বাংলাস্ফিয়ার: রাজ্যের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সরকারের কড়া অবস্থানেরই প্রতিফলন দেখা গেল শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যে। অতীতে দায়িত্ব পালনকালে কোনও উপাচার্য বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষকর্তা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে জেলেও যেতে হতে পারে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। সরকারের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনওভাবেই দুর্নীতির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হতে দেওয়া হবে না।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। অতীতে যে সব আর্থিক সিদ্ধান্ত, নিয়োগ, টেন্ডার বা অন্যান্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলি প্রয়োজন হলে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পদ বা অতীত পরিচয় কোনও সুরক্ষা দেবে না। আইন তার নিজস্ব পথে চলবে।
সরকারি সূত্রের দাবি, গত কয়েক বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ, আর্থিক লেনদেন, নির্মাণ প্রকল্প, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন অভিযোগকারীরা, কোথাও আবার তদন্তকারী সংস্থাও সক্রিয় হয়েছে। নতুন সরকার সেই সমস্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি দ্রুত করার পক্ষপাতী।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য প্রথম শর্ত হল প্রশাসনিক সততা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান পদে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ নৈতিক মানদণ্ড প্রত্যাশিত। তাই কোনও অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “আইনের চোখে সবাই সমান। উপাচার্য বলেই কেউ ছাড় পাবেন না।”
সরকারের এই মন্তব্যকে ঘিরে উচ্চশিক্ষা মহলে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা শুরু হয়েছে। একাংশের মতে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান স্বাগত। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও অনেক ক্ষেত্রেই তার পরিণতি দেখা যায়নি। ফলে কঠোর বার্তা ভবিষ্যতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
তবে অন্য একটি অংশের আশঙ্কা, দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা বাছাই করা পদক্ষেপ না হয়। তাঁদের মতে, প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসনের প্রশ্নও এই বিতর্কে উঠে এসেছে।
শিক্ষা দফতরের বক্তব্য, সরকারের উদ্দেশ্য কাউকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো নয়; বরং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। এজন্য প্রয়োজনে পুরনো নথি, আর্থিক হিসাব এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শুধু শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নয়, ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের অনিয়ম না ঘটে, তার জন্যও কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
শিক্ষামন্ত্রীর এই কড়া বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, অতীতের অভিযোগও আর ধামাচাপা পড়ে থাকবে না। তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ মিললে প্রাক্তন বা বর্তমান—যে কোনও উপাচার্য কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এর ফলে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক যেমন শুরু হয়েছে, তেমনই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থানও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।