হাইলাইটস:
- আয়োজক দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ইতিহাসের প্রথম দল ছিল ইরান।
- যুদ্ধ, ভিসা-নিষেধাজ্ঞা, নির্বাসিত শিবির ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের আবহে কেটেছে পুরো বিশ্বকাপ।
- তিনটি ম্যাচেই ড্র করেও শেষ মুহূর্তে অস্ট্রিয়া-আলজেরিয়ার ফলাফলে বিদায় নিশ্চিত হয় ইরানের।
- যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের তীব্র সমালোচনা করলেও মেক্সিকোর আতিথেয়তার ভূয়সী প্রশংসা করেছে ইরান ফুটবল ফেডারেশন।
- অধিনায়ক মেহদি তারেমির কটাক্ষ, “এটি একটি বিপর্যস্ত বিশ্বকাপ। ফিফা শুরু থেকেই সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে।”
সাম্প্রতিক বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে আলোড়ন তোলা অভিযানের অবসান ঘটল শনিবার গভীর রাতে। শেষ মুহূর্তে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার ৩-৩ ড্রয়ের ফলে মাঠে না নেমেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হল ইরানকে। কয়েক মাস ধরে যুদ্ধ, কূটনৈতিক টানাপোড়েন, ভিসা-সংকট, নির্বাসিত জীবন এবং প্রবাসী ইরানিদের বিক্ষোভে ঘেরা যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার সমাপ্তিও হল একই রকম নাটকীয়ভাবে।
এই বিশ্বকাপে ইরান একটি অনন্য ইতিহাসও গড়েছিল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার কোনও দল এমন একটি দেশের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থায় থেকেও সেই দেশ আয়োজিত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হামলার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল, আদৌ ইরান বিশ্বকাপে খেলতে পারবে কি না। তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরস্পরবিরোধী বার্তায় দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের ঘরোয়া ফুটবল লিগ স্থগিত হয়ে যাওয়ায় জাতীয় দলকে কয়েক সপ্তাহ দক্ষিণ তুরস্কে অনুশীলন করতে হয়। পরে নতুন সমস্যা দেখা দেয় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিয়ে। প্রথম পর্বের তিনটি ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রে হলেও দলটি সেখানে স্থায়ী শিবির গড়ার অনুমতি পায়নি। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তঘেঁষা তিহুয়ানায় অস্থায়ী শিবির গড়ে ইরান। দলের কয়েকজন কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মীর ভিসার আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়।
মাঠের বাইরের এই উত্তেজনা গড়িয়ে পড়ে স্টেডিয়ামেও। লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত দুটি ম্যাচে বিপুল সংখ্যক ইরানি বংশোদ্ভূত দর্শক উপস্থিত ছিলেন। একদিকে তাঁরা নিজেদের দেশের দলকে প্রাণভরে সমর্থন করেছেন, অন্যদিকে তেহরানের শাসকব্যবস্থার বিরুদ্ধেও সরব হয়েছেন। জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর সময় প্রবল দুয়োধ্বনি শোনা যায়। অনেকেই ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব-পূর্ব ইরানের পতাকা ও প্রতীক বহন করে প্রতিবাদের বার্তা দেন। সিয়াটলে শেষ ম্যাচেও একই চিত্র দেখা যায়। কেউ কেউ জাতীয় সঙ্গীত চলাকালীন প্রতিবাদ জানিয়ে মাঠের দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
তবে রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও ইরান মাঠে লড়াই চালিয়ে যায়। প্রথম পর্বের তিনটি ম্যাচই ড্র করে তারা। ফলে শেষ গ্রুপ ম্যাচগুলির ফলাফলের ওপর নির্ভর করছিল তাদের ভাগ্য। শনিবার তিহুয়ানায় বসেই অস্ট্রিয়া-আলজেরিয়ার ম্যাচ দেখছিলেন ইরানি ফুটবলাররা। ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে আলজেরিয়ার গোল হয়ে ৩-৩ সমতা ফিরতেই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যায় ইরান।
বিদায়ের পর ইরান ফুটবল ফেডারেশন এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের তীব্র সমালোচনা করে। তাদের অভিযোগ, গোটা টুর্নামেন্টে ইরানের সঙ্গে “অন্যায্য ও খেলোয়াড়সুলভ আচরণের পরিপন্থী” ব্যবহার করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বহু ইরানি সমর্থক একই অভিযোগ তোলেন।
অন্যদিকে মেক্সিকোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেনি ইরান। ফেডারেশনের বিবৃতিতে বলা হয়, “আপনারা আমাদের যে আন্তরিকতা ও উদারতার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন, তাতে আমরা নিজেদের ঘরের মানুষ বলেই অনুভব করেছি। মহান ও উদার মেক্সিকোর জনগণ এবং সরকারকে আমরা চিরকাল কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করব।”
আসলে তিহুয়ানায় ইরান অপ্রত্যাশিত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। স্থানীয় মানুষ প্রতিদিন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের পথে দলকে অভ্যর্থনা জানাতেন। মারিয়াচি সঙ্গীতশিল্পীরাও হাজির হতেন। মেক্সিকোর শীর্ষ রাজনীতিকরা এবং দেশের রাষ্ট্রপতিও ইরান দলকে শুভেচ্ছা জানান। যুক্তরাষ্ট্রে নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়লেও প্রতিবেশী মেক্সিকো তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা দিয়েছিল।
ইরানের বিদায়ে বিশ্বকাপের অন্যতম বড় রাজনৈতিক জটিলতারও আপাত অবসান হল। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে ইরানের জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই চাপে ছিল বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।
মিশরের বিরুদ্ধে ১-১ ড্রয়ের পর ইরানের অধিনায়ক মেহদি তারেমি সরাসরি ফিফা ও সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সমালোচনা করেন। তাঁর কথায়, “এটি একটি বিপর্যস্ত বিশ্বকাপ। শুরু থেকেই এত সমস্যা ছিল, কিন্তু ফিফা কোনওটিরই সমাধান করতে পারেনি।” তারেমির এই মন্তব্যের জবাবে ফিফা কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের দল হিসেবে ইরানের এই বিশ্বকাপ অভিযান তাই কেবল ফুটবলের গল্প নয়; এটি কূটনীতি, রাজনীতি, পরিচয়, প্রতিবাদ এবং খেলাধুলার জটিল সম্পর্কের এক বিরল দলিল হয়ে রইল।