২০২৫ সালের অক্টোবর। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে অশ্মিতা চালিহা নেমে গিয়েছিলেন ২১১ নম্বরে। বয়স তখন ২৬ ছুঁইছুঁই। চোটের পরে র্যাঙ্কিংয়ের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই সরে গিয়েছিলেন পৃষ্ঠপোষকেরাও। হাঁটুর অস্ত্রোপচারের পরে কোর্টে ফেরার লড়াই তখনও শেষ হয়নি। তাঁর পরিচিত বাঁ-হাতি লাফিয়ে মারা বিধ্বংসী স্ম্যাশও আগের ধার ফিরে পায়নি।
সেই অশ্মিতাই ২০২৬ সালের কোরিয়া মাস্টার্স চ্যাম্পিয়ন। ফাইনালে চিনের হান কিয়ান শি-কে ১৪-২১, ২১-১৪, ২১-১৪ গেমে হারিয়ে জীবনের প্রথম বিডব্লিউএফ ওয়ার্ল্ড ট্যুর খেতাব জিতেছেন তিনি। এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে প্রায় দু’বছরের চোট, অর্থকষ্ট, আত্মসংশয় এবং নিজের খেলার ধরন আমূল বদলে ফেলার গল্প।
২০২৪ সালের কোরিয়া ওপেনেই বিপর্যয়ের শুরু। অশ্মিতার কথায়, ‘‘কোরিয়া ওপেনে খেলার সময় আমার মেনিসকাস ছিঁড়ে যায়। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে অস্ত্রোপচার হয়। তার পরে প্রায় আট মাস প্রতিযোগিতামূলক ব্যাডমিন্টন থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল।’’
সেই আট মাস তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলির একটি। খেলতে না পারায় বিশ্ব র্যাঙ্কিং প্রথম ২০০-র বাইরে চলে যায়। বন্ধ হয়ে যায় পৃষ্ঠপোষকদের আর্থিক সহায়তাও। অশ্মিতা বলেন, ‘‘সময়টা অত্যন্ত কঠিন ছিল। আমি খেলতে পারছিলাম না, র্যাঙ্কিং ২০০-র বাইরে চলে গিয়েছিল, সমস্ত স্পনসরশিপ হারিয়েছিলাম। আমার এবং আমার পরিবারের পক্ষে পরিস্থিতিটা মোটেই সহজ ছিল না।’’
বেঙ্গালুরু ছেড়ে গুয়াহাটিতে বাড়ি ফিরে যেতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু কেরিয়ার বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত আবার বাড়ির বাইরেই বেরোতে হয়। যোগ দেন জাতীয় উৎকর্ষ কেন্দ্রে। অশ্মিতার মতে, তাঁর দ্বিতীয় ইনিংস তৈরির ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তই ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
এখন বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ৫০ নম্বরে উঠে আসা অশ্মিতা বলেন, ‘‘২০০-র বাইরে চলে যাওয়ায় আমাকে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছিল।’’
শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি আরও কঠিন ছিল মানসিক লড়াই। আট মাস নিজের সবচেয়ে প্রিয় কাজটি করতে না পারার হতাশা তাঁকে গ্রাস করেছিল। ‘‘চোট পেয়ে যখন আপনি আপনার ভালবাসার কাজটাই করতে পারেন না, তখন মনে হয় জীবন যেন আটকে গিয়েছে। এমন অনেক দিন গিয়েছে যখন কোনও উৎসাহ ছিল না, মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে পড়েছিলাম।’’
আর একটি মন্তব্য দীর্ঘদিন তাঁকে তাড়া করত—‘প্রতিভা আছে, কিন্তু খুব বেশি ভুল করে।’
সেই বদনামটাই মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন অশ্মিতা।
জাতীয় উৎকর্ষ কেন্দ্রে যোগ দেওয়ার পরে তাই শুধু স্ট্রোক বা স্ম্যাশ নয়, নিজের মানসিকতাকেও নতুন করে তৈরি করতে শুরু করেন। বাইরের সমালোচনা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেন। তাঁর উপলব্ধি ছিল, অন্যেরা কী বলছে তা নিয়ে ভাবলে চলবে না। আরও ধৈর্যশীল এবং ধারাবাহিক হতে হবে। কোর্টে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও উন্নত করতে হবে।
তার প্রভাব পড়ে অশ্মিতার আক্রমণাত্মক খেলাতেও। আগে সুযোগ পেলেই দ্রুত আক্রমণে যাওয়াই ছিল তাঁর স্বাভাবিক প্রবণতা। এখন তিনি র্যালি দীর্ঘ করতে প্রস্তুত।
অশ্মিতা বলেন, ‘‘আগে আমার স্বাভাবিক প্রবণতা ছিল সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করা। এখন প্রয়োজনে একটু বেশি সময় র্যালি খেলি। সুযোগ তৈরি হওয়ার অপেক্ষা করি। তার পরে আক্রমণ করি। অর্থাৎ ঠিক মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করতে শিখেছি।’’
তাঁর বাঁ-হাতি স্ট্রোকের দক্ষতা কখনও বড় সমস্যা ছিল না। সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ফিটনেস। পর্যাপ্ত শারীরিক সক্ষমতা না থাকলে তাঁর বিস্ফোরক আক্রমণাত্মক ব্যাডমিন্টন খেলা সম্ভব নয়।
তাই প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় শারীরিক সক্ষমতার উপরে। স্ট্যামিনা, শক্তি, কোর্টে চলাফেরা—সব কিছু নতুন করে গড়ে তুলতে হয়েছে। নিয়মিত এয়ার বাইক, জিম এবং দৌড় ছিল অনুশীলনের অংশ।
‘‘এত দীর্ঘ সময় চোটের কারণে বাইরে থাকার পরে শরীরকে আবার তৈরি করতে সময় লাগে। তাই শক্তিশালী হয়ে ওঠার জন্য আমরা ধারাবাহিক ভাবে কাজ করেছি,’’ বলেন অশ্মিতা।
চোট সেরে গেলেও তার মানসিক ক্ষত সহজে মুছে যায় না। এখনও হাঁটুতে যে স্ট্র্যাপ পরে খেলেন, সেটিও মূলত সতর্কতার জন্য। আট মাস কোর্টের বাইরে থাকার অভিজ্ঞতার পরে আর কোনও অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নিতে চান না তিনি।
বদলেছে খাদ্যাভ্যাসও। চোটের পরে যে খাবারগুলি শরীরের পক্ষে উপযুক্ত নয় বলে মনে হয়েছে, সেগুলি বাদ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিশ্রাম ও শরীরের পুনরুদ্ধারের দিকেও আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবে কোরিয়ায় খেতাব জয়ের পরে সামান্য উদ্যাপন তো হতেই পারে। কোচ পার্কের দেশ কোরিয়া। আর অশ্মিতার খুব পছন্দ সামুদ্রিক খাবার। তাই হাসতে হাসতে তাঁর আবদার, ‘‘আশা করছি কোচ আমাকে একটা ভাল খাওয়াবেন।’’
প্রত্যাবর্তনের লক্ষণ অবশ্য কোরিয়া মাস্টার্সের আগেই দেখা যাচ্ছিল। মালয়েশিয়া সুপার ৫০০ প্রতিযোগিতায় কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিলেন। ম্যাকাও ৩০০-তে পৌঁছেছিলেন সেমিফাইনালে।
এই সময়ে তাঁর বিদেশ সফরের খরচ বহন করেছে জাতীয় উৎকর্ষ কেন্দ্র। স্পনসররা যখন সরে গিয়েছিলেন, তখন এই সহায়তাই তাঁকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ফিরে আসার সুযোগ করে দেয়।
কোরিয়া মাস্টার্সের ফাইনালের শেষ পয়েন্টটি জেতার মুহূর্তটি তাই শুধুই একটি ম্যাচ জয়ের মুহূর্ত ছিল না।
‘‘কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন সব কিছু শূন্য হয়ে গিয়েছিল। সবচেয়ে বড় অনুভূতিটা ছিল স্বস্তির—অবশেষে! আট মাস বাইরে থাকা, চোট, আর্থিক সমস্যা, স্পনসর হারানো এবং আবার ঠিক ভাবে প্রতিযোগিতায় ফিরতে পারব কি না সেই সংশয়—সব কিছুর পরে এই জয় মনে করিয়ে দিল, এত দিনের পরিশ্রম ফল দিতে শুরু করেছে।’’
কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। দ্রুতই তা নতুন ক্ষুধায় বদলে গিয়েছে।
‘‘জেতার পরেই মনে হল, এখানে থামতে চাই না। আরও করতে চাই, আরও জিততে চাই।’’
নিজের এই প্রত্যাবর্তন বাবা-মা, কোচ পার্ক এবং জাতীয় উৎকর্ষ কেন্দ্রের গোটা দলকে উৎসর্গ করেছেন অশ্মিতা। সবচেয়ে কঠিন সময়ে তাঁর বাবা-মাই পাশে ছিলেন। যখন ব্যাডমিন্টন চালিয়ে যাওয়ার অর্থ জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখনও তাঁরা মেয়েকে থামতে দেননি।
কোচ পার্ক এবং জাতীয় উৎকর্ষ কেন্দ্র তাঁকে শুধু পুরনো অশ্মিতায় ফিরিয়ে আনেনি। তৈরি করেছে আরও ধৈর্যশীল, শারীরিক ভাবে শক্তিশালী এবং মানসিক ভাবে পরিণত এক খেলোয়াড়কে।
তাই কোরিয়া মাস্টার্সের ট্রফিটি শুধু অশ্মিতা চালিহার প্রথম বিডব্লিউএফ ওয়ার্ল্ড ট্যুর খেতাব নয়। এটি সেই খেলোয়াড়ের প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা, যাঁকে এক সময় র্যাঙ্কিং, অর্থাভাব, চোট এবং বয়স—সব কিছু মিলিয়ে প্রায় বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
অশ্মিতা অবশ্য নিজেকে বাতিল করেননি।
আর সেখানেই জন্ম হয়েছে ‘অশ্মিতা চালিহা ২.০’-র।