হাইলাইটস

  • নতুন সাংগঠনিক কমিটি ঘোষণার পরও তৃণমূলে কোনও মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলল না।
  • এত বিতর্ক ও সংকটের পরেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান কার্যত অপরিবর্তিত রইল।
  • নতুন কমিটিতে স্বাধীন মত বা আত্মসমালোচনার সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী মুখ প্রায় নেই বললেই চলে।
  • অধিকাংশ মনোনয়ন নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে হয়েছে বলেই সমালোচকদের দাবি।
  • দলের ভেতরে আত্মসমীক্ষা ও জবাবদিহির বদলে পুরনো ক্ষমতার কাঠামোই বহাল রাখা হয়েছে।
  • সাধারণ কর্মীদের কাছে এই পুনর্গঠন নতুন আশার বদলে পুরনো সমস্যার পুনরাবৃত্তির বার্তা দিতে পারে।
  • রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংকটকে অস্বীকার করার প্রবণতা যে কোনও দলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক।
  • আত্মশুদ্ধির পরিবর্তে আত্মপ্রবঞ্চনার পথে হাঁটলে তৃণমূলের সাংগঠনিক অবক্ষয় আরও ত্বরান্বিত হতে পারে।

গতকাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন সাংগঠনিক কাঠামো ঘোষণার পর দলের ভেতরে-বাইরে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এতে কি সত্যিই কোনও সাধারণ কর্মী নতুন করে উৎসাহিত হবেন? সাম্প্রতিক মাসগুলিতে যে রাজনৈতিক বিপর্যয়, সাংগঠনিক ভাঙন, বিদ্রোহ এবং নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্নের মুখে দল পড়েছে, তার পরে অনেকেই আশা করেছিলেন তৃণমূল অন্তত আত্মসমীক্ষার পথে হাঁটবে। কিন্তু ঘোষিত কমিটি দেখে সেই প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না।

বরং মনে হয়েছে, দল যেন সংকটের কারণ খুঁজতে নিজের আয়নার সামনে দাঁড়ানোর পরিবর্তে পুরনো পথেই হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান। গত কয়েক মাস ধরে দলের ভিতরে-বাইরে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত থেকে প্রার্থী নির্বাচন—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক কৌশল দলকে ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আবার তাঁর সমর্থকেরা দাবি করেছেন, তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিশানা করা হচ্ছে। কিন্তু বিতর্ক যাই হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট—অভিষেককে ঘিরে প্রশ্ন রয়েছে।

সেই পরিস্থিতিতে নতুন সাংগঠনিক বিন্যাসে কোনও নতুন বার্তা দেওয়া হল না। তাঁর অবস্থান যেখানে ছিল, সেখানেই রইল। অর্থাৎ দল কার্যত ঘোষণা করল যে নেতৃত্বের বর্তমান বিন্যাস নিয়ে তাদের কোনও সংশয় নেই।

রাজনীতিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কারণ কোনও দল যখন বড় ধাক্কা খায়, তখন সাধারণত নেতৃত্বও কিছু না কিছু বার্তা দেয় যে তারা পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝেছে। কখনও দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস হয়, কখনও নতুন মুখ সামনে আসে, কখনও সমালোচকদের বক্তব্যের আংশিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এখানে তার কোনওটাই ঘটল না।

নতুন কমিটির দিকে তাকালেও একই ছবি দেখা যায়। সেখানে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন যিনি স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে পরিচিত, অথবা যিনি প্রয়োজনে নেতৃত্বকে অস্বস্তিকর প্রশ্ন করতে পারেন। অধিকাংশ নামই এমন, যাঁদের প্রধান পরিচয় নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য।

এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা অযোগ্য। কিন্তু কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের সুস্থ বিকাশের জন্য শুধু অনুগত মুখ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন লোকেরও, যাঁরা ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, সতর্কবার্তা দিতে পারেন, ভুল ধরিয়ে দিতে পারেন। তৃণমূলের নতুন কাঠামোয় সেই ভারসাম্যের অভাব স্পষ্ট।

ফলে সাধারণ কর্মীদের একাংশের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—দলের এত বড় বিপর্যয়ের পরেও যদি সবকিছু প্রায় একই থাকে, তাহলে পরিবর্তনটা কোথায়?

রাজনীতিতে পরাজয় বা সংকট কোনও দলের শেষ কথা নয়। ইতিহাসে বহু দল বড় ধাক্কা খেয়ে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তাদের প্রায় সকলের মধ্যেই একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল—তারা নিজেদের ভুল নিয়ে আলোচনা করতে পেরেছিল। তারা বুঝেছিল যে শুধুমাত্র বাহ্যিক শত্রু খুঁজে লাভ নেই; নিজের ভেতরের সমস্যাগুলিকেও স্বীকার করতে হয়।

তৃণমূলের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া এখনও চোখে পড়ছে না।

দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও যেন এই ধারণাতেই আস্থাশীল যে সমস্যার মূল কারণ বাইরে। কেউ ষড়যন্ত্র করেছে, কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, কেউ অপপ্রচার চালিয়েছে। এই যুক্তিগুলির কিছু হয়তো সত্যিও হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হল, তাহলে দলের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলি কোথায় গেল? কেন কর্মীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ জমল? কেন নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠল? কেন বিদ্রোহের পরিবেশ তৈরি হল?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর না খুঁজে কেবল পুরনো কাঠামোকে নতুন মোড়কে সাজালে তা রাজনৈতিক পুনর্গঠন হয় না। তা কেবল পুনরাবৃত্তি হয়।

একজন সাধারণ তৃণমূল কর্মী আজ হয়তো ভাবছেন, এত বিতর্ক, এত অভিযোগ, এত সাংগঠনিক ভাঙনের পরেও যদি একই মানুষ, একই পদ্ধতি এবং একই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি বহাল থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে ভিন্ন ফল আসবে কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর নতুন কমিটি দেয়নি।

বরং যা বোঝা গেল, তা হল আত্মসমীক্ষার চেয়ে আনুগত্য এখনও বেশি মূল্যবান। আত্মশুদ্ধির চেয়ে নেতৃত্বের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন এখনও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এবং দল এখনও বিশ্বাস করে যে কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।

কিন্তু রাজনীতির নির্মম সত্য হল, বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত কাউকেই রেয়াত করে না। যে দল নিজের ভুল দেখতে অস্বীকার করে, সে একসময় ভুলের ভারেই নুয়ে পড়ে। যে দল সমালোচনাকে শত্রুতা বলে মনে করে, সে ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

তাই গতকালের ঘোষণার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য সম্ভবত নতুন কোনও মুখ নয়, বরং নতুন কিছু না-ঘটা।

যেখানে অনেকেই আত্মসমীক্ষার প্রত্যাশা করেছিলেন, সেখানে দেখা গেল আত্মতুষ্টি। যেখানে অনেকে আত্মশুদ্ধির আশা করেছিলেন, সেখানে দেখা গেল পুরনো ব্যবস্থার পুনর্বহাল। আর সেখানেই তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্নটি তৈরি হচ্ছে।

কারণ রাজনৈতিক দলের মৃত্যু সাধারণত বিরোধীদের হাতে হয় না। অনেক সময় তা শুরু হয় নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে।

গতকালের নতুন তৃণমূল সেই শিক্ষাই আবার মনে করিয়ে দিল। যদি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয় মুহূর্তেও পরিবর্তন না আসে, তবে অবক্ষয় আর বিলুপ্তির মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি থাকে না।