Home SportsFIFA 2026 দাপট এখনও ইউরোপের, উঠে আসছে জাপান

দাপট এখনও ইউরোপের, উঠে আসছে জাপান

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
25 views 5 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • পশ্চিম ইউরোপ এখনও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে শক্তিশালী অঞ্চল।
  • দক্ষিণ আমেরিকা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও আর্জেন্টিনা অনেকটাই লিওনেল মেসিনির ওপর নির্ভরশীল।
  • পূর্ব ইউরোপের পারফরম্যান্স এবার হতাশাজনক।
  • প্রবাসী ফুটবলারদের ওপর নির্ভর করে মরক্কো, কঙ্গো, আলজেরিয়ার মতো দল আরও শক্তিশালী হয়েছে।
  • আরব বিশ্বের বেশিরভাগ দল ব্যর্থ।
  • জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতের নতুন শক্তি হিসেবে উঠে আসছে।

বিশ্বকাপ কেবল দেশগুলোর প্রতিযোগিতা নয়, এটি অঞ্চলগুলোরও লড়াই। সমর্থকদের আবেগও অনেক সময় জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে আঞ্চলিক পরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়। লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ সমর্থক বড় ম্যাচে ঐতিহ্যগতভাবে ব্রাজিলকে সমর্থন করেন, যদিও আর্জেন্টিনা তার ব্যতিক্রম। ২০১০ সালে গোটা আফ্রিকা ঘানার পাশে দাঁড়িয়েছিল, আর ২০২২ সালে আরব বিশ্ব একযোগে সমর্থন করেছিল মরক্কোকে।

এবারের বিশ্বকাপের এক-তৃতীয়াংশের বেশি ম্যাচ শেষ হওয়ার পর প্রশ্ন উঠছে—বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার কেন্দ্র কি বদলাচ্ছে?

এর উত্তর খুঁজতে শুধু মহাদেশভিত্তিক পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়। কারণ এশিয়ার পরিসর যেমন বিশাল, তেমনি ইউরোপের পশ্চিম ও পূর্ব অংশের শক্তির মধ্যে রয়েছে বড় পার্থক্য। তাই অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণই বেশি অর্থবহ।

সাম্প্রতিক দুই দশকে বিশ্বকাপের সবচেয়ে সফল অঞ্চল নিঃসন্দেহে পশ্চিম ইউরোপ। ২০০৬ সালের পর থেকে বিশ্বকাপে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান মিলিয়ে মোট ১৫টি অবস্থানের মধ্যে ১১টিই দখল করেছে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো। বাকি চারটির মধ্যে তিনটি এসেছে আর্জেন্টিনার হাত ধরে এবং একটি ক্রোয়েশিয়ার।

এবারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। প্রথম ২২টি ম্যাচে পশ্চিম ইউরোপের দলগুলো ১৩টি জয়, ৬টি ড্র এবং মাত্র ৩টি হার নিয়ে প্রতি ম্যাচে গড়ে ২.০৫ পয়েন্ট অর্জন করেছে। বিপরীতে পূর্ব ইউরোপের দলগুলো প্রথম সাত ম্যাচে একটি জয়ও পায়নি; তাদের ঝুলিতে মাত্র দুটি ড্র এবং পাঁচটি হার।

বিশ্বকাপে পশ্চিম ইউরোপের প্রভাব আরেকভাবে স্পষ্ট হয়েছে তথাকথিত ‘প্রবাসী দল’-এর উত্থানে। কুরাসাও, গণতান্ত্রিক কঙ্গো, মরক্কো, বসনিয়া, আলজেরিয়া, হাইতি, তিউনিসিয়া এবং কেপ ভার্দের মতো আটটি দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই জন্মেছেন অন্য দেশে—মূলত পশ্চিম ইউরোপে। কুরাসাওয়ের ২৬ জনের দলে ২৫ জনই নেদারল্যান্ডসে জন্মেছেন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ফুটবলারদের ২৩.৬ শতাংশই এমন দেশে জন্মেছেন, যার জাতীয় দলের হয়ে তাঁরা খেলছেন না। ২০০৬ সালে এই হার ছিল মাত্র ৯.৬ শতাংশ।

এই প্রবণতার মূল কারণ পশ্চিম ইউরোপের অসাধারণ খেলোয়াড় তৈরির কাঠামো। সামাজিক কল্যাণভিত্তিক ব্যবস্থার কারণে ছোটবেলা থেকেই সুলভে ফুটবল শেখার সুযোগ তৈরি হয়। আধুনিক ফুটবলে বল ছাড়া অবস্থান নেওয়ার কৌশল, দলগত শৃঙ্খলা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শিশু বয়স থেকেই গড়ে ওঠে। ফলস্বরূপ, এবারের বিশ্বকাপে একাই ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ৯৮ জন এবং নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া ৬৭ জন ফুটবলার বিভিন্ন দেশের হয়ে খেলছেন।

