Table of Contents
মেক্সিকোর তাপ ও উচ্চতা থেকে ২০২৬-এর চ্যালেঞ্জ—ইতিহাস বলছে, প্রস্তুত দলই এগিয়ে থাকে
হাইলাইটস
- ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের আগে উচ্চতা ও গরমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বিচিত্র সব পদ্ধতি নিয়েছিল দলগুলি।
- বুলগেরিয়া খেলোয়াড়দের কম জল খাইয়ে ‘ডিহাইড্রেশনের’ মধ্যে খেলতে অভ্যস্ত করার চেষ্টা করেছিল।
- ইংল্যান্ড নিজেদের খাবার, জল ও বাস পর্যন্ত মেক্সিকোতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
- ব্রাজিল সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক ও সুসংগঠিত প্রস্তুতি নিয়েছিল, যার ফল তারা মাঠে পেয়েছিল।
- ২০২৬ বিশ্বকাপেও আবহাওয়া, ভ্রমণ ও শারীরিক প্রস্তুতি বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বকাপে প্রতিভা, কৌশল এবং ভাগ্য—সবকিছুরই গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, সঠিক প্রস্তুতি প্রায়শই সেই সূক্ষ্ম পার্থক্য তৈরি করে দেয় যা একটি দলকে চ্যাম্পিয়ন আর অন্য দলকে ব্যর্থতায় পরিণত করে।
১৯৭০ সালের বিশ্বকাপের কথা ধরা যাক। আসর বসেছিল মেক্সিকোয়। সেই সময় ফুটবল বিশ্বে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল দুটি বিষয়—প্রচণ্ড গরম এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত শহরগুলির পরিবেশ। মেক্সিকো সিটি, মনতেরে এবং গুয়াদালাহারার মতো শহরে খেলতে গেলে খেলোয়াড়দের শরীরকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হতো।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বুলগেরিয়া এক অভিনব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা রাজধানী সোফিয়ার দক্ষিণে পিরিন পর্বতমালায় প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে তোলে। উদ্দেশ্য ছিল খেলোয়াড়দের উচ্চতাজনিত পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত করা। কিন্তু সমস্যা হল, সেখানে তাপমাত্রা ছিল প্রায় হিমাঙ্কের কাছাকাছি, যেখানে মেক্সিকোয় অপেক্ষা করছিল উষ্ণ আবহাওয়া।
তখন কোচিং স্টাফের মাথায় আসে এক অদ্ভুত বুদ্ধি। খেলোয়াড়দের জলপান সীমিত করে দেওয়া হয়, যাতে তারা শরীরে জলের ঘাটতি নিয়ে খেলার অভ্যাস তৈরি করতে পারে। বাস্তবে এই পরিকল্পনা কার্যত ব্যর্থ হয়। বুলগেরিয়া প্রথম দুই ম্যাচেই হেরে যায় এবং মরক্কোর সঙ্গে ড্র করার আগেই টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়ে।
সেই সময় বেশিরভাগ দেশই বিশ্বাস করত, মেক্সিকোর উচ্চতায় খেলার প্রস্তুতির একমাত্র উপায় হল উঁচু জায়গায় অনুশীলন করা। ইসরায়েল গিয়েছিল ইথিওপিয়া ও কলোরাডোতে। উরুগুয়ে খেলেছিল কুইটো ও বোগোটায়। স্বাগতিক মেক্সিকো তো পাঁচ মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ শিবিরই চালিয়েছিল, যার মধ্যে ছিল অসংখ্য আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডের উদ্বেগ ছিল আরও বেশি। দলীয় চিকিৎসক নীল ফিলিপস গরম, উচ্চতা এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। খেলোয়াড়দের লবণের ট্যাবলেট খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এমনকি এভারেস্ট জয়ী অভিযাত্রী স্যার এডমন্ড হিলারির দলের সঙ্গে কাজ করা ফিজিওলজিস্ট ড. গ্রিফিথ পিউকেও পরামর্শদাতা হিসেবে আনা হয়।
কিন্তু বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতির পাশাপাশি ছিল কিছু অদ্ভুত সিদ্ধান্তও।
ইংল্যান্ডের ম্যানেজার আলফ র্যামসি বিদেশি পরিবেশ নিয়ে অত্যন্ত সন্দিহান ছিলেন। ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইংল্যান্ডের পরাজয়ের স্মৃতি তাঁর মনে গভীরভাবে গেঁথে ছিল। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, দল নিজেদের বাস, খাবার এবং পানীয় জল পর্যন্ত ইংল্যান্ড থেকে নিয়ে যাবে।
মেক্সিকোর কর্তৃপক্ষ এই আচরণে ক্ষুব্ধ হয়। তারা অজুহাত দেয় যে ব্রিটেনে পশুর মুখ ও খুর রোগ ছড়িয়েছে। ফলে ইংল্যান্ডের আনা জমাট মাংস বন্দরে আটকে দেওয়া হয় এবং পরে পুড়িয়ে ফেলা হয়। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডকে নির্ভর করতে হয় প্রস্তুত খাবার ও ফ্রোজেন ফিশ ফিঙ্গারের উপর।
ইংল্যান্ডের প্রস্তুতি শিবির ছিল এতটাই নিয়ন্ত্রিত যে র্যামসি নিজে সুইমিংপুলের ধারে বসে স্টপওয়াচ হাতে খেলোয়াড়দের রোদ পোহানোর সময় মাপতেন। কুড়ি মিনিট হয়ে গেলে তিনি বাঁশি বাজিয়ে খেলোয়াড়দের শরীরের অন্য দিক ঘোরাতে বলতেন।
তবে ইংল্যান্ডের প্রস্তুতিকে ছাপিয়ে গিয়েছিল আরেকটি দল—ব্রাজিল।
আজও অনেকের মনে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল মানেই যেন সমুদ্রসৈকতে বড় হয়ে ওঠা কিছু স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিভার গল্প। বাস্তব কিন্তু সম্পূর্ণ উল্টো। ১৯৫৮ থেকে ১৯৭০-এর মধ্যে চারটি বিশ্বকাপের মধ্যে তিনটি জয়ী ব্রাজিলের সাফল্যের ভিত ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা ও বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি।
১৯৬৯ সালের শেষ দিকে কোচ জোয়াও সালদানহা দুই সেনা কর্মকর্তা ক্লদিও কৌতিনিয়ো এবং লামার্তিন দা কস্তার সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁরা দু’জনেই ১৯৬৮ মেক্সিকো অলিম্পিক পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং জানতেন যে শুধুমাত্র ফুটবল দক্ষতা নয়, পরিবেশগত পরিস্থিতির সঙ্গেও লড়াই করতে হবে।
ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা টুর্নামেন্টের আগে প্রায় ১০০ দিন সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কাটিয়েছিলেন। প্রতিটি বিষয় খুঁটিনাটি পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। খেলোয়াড়দের জার্সি ও পোশাক ব্যক্তিগত মাপে তৈরি করা হয়। এমনকি কলারের নকশাও এমনভাবে করা হয়েছিল যাতে ঘাম জমে না থাকে।
ফিটনেস পরিমাপের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল কুপার টেস্ট, যেখানে ১২ মিনিটে একজন খেলোয়াড় কত দূর দৌড়াতে পারেন তা মাপা হয়। ব্রাজিল দল নিজেদের প্রথম ম্যাচের ৩২ দিন আগে থেকেই মেক্সিকো সিটিতে পৌঁছে গিয়েছিল, যাতে শরীর সম্পূর্ণভাবে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।
ফলাফল ছিল চোখে পড়ার মতো। ১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিল যে ১৯টি গোল করেছিল, তার ১২টিই এসেছিল দ্বিতীয়ার্ধে। অর্থাৎ ম্যাচ যত এগিয়েছে, প্রতিপক্ষের তুলনায় তারা তত বেশি শক্তিশালী থেকেছে। শারীরিক সক্ষমতা এবং পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন তাদের বাড়তি সুবিধা দিয়েছিল।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপের প্রেক্ষাপট অবশ্য ভিন্ন। আধুনিক ফুটবলের ব্যস্ত সূচি কোনও দলকেই চার মাসের বিচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ শিবিরের সুযোগ দেবে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো জুড়ে বিস্তৃত বিশাল ভৌগোলিক পরিসর, দীর্ঘ বিমানযাত্রা, বিভিন্ন জলবায়ু এবং ভিন্ন উচ্চতার শহর—এসবই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
ফুটবলে অনিশ্চয়তা সবসময়ই থাকে। একটি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হতে পারে একটি মুহূর্ত, একটি ভুল কিংবা একটি অসাধারণ দক্ষতায়। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—যে দল প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকে, তার সফল হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেশি।
কারণ বিশ্বকাপ শুধু প্রতিভার পরীক্ষা নয়; এটি সহনশীলতা, পরিকল্পনা এবং অভিযোজন ক্ষমতারও পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় সফল হতে হলে, ব্রাজিলের মতো প্রস্তুতি নিতে হয়—ইংল্যান্ডের ফ্রোজেন ফিশ ফিঙ্গারের উপর ভরসা করে নয়।