বাংলাস্ফিয়ার: কয়েক দিন আগেও দিল্লির যন্তর মন্তর ছিল দেশের ছাত্র আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। দিনরাত চলছিল অনশন, প্রতিবাদ, স্লোগান, আলোচনা আর সংহতির কর্মসূচি। রবিবার সেই যন্তর মন্তরের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে গেল। প্রশাসনের উদ্যোগে সরিয়ে ফেলা হয়েছে অনশনমঞ্চ, ত্রিপল, ব্যানার, পোস্টার, বাঁশের কাঠামো ও অন্যান্য অস্থায়ী ব্যবস্থা। গোটা এলাকা পরিষ্কার করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের চিহ্ন মুছে গেলেও তার রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত এখনও স্পষ্ট।
শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ, পরীক্ষায় স্বচ্ছতা এবং ছাত্রদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার দাবিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে যন্তর মন্তরে অবস্থান-বিক্ষোভ চলেছিল। সেই আন্দোলনের চাপেই শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। পাশাপাশি পরীক্ষা সংস্কারের জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্ক ফোর্স গঠনের ঘোষণা এবং কঠোর আইন আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়। ফলে আন্দোলনকারীদের একাংশ এই আন্দোলনকে একটি ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবেই দেখছেন।
রবিবার সকালে দিল্লি পুরসভার কর্মীরা যন্তর মন্তরে পৌঁছে পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন। আন্দোলনের সময় তৈরি হওয়া অস্থায়ী কাঠামো খুলে ফেলা হয়। সাফ করা হয় মাটিতে পড়ে থাকা পোস্টার, প্ল্যাকার্ড, প্লাস্টিকের চেয়ার, দড়ি ও অন্যান্য সামগ্রী। পুলিশও গোটা এলাকায় নজরদারি বজায় রাখে। কোথাও কোনও উত্তেজনার ঘটনা ঘটেনি।
তবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বহু ছাত্রছাত্রী ও স্বেচ্ছাসেবক রবিবারও যন্তর মন্তরে আসেন। কেউ খালি জায়গার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, কেউ আবার শেষবারের মতো সেই স্থানটিকে ঘুরে দেখেন। তাঁদের অনেকের চোখে ছিল আবেগ। একজন ছাত্র বলেন, “আজ এখানে কোনও মঞ্চ নেই, কিন্তু এখান থেকেই আমরা বুঝেছি যে শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনও পরিবর্তন আনতে পারে।”
কয়েকজন ছাত্র ছোট ছোট দলে বসে আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। তাঁদের বক্তব্য, এটি কেবল একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের আন্দোলন ছিল না; দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য ও ছাত্রবান্ধব করার দাবিই ছিল মূল লক্ষ্য। সেই লড়াই এখনও শেষ হয়নি।
সোনম ওয়াংচুকের সমর্থকদের বক্তব্যও একই। তাঁদের মতে, সরকারের ঘোষণাগুলি গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সেগুলি কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার উপর। প্রশ্নপত্র ফাঁস, মূল্যায়নের স্বচ্ছতা, কোচিং-নির্ভর শিক্ষা এবং পরীক্ষার চাপ—এই সমস্যাগুলির স্থায়ী সমাধান না হলে আন্দোলনের উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে না।
রাজনৈতিক মহলেও যন্তর মন্তরের আন্দোলন নিয়ে আলোচনা অব্যাহত। বিরোধীদের দাবি, ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ ও ধারাবাহিক আন্দোলনই সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। অন্যদিকে কেন্দ্রের বক্তব্য, সরকার শুরু থেকেই পরীক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল এবং ছাত্রদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়েই সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনের আসল তাৎপর্য অন্যত্র। দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার অনিয়ম, কোচিং-নির্ভরতা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ নিয়ে যে অসন্তোষ জমে উঠছিল, যন্তর মন্তর সেই ক্ষোভকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ফলে শিক্ষা সংস্কারের প্রশ্ন এখন আর কেবল ছাত্রদের দাবি নয়, জননীতির অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
আজ যন্তর মন্তরে নেই স্লোগানের ঢেউ, নেই অনশনমঞ্চ, নেই হাজার হাজার মানুষের সমাবেশ। কিন্তু যে আন্দোলন এই প্রাঙ্গণকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল, তার স্মৃতি এখনও অমলিন। পরিষ্কার হয়ে যাওয়া মাঠ যেন নীরবে মনে করিয়ে দিচ্ছে—প্রতিবাদের মঞ্চ ভেঙে ফেলা যায়, কিন্তু গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রভাব ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায় না।