মরক্কো এই প্রবাসী শক্তির সবচেয়ে সফল উদাহরণ। ব্রাজিলের বিপক্ষে তাদের প্রথম একাদশে মরক্কোতে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড় ছিলেন মাত্র একজন। অধিনায়ক আশরাফ হাকিমির জন্ম স্পেনের মাদ্রিদে। তিনি চাইলে স্পেনের জাতীয় দলেও খেলতে পারতেন। একইভাবে দলের অন্যতম তারকা ইসমাইল সাইবারিও বেলজিয়ামের হয়ে খেলার যোগ্য ছিলেন।

দক্ষিণ আমেরিকা এখনও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রধান শক্তি হলেও আগের মতো প্রভাবশালী নয়। প্রথম ১১ ম্যাচে তাদের দলগুলো পাঁচটি জয়, চারটি ড্র এবং দুটি হার নিয়ে প্রতি ম্যাচে গড়ে ১.৭৩ পয়েন্ট সংগ্রহ করেছে।

তবে এই সাফল্যের বড় অংশই এসেছে লিওনেল মেসির অসাধারণ নৈপুণ্যে। ৩৯ বছরে পা দিতে চলা মেসিই আর্জেন্টিনার প্রথম দুই জয়ে দলের পাঁচটি গোলের সবকটিই করেছেন। অন্যদিকে ব্রাজিলসহ বেশিরভাগ দক্ষিণ আমেরিকান দল ইউরোপীয় দলগুলোর তুলনায় ধীরগতির ফুটবল খেলছে, বল ছাড়া দৌড় কম দিচ্ছে এবং উচ্চচাপের রক্ষণে পিছিয়ে রয়েছে। ইকুয়েডর কুরাসাওকে হারাতে পারেনি, আর উরুগুয়ে কেপ ভার্দের বিপক্ষে হারের হাত থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে।

মরক্কোকে বাদ দিলে আরব বিশ্বের চিত্র সবচেয়ে হতাশাজনক। আরবি ভাষাভাষী দেশগুলোর দল প্রথম ১৬ ম্যাচে মাত্র তিনটি জয় পেয়েছে। চারটি ড্রয়ের বিপরীতে হেরেছে নয়টি ম্যাচ। প্রতি ম্যাচে তাদের গড় পয়েন্ট মাত্র ০.৮১। তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, কাতার, সৌদি আরব এবং ইরাক একাধিকবার তিন বা তার বেশি গোলের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে।

অন্যদিকে একটি ভিন্ন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে ইংরেজিভাষী দেশগুলোর মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড—এই দলগুলোকে অনেক বিশ্লেষক একই গোষ্ঠী হিসেবে দেখছেন। ইংল্যান্ড বাদ দিলে তাদের কারিগরি দক্ষতা ইউরোপের সেরাদের মতো নয়। কিন্তু শারীরিক শক্তি, দ্রুত গতি এবং নিরবচ্ছিন্ন চাপের ফুটবলে তারা কার্যকর। এ পর্যন্ত তারা প্রতি ম্যাচে গড়ে ১.৮২ পয়েন্ট অর্জন করেছে, যা দক্ষিণ আমেরিকার গড়ের চেয়েও বেশি। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা স্বাগতিক হওয়ায় কিছু বাড়তি সুবিধাও পাচ্ছে।

তবু বিশ্বকাপ জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার এখনও ঐতিহ্যবাহী শক্তিগুলোই। ক্রীড়া অর্থনীতিবিদ স্টেফান সিজমানস্কি এবং তাঁর সহলেখকদের গবেষণা বলছে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই সাফল্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো শতাধিক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলছে, যা এখনও তাদের বড় সম্পদ।

তবে ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দুটি দেশের নাম বিশেষভাবে উঠে আসে—জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র। নব্বইয়ের দশক থেকে পরিকল্পিতভাবে ফুটবলে বিনিয়োগ করে তারা ধারাবাহিক উন্নতি করেছে। বড় অর্থনীতি, বিশাল জনসংখ্যা এবং আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা তাদের বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।

বিশেষ করে জাপানের অগ্রগতি নজরকাড়া। ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে তারা টানা ১০টি ম্যাচে অপরাজিত। নকআউট পর্বে তাদের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ ব্রাজিল হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ম্যাচেও জাপানকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

সাবেক সুইডিশ কিংবদন্তি জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র কি একদিন বিশ্বকাপ জিততে পারে? তাঁর এক শব্দের উত্তর ছিল—“হ্যাঁ”।

এখনও বিশ্ব ফুটবলের মুকুট পশ্চিম ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার হাতেই। কিন্তু নতুন শক্তির আবির্ভাব, প্রবাসী ফুটবলারদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং এশিয়ার উন্নতি ইঙ্গিত দিচ্ছে—আগামী দশকে বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্র আর আগের মতো থাকবে না।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles