হাইলাইটস:
- ১৭ জুন থেকে তিন সপ্তাহের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হরমুজ প্রণালী পারাপারের অনুমতি চাওয়া জাহাজের ৪০ শতাংশই ভারত বা চীনের উদ্দেশে কিংবা সেখান থেকে আসছিল।
- পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল এখন কঠোর নজরদারির আওতায়।
- ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- তেলবাহী ট্যাঙ্কার, এলএনজি পরিবহণকারী জাহাজ এবং পণ্যবাহী জাহাজ সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছে।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ১৭ জুন থেকে পরবর্তী তিন সপ্তাহের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রণালী অতিক্রমের জন্য অনুমতি চাওয়া মোট জাহাজের প্রায় ৪০ শতাংশই ভারত অথবা চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে যুক্ত ছিল। অর্থাৎ এই দুই দেশই বর্তমানে হরমুজ প্রণালী-নির্ভর সমুদ্রবাণিজ্যের সবচেয়ে বড় অংশীদার।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সমুদ্রপথ। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সরু জলপথ দিয়েই সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত, কাতার এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। দেশের মোট তেল আমদানির বড় অংশই পশ্চিম এশিয়া থেকে আসে এবং তার অধিকাংশ জাহাজকে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে হয়। একইভাবে বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক চীনের ক্ষেত্রেও এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী প্রতিটি জাহাজের নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। বিভিন্ন শিপিং সংস্থা অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে। অনেক ক্ষেত্রে জাহাজকে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট রুট ধরে চলার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতমুখী জাহাজের মধ্যে রয়েছে অপরিশোধিত তেলবাহী সুপারট্যাঙ্কার, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী জাহাজ, রাসায়নিক পণ্যবাহী জাহাজ এবং সাধারণ কনটেনারবাহী জাহাজ। চীনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালীতে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও তার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত পড়ে। অতীতে একাধিকবার দেখা গেছে, এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে বেড়েছে। কারণ বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের উল্লেখযোগ্য অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
ভারতের জন্য এর তাৎপর্য আরও বেশি। দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভরতা অত্যন্ত বেশি হওয়ায় হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হলে শুধু জ্বালানির দামই বাড়বে না, পরিবহণ ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে, শিপিং শিল্পে বীমা ব্যয়ও বাড়ছে। যুদ্ধঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে প্রবেশকারী জাহাজের জন্য অতিরিক্ত ‘ওয়ার রিস্ক প্রিমিয়াম’ দিতে হচ্ছে। ফলে আমদানি-রফতানির সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভারতীয় বাণিজ্য মহলের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শুধু জ্বালানি নয়, সার, রাসায়নিক, প্লাস্টিকের কাঁচামাল এবং বিভিন্ন শিল্প উপকরণের সরবরাহেও চাপ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত দেশের উৎপাদন ও ভোক্তা বাজারে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ না হলেও নিরাপত্তা-নির্ভর নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কারণে যাত্রার সময় বেড়ে যেতে পারে। ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলেও বিলম্বের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
ভারত ইতিমধ্যেই জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প উৎস বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে পশ্চিম এশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা এখনও এতটাই বেশি যে হরমুজ প্রণালীতে যেকোনও বড় অস্থিরতা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে, হরমুজ প্রণালী শুধু পশ্চিম এশিয়ার একটি জলপথ নয়; এটি ভারত ও চীনের মতো এশিয়ার দুই বৃহৎ অর্থনীতির জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ জীবনরেখা। তাই এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং নীতিনির্ধারকদের নজর আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় বেশি।