হাইলাইটস:
- আগের তৃণমূল ও বামফ্রন্ট সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝার কথা তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী।
- দাবি, সেই ঋণের সুদ ও আসল শোধ করেই বর্তমান সরকারকে উন্নয়ন এগিয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে।
- শহর ও শহরতলির যাতায়াত আরও সহজ করতে ই-বাসের বহর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর ঘোষণা।
- নদীপথে বিকল্প গণপরিবহন হিসেবে জল মেট্রো চালুর পরিকল্পনার কথাও জানালেন মুখ্যমন্ত্রী।
- গণপরিবহন, পরিবেশবান্ধব যান এবং বহুমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর জোর দিল রাজ্য সরকার।
বাংলাস্ফিয়ার: বর্তমান সরকারের আর্থিক অবস্থার পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে আগের তৃণমূল ও বামফ্রন্ট সরকারকে একসঙ্গে কাঠগড়ায় তুললেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, পূর্ববর্তী দুই সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই বর্তমান প্রশাসনকে কাজ করতে হচ্ছে। এত বিপুল ঋণের সুদ এবং আসল শোধ করার পরও সরকার উন্নয়নমূলক প্রকল্পে গতি বজায় রেখেছে বলে তিনি দাবি করেন।
এক সরকারি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের আর্থিক সঙ্কটের জন্য বর্তমান সরকার দায়ী নয়। অতীতের আর্থিক দায় মেটানোর পাশাপাশি অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং পরিবহণ খাতে একযোগে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। তাঁর কথায়, ঋণের বোঝা থাকা সত্ত্বেও উন্নয়ন থেমে নেই, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও সহজ করার লক্ষ্যে একের পর এক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এই প্রসঙ্গেই তিনি গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের জন্য একগুচ্ছ নতুন পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল রাজ্যজুড়ে বৈদ্যুতিক বাস বা ই-বাসের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, দূষণ কমানো, জ্বালানির ব্যয় হ্রাস এবং যাত্রীদের আরামদায়ক পরিষেবা দেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। ধাপে ধাপে বিভিন্ন শহর ও গুরুত্বপূর্ণ রুটে নতুন ই-বাস নামানো হবে। চার্জিং অবকাঠামোও সেই অনুযায়ী সম্প্রসারিত করা হবে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতের গণপরিবহনকে পরিবেশবান্ধব করাই সরকারের লক্ষ্য। ডিজেলচালিত বাসের উপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈদ্যুতিক বাসের ব্যবহার বাড়ানো হলে একদিকে যেমন দূষণ কমবে, তেমনই দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয়ও কমবে। এর ফলে গণপরিবহন আরও টেকসই হবে বলে সরকারের আশা।
আরও একটি বড় ঘোষণা হল জল মেট্রো প্রকল্প। নদীনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার যাতায়াত আরও দ্রুত এবং সহজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, সড়কপথের ওপর চাপ কমাতে নদীপথকে বিকল্প পরিবহণ মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা হবে। জল মেট্রো চালু হলে যাত্রীদের যাতায়াতের নতুন সুযোগ তৈরি হবে এবং যানজটও কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারের মতে, পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ নদী ও জলপথকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে পরিবহণ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। জল মেট্রোর সঙ্গে বাস, মেট্রো রেল এবং অন্যান্য গণপরিবহনের সমন্বিত সংযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর ফলে একাধিক পরিবহণ মাধ্যম ব্যবহার করে যাত্রীরা সহজেই গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, শুধু নতুন প্রকল্প ঘোষণা নয়, গণপরিবহণের সামগ্রিক পরিকাঠামো উন্নয়নেও সরকার জোর দিচ্ছে। বাস টার্মিনাস, চার্জিং স্টেশন, জেটি, যাত্রী সুবিধা এবং ডিজিটাল পরিষেবার উন্নয়নও এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ভবিষ্যতের নগর পরিবহণকে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব এবং সমন্বিত রূপ দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য।
বিরোধীরা অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর ঋণ সংক্রান্ত দাবিকে রাজনৈতিক আক্রমণ বলে কটাক্ষ করেছে। তাদের বক্তব্য, রাজ্যের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতির দায় এড়াতে অতীতের সরকারের উপর দায় চাপানো হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, অতীতের দায় বহন করেও উন্নয়ন এবং জনপরিষেবার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই বর্তমান প্রশাসনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
আগামী দিনে ই-বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি, জল মেট্রো চালু এবং বহুমুখী গণপরিবহণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের যাতায়াত ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছে প্রশাসন। একই সঙ্গে আর্থিক চাপের মধ্যেও অবকাঠামো উন্নয়ন অব্যাহত রাখার বার্তা দিয়ে সরকার উন্নয়ন এবং আর্থিক শৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার দাবি করেছে।