প্রতিধ্বনি।

এই বিশ্বকাপকে কীভাবে বিচার করা যায়? এটি ছিল একই সঙ্গে মুগ্ধকর, মাতাল করা, আবার অদ্ভুত ও বিভ্রান্তিকর এক অভিজ্ঞতা। একদিকে ছিল উন্মুক্ত উৎসবের আবহ, অন্যদিকে ছিল এক অদৃশ্য দূরত্ব—যেন ফুটবলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাবের আলাদা এক জগৎ।

ফাইনালের দিনটি যেন ছিল এক অদ্ভুত স্বপ্নের মতো। নীল আকাশের নিচে ফুটবল অনেক সময়ই মূল আকর্ষণ নয়, বরং পার্শ্বচরিত্রে পরিণত হয়েছিল। ম্যাচটিও সেই অভিজ্ঞতাকে বদলাতে পারেনি। তবে এই সমাপ্তি থেকে যদি কোনও প্রতীক খুঁজতে হয়, তবে সেটি স্পেনের জয়। ব্যক্তিপূজাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে দলগত দর্শন, সমষ্টিগত ফুটবল।

পুরো ম্যাচজুড়ে ট্রাম্প ও ইনফান্তিনো বুলেটপ্রুফ কাচঘেরা ভিআইপি বক্সে পাশাপাশি বসে ছিলেন। দৃশ্যটি এক কঠিন প্রশ্ন তুলে দেয়—এটাই কি আজকের ফুটবলের স্বাস্থ্য ও গণতান্ত্রিক চরিত্রের প্রতিচ্ছবি?

গত এক মাসের বিতর্ক দেখিয়ে দিয়েছে, ফুটবলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সাধারণ সমর্থকদের কাছ থেকে কখনও এত দূরে ছিল না। একই সঙ্গে তারা কখনও এত নিরাপদ, এত অপ্রতিরোধ্যও ছিল না।

অন্যদিকে মাঠে আর্জেন্টিনা ও স্পেন কখনও পাস খেলেছে, কখনও ঝগড়ায় জড়িয়েছে, কখনও সময় নষ্ট করেছে। বহু বিশেষজ্ঞের মতে, এটি ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম নিরস ফাইনাল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন উঠেছে—ফিফার কাছে আদৌ কি ম্যাচের মানটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

যাঁরা মাঠের ধারে বসার জন্য প্রায় ১০ লক্ষ ডলার খরচ করেছিলেন, তাঁরা হয়তো বুঝেছেন যে ফুটবল টাকা দিয়ে কেনা উত্তেজনার নিশ্চয়তা দেয় না। তবে এই আসরে অনেকের লক্ষ্য ছিল খেলা দেখা নয়, বরং অন্যদের চোখে পড়া। ম্যাচের আগে ফিফা গর্ব করে ২৩৫ জন তারকা ও ভিভিআইপির তালিকা প্রকাশ করেছিল।

হলিউড তারকা টম ক্রুজ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে উঠলেও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের স্লোগানে তাঁর কণ্ঠ প্রায় ডুবে যায়। সেটিই ছিল গোটা দিনের অন্যতম বিরল মুহূর্ত, যখন স্টেডিয়ামে সত্যিকারের ফুটবল-আবহ অনুভূত হয়।

এই বিশ্বকাপ ফুটবলের ঐতিহ্যকে নানা দিক থেকে নাড়া দিয়েছে। ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে ফিফা যেন বিশ্বাস করে—যে কোনও প্রচারই শেষ পর্যন্ত ভালো প্রচার। বিতর্ক, সমালোচনা, শোরগোল—সবই আরও বড় করে ফুটবলকে বিক্রি করার উপায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিফা নিঃসন্দেহে নিজের পরিচিতি বাড়াতে সফল হয়েছে। এমনকি অনেক আমেরিকান পুরো টুর্নামেন্টকেই “দ্য ফিফা” নামে ডাকতে শুরু করেছিলেন।

কিন্তু ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ড প্রত্যাহারের ঘটনা ফিফার বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার উপর গভীর আঘাত হেনেছে। বহু অভিজ্ঞ ফুটবল প্রশাসকও এতে হতাশ। তবু খুব কম মানুষেরই সন্দেহ আছে যে আগামী মার্চে ইনফান্তিনো আবারও বিপুল ভোটে ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হবেন।

এই ঘটনা নতুন দর্শকদের কাছেও একটি বিপজ্জনক বার্তা পৌঁছে দেয়—যদি যথেষ্ট রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকে, তবে ফুটবলে প্রায় সব সিদ্ধান্তই বদলে ফেলা সম্ভব।

ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এককভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ দিতে চান। তাঁর সঙ্গে ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখানেই থামবে বলে মনে হয় না। ২০৩৮ সালের বিশ্বকাপের সময় সেই সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। সমালোচকদের আশঙ্কা, তখন আন্তর্জাতিক ফুটবল নৈতিকতার বিচারে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেটিকে অনেকেই ক্রীড়াজগতের ‘এনহ্যান্সড গেমস’-এর সমতুল্য বলে মনে করবেন।

তবু ফুটবলের নিজস্ব শক্তিও এই বিশ্বকাপে বারবার সামনে এসেছে।

স্পেনের অতিরিক্ত সময়ের গোল, কেপ ভার্দের রূপকথার যাত্রা, গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার অসাধারণ লড়াই, মেসি, এমবাপে, হালান্ড ও বেলিংহ্যামের তারকাসুলভ পারফরম্যান্স—সবই এই বিশ্বকাপকে স্মরণীয় করেছে। বেলজিয়ামের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ও অন্তত নিশ্চিত করেছে যে বালোগুন বিতর্ক শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্টের ফলাফলে প্রভাব ফেলেনি।

বিতর্কের বাইরে আরও একটি বিশ্বকাপ ছিল।

ক্যানসাস সিটি, হিউস্টনের মতো শহরগুলো আন্তরিকভাবে সমর্থক ও দলগুলিকে স্বাগত জানিয়েছে। আমেরিকার মানুষ যে অতিথিপরায়ণ, উদার এবং কৌতূহলী—এই সফর সেই সত্য আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে। বিদেশ থেকে অনেকের চোখে পুরো যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিচ্ছবি বলে মনে হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল অনেক বেশি মানবিক।

মেক্সিকো এই বিশ্বকাপে এনে দিয়েছে নিখাদ ফুটবল-উন্মাদনা। কিংবদন্তি আজতেকা স্টেডিয়াম ছিল টুর্নামেন্টের সেরা ভেন্যু। অথচ শেষ ষোলোর পর আর কোনও ম্যাচ সেখানে না হওয়া অনেকের কাছেই বড় আক্ষেপ হয়ে থাকবে।

অর্থনৈতিক দিক থেকে অবশ্য ফিফা সম্পূর্ণ বিজয়ী। সংস্থাটি প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা তাদের নিজস্ব পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই বিপুল সাফল্য ইনফান্তিনোকে আরও বড় পরিকল্পনার দিকে ঠেলে দেবে। ৬৪ দলের বিশ্বকাপ এখন আর অবাস্তব ধারণা নয়; বরং বাস্তব আলোচনার বিষয়।

তবে এই বিশ্বকাপ আরেকটি উদ্বেগও সামনে এনেছে। শেষ ষোলোর পরে ইউরোপের বাইরে কার্যত কেবল আর্জেন্টিনা ও মরক্কোই নিজেদের মহাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিল। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ভারসাম্য নিয়ে এটিও একটি বড় প্রশ্ন।

অবশেষে বিশ্বকাপ শেষ হল।

অগাধ অর্থ, বিপুল সম্পদ, অসীম প্রচার আর নজিরবিহীন মনোযোগ গ্রাস করা এক টুর্নামেন্ট ইতিহাসে জায়গা করে নিল।

ট্রাম্প ও ইনফান্তিনো স্টেডিয়াম ছেড়ে যাওয়ার পর, আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সামনে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েছিলেন লিওনেল মেসি।

সেই মুহূর্তেই যেন অবশেষে ফুটবল আবার মানুষের হয়ে উঠল।

বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারের এক যুগের অবসান ঘটল, আর তাঁর ভক্তরা আবেগে ভাসলেন। এই বিশ্বকাপ শুধু একটি চ্যাম্পিয়নই নির্ধারণ করেনি; এটি যেন ফুটবলকে সম্পূর্ণ নতুন এক বাস্তবতার দোরগোড়ায় এনে দাঁড় করিয়ে দিল।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles