নেপালের সুড়ঙ্গে দুই শ্রমিকের জীবন্ত উদ্ধার ‘মানুষ ও মানবতার জয়’

যা জানা জরুরি
- নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ হড়পা বানের নয় দিন পর একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্লাবিত সুড়ঙ্গ থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
- এই ঘটনাকে ‘একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা উদ্ধার অভিযান’ এবং ‘মানুষ ও মানবতার প্রকৃত জয়’ বলে অভিহিত করেছেন অস্ট্রেলীয় প্রকৌশলী ও ভূতত্ত্ববিদ আর্নল্ড ডিক্স।
- শুক্রবার নেপালের ত্রিশূলী ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে সঞ্জয় শাহ ও কবীর মহারাজনকে উদ্ধার করা হয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ হড়পা বানের নয় দিন পর একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্লাবিত সুড়ঙ্গ থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনাকে ‘একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা উদ্ধার অভিযান’ এবং ‘মানুষ ও মানবতার প্রকৃত জয়’ বলে অভিহিত করেছেন অস্ট্রেলীয় প্রকৌশলী ও ভূতত্ত্ববিদ আর্নল্ড ডিক্স।
শুক্রবার নেপালের ত্রিশূলী ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে সঞ্জয় শাহ ও কবীর মহারাজনকে উদ্ধার করা হয়। হিমবাহ ধসে তৈরি হওয়া জল, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নেপাল-চিন সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার বাড়িঘর, রাস্তা ও সেতু ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সেই বিপর্যয়ের পর এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে দুই শ্রমিক সুড়ঙ্গের মধ্যে আটকে ছিলেন।
নেপালের ভোতে কোশী ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত আরও কয়েকশো শ্রমিক এখনও নিখোঁজ। ত্রিশূলী ৩এ প্রকল্পের উদ্ধার অভিযানে পরামর্শ দেওয়ার জন্য নেপাল সরকার আর্নল্ড ডিক্সকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তাঁর মতে, দুই শ্রমিকের জীবিত উদ্ধার বিপর্যস্ত উদ্ধারকারী দলগুলিকে নতুন করে উদ্দীপ্ত করবে।
ডিক্স বলেন, “আমরা দু’জনকে জীবিত পেয়েছি। ফলে নতুন করে আশা তৈরি হয়েছে। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কাজ করতে করতে সকলেই ক্লান্ত। কিন্তু এই সাফল্য আমাদের আরও বেশি চেষ্টা করতে উৎসাহিত করবে। অন্য জায়গায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের ক্ষেত্রেও কী ধরনের কৌশল নেওয়া যেতে পারে, তার একটা দিশা মিলেছে। এত দিন পরেও যে মানুষ বেঁচে থাকতে পারেন, তার প্রমাণ এখন আমাদের হাতে রয়েছে।”
এর আগে ২০২৩ সালে উত্তরাখণ্ডের সিলকিয়ারা-বেন্ড বারকোট সুড়ঙ্গ বিপর্যয়ের উদ্ধার অভিযানে সাহায্য করেছিলেন ডিক্স। সেখানে ধসে পড়া সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে ৪১ জন শ্রমিককেই জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পরে নিউ ইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোর সুড়ঙ্গগুলিতেও তিনি কাজ করেছিলেন।
তবে নেপালের এই বিপর্যয় তাঁর পূর্ববর্তী সমস্ত অভিজ্ঞতা থেকে আলাদা। প্রায় ৩০টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডিক্সের কথায়, “সাধারণত আমাকে একটি বিপর্যয় সামলাতে হয়। এখানে একই সঙ্গে ২৭টি বিপর্যয় মোকাবিলা করতে হচ্ছে।”
ত্রিশূলী ৩এ প্রকল্পের অবস্থান নির্দিষ্ট করতেই প্রথমে সমস্যায় পড়েছিলেন উদ্ধারকারীরা। বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছতে কোন সুড়ঙ্গটি ব্যবহার করা যাবে, তা চিহ্নিত করার পর খননকাজ শুরু হয়। কিন্তু গাড়ির সমান বড় বড় পাথর পথ আটকে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরক ব্যবহার করতে হয়। ডিক্স জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গের অন্য প্রান্তে আটকে থাকা মানুষের পক্ষে বিস্ফোরণ বিপজ্জনক হতে পারে বলে সাধারণত এই পদ্ধতি এড়িয়ে চলা হয়।
উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের কাছে পৌঁছে দেখেন, সেটি জলে ভরে রয়েছে। জল বার করার জন্য দ্রুত একটি নালা খোঁড়া হয়। তখন আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, ভিতরে আটকে থাকা শ্রমিকেরা হয়তো ইতিমধ্যেই ডুবে মারা গিয়েছেন।
কিন্তু শুক্রবার সকালে সুড়ঙ্গের প্রায় ৫০ মিটার ভিতর থেকে ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শুনতে পান উদ্ধারকারীরা। তাঁরা চিৎকার করে বলেন, “ভয় পাবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করতে এসেছি।” ভিতর থেকে উত্তর আসে, “ঠিক আছে।”
দুই শ্রমিককে জীবিত অবস্থায় সুড়ঙ্গ থেকে বার করে আনার দৃশ্যের ভিডিয়ো দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ডিক্স। তিনি বলেন, “আমরা এই কাজ করি, কারণ আমরা দায়িত্বশীল মানুষ। মানুষ একে অন্যকে সাহায্য করবে—এটাই মানবিকতা। এই উদ্ধার অভিযান মানুষ ও মানবতার প্রকৃত জয়।”
ত্রিশূলী ৩এ সুড়ঙ্গের ভিতরে আরও প্রায় ৪০ জন শ্রমিক আটকে রয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁদের কাছে পৌঁছনোর কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। উদ্ধারকারী দলের সামনে থাকা সুড়ঙ্গে জল জমে থাকলে পাথর ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে সেই জল তাঁদের ভাসিয়ে দিতে পারে। আবার দলটি এখন প্লাবনভূমির স্তরের নীচে থাকায় পিছন দিক থেকেও হঠাৎ জল ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডিক্স সতর্ক করে বলেন, “দু’জনকে উদ্ধার করার পুরস্কার আমরা পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু এখন প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সাবধানে ফেলতে হবে। উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের জীবনও এই মুহূর্তে ঝুঁকির মধ্যে। সময়মতো বেরোতে না পারলে তাঁরাও ডুবে যেতে পারেন। এটি কোনও মহড়া নয়। আমরা একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা উদ্ধার অভিযান প্রত্যক্ষ করছি।”
শুক্রবার উদ্ধারকারী দলটি ১১ তলা গভীর ত্রিশূলী ৩এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উপরের দিকে অবস্থিত সম্ভাব্য নিরাপদ অংশে পৌঁছনোর চেষ্টা করছিল। উদ্ধারকারীরা ওই জায়গাটিকে ‘গোল্ডিলক্স অঞ্চল’ বলে চিহ্নিত করেছেন। সেখানে আরও মানুষ জীবিত অবস্থায