হাইলাইটস
- বিশ্বকাপ এলেই পাল্টে যায় কলকাতার চেহারা; শহর যেন ফুটবলের এক মহোৎসবে মেতে ওঠে।
- ফরিয়াপুকুর, শ্যামবাজার, উত্তর কলকাতার অলিগলিতে ফুটবল কিংবদন্তিদের বিশাল দেয়ালচিত্র দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্র।
- রাতভর চায়ের দোকান, ক্লাব ও পাড়ার মোড়ে বড় পর্দায় সরাসরি খেলা দেখার রেওয়াজ এখনও অটুট।
- আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা শহরের বিশ্বকাপ সংস্কৃতিকে অনন্য করে তুলেছে।
- বিশ্বকাপের আবহে কলকাতা শুধু একটি শহর নয়, ফুটবলের এক জীবন্ত জাদুঘর।
বিশ্বকাপ এলেই পৃথিবীর বহু শহর ফুটবলের রঙে রাঙিয়ে ওঠে। কিন্তু কলকাতার উন্মাদনার সঙ্গে তুলনা চলে এমন শহর খুব কম। এখানে বিশ্বকাপ শুধু একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি এক সামাজিক উৎসব, এক সাংস্কৃতিক পরম্পরা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা আবেগের উত্তরাধিকার। জুন-জুলাই মাস এলেই উত্তর থেকে দক্ষিণ, গলি থেকে প্রধান সড়ক—সবখানেই ফুটবলের স্পন্দন অনুভব করা যায়।
উত্তর কলকাতার ফরিয়াপুকুর এই বিশ্বকাপ আবহের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। এখানকার পুরনো বাড়ির দেয়ালগুলো যেন ক্যানভাসে পরিণত হয়। কখনও দেখা যায় আকাশছোঁয়া লিওনেল মেসি, কখনও কিলিয়ান এমবাপে, কখনও বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কিংবা পেলের প্রতিকৃতি। স্থানীয় শিল্পীরা দিনের পর দিন পরিশ্রম করে এই দেয়ালচিত্র তৈরি করেন। বিশ্বকাপ শেষ হলেও বহু চিত্র বছরের পর বছর থেকে যায়, যেন শহরের ফুটবল-স্মৃতির স্থায়ী দলিল।
ফরিয়াপুকুরের এই শিল্পচর্চা নিছক সাজসজ্জা নয়। এটি এক ধরনের জনশিল্প, যেখানে শিল্পী, স্থানীয় বাসিন্দা ও ফুটবলপ্রেমীরা একসঙ্গে অংশ নেন। শিশুরা রং মেশায়, তরুণেরা মই ধরে, প্রবীণরা বসে গল্প করেন—এভাবেই একটি দেয়াল হয়ে ওঠে সমগ্র পাড়ার যৌথ সৃষ্টি। দর্শনার্থীরা ছবি তুলতে আসেন, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সেই সব ছবি, আর কলকাতার ফুটবলপ্রেম আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে আসে।
শুধু দেয়ালচিত্র নয়, শহরের অলিগলিতে উড়তে শুরু করে বিভিন্ন দেশের পতাকা। কোথাও নীল-সাদা, কোথাও হলুদ-সবুজ, কোথাও আবার ফরাসি তেরঙা। অনেক পাড়ায় রাস্তার এক দিক আর্জেন্টিনার, অন্য দিক ব্রাজিলের রঙে সাজানো থাকে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হলেও তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বন্ধুত্বপূর্ণ। ম্যাচের আগে ঠাট্টা, খোঁচা, বাজি—সবই চলে, কিন্তু খেলা শেষ হলে সবাই আবার একই চায়ের দোকানে বসে বিশ্লেষণে মেতে ওঠেন।
কলকাতার চায়ের দোকানগুলিও বিশ্বকাপের সময় যেন ক্ষুদ্র স্টেডিয়ামে পরিণত হয়। ছোট্ট টেলিভিশন, বড় পর্দা বা প্রজেক্টর—যা-ই থাকুক, রাতভর দর্শকদের ভিড় লেগেই থাকে। খেলা যদি গভীর রাতে হয়, তবুও দোকান খোলা থাকে। এক কাপ চা, বিস্কুট, সিঙাড়া কিংবা ডিম-টোস্টের সঙ্গে চলে কৌশল, দল নির্বাচন, রেফারির সিদ্ধান্ত এবং সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক। অনেকেই বলেন, কলকাতার ফুটবল-আলোচনার মান কোনও টেলিভিশন স্টুডিয়োর বিশ্লেষণের চেয়ে কম নয়।
পাড়ার ক্লাবগুলিও বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিশেষ প্রস্তুতি নেয়। বড় পর্দা বসানো, আসনের ব্যবস্থা, পতাকা টাঙানো, সমর্থকদের জন্য প্রতিযোগিতা, শিশুদের আঁকাবুকি কিংবা ফুটবল কুইজ—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। বহু ক্লাব ম্যাচের বিরতিতে স্থানীয় শিল্পীদের গান বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আয়োজন করে। ফলে বিশ্বকাপ এখানে শুধুই খেলা নয়, এক পূর্ণাঙ্গ সামাজিক অনুষ্ঠান।
কলকাতার এই ফুটবল-সংস্কৃতির শিকড় অনেক গভীরে। ঔপনিবেশিক যুগ থেকে শুরু করে ময়দানের শতবর্ষের ঐতিহ্য, বড় ক্লাবগুলির প্রতিদ্বন্দ্বিতা, স্থানীয় লিগের জনপ্রিয়তা—সবকিছু মিলিয়ে ফুটবল এই শহরের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। সেই কারণেই বিশ্বকাপ এলে আন্তর্জাতিক তারকারাও যেন কলকাতার ঘরের মানুষ হয়ে ওঠেন। মেসির গোলে যেমন উল্লাসে ফেটে পড়ে শহর, তেমনই রোনালদোর বিদায়ে চোখ ভিজে ওঠে অসংখ্য সমর্থকের।
এই আবেগের আরেকটি দিক হল প্রজন্মের মেলবন্ধন। দাদু যে দলের সমর্থক ছিলেন, নাতিও অনেক সময় সেই দলের পতাকা হাতে রাস্তায় নামে। আবার নতুন প্রজন্ম সামাজিক মাধ্যমে বিশ্বকাপের মুহূর্ত ভাগ করে নেয়, কিন্তু খেলা দেখার জন্য তারা এখনও পাড়ার ক্লাব বা চায়ের দোকানেই জড়ো হতে ভালোবাসে। প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু একসঙ্গে খেলা দেখার সংস্কৃতি বদলায়নি।
বিশ্বকাপের সময় কলকাতার অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়ে। পতাকা, জার্সি, বাঁশি, ফুটবল, ব্যানার, মুখে আঁকার রং—সবকিছুর বিক্রি বেড়ে যায়। ছোট ব্যবসায়ী, শিল্পী, মুদ্রণ সংস্থা, খাবারের দোকান—অনেকেরই আয় বাড়ে। স্থানীয় শিল্পীরা বিশেষ করে দেয়ালচিত্র ও ব্যানার তৈরির কাজ পেয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে এই উৎসব বহু মানুষের জীবিকাকেও স্পর্শ করে।
বিশ্বকাপের সময় বিদেশি সংবাদমাধ্যমও বারবার কলকাতার দিকে নজর দেয়। তারা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখে, হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি শহর কীভাবে অন্য দেশের দলের জন্য এমন আবেগে মেতে উঠতে পারে। অনেক বিদেশি পর্যটকও এই সময় কলকাতায় এসে পাড়ার ক্লাব বা রাস্তার বড় পর্দায় বসে খেলা দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তাদের কাছে এটি একেবারেই অনন্য।
বিশ্বায়নের যুগে বহু শহরের স্থানীয় সংস্কৃতি ধীরে ধীরে একরকম হয়ে গেলেও কলকাতা এখনও নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখেছে। এখানে বিশ্বকাপ মানে শুধু টেলিভিশনের সামনে বসে খেলা দেখা নয়; মানে রঙে রাঙানো দেয়াল, রাতভর চায়ের আড্ডা, পাড়ার ক্লাবের উচ্ছ্বাস, পতাকায় মোড়া রাস্তা এবং প্রজন্মান্তরে বয়ে চলা ফুটবলের প্রেম। সেই কারণেই ফরিয়াপুকুরের দেয়ালচিত্র থেকে শুরু করে রাত জেগে চায়ের দোকানে সরাসরি ম্যাচ দেখা—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের উন্মাদনায় কলকাতা আজও বিশ্বের অন্যতম অদ্বিতীয় শহর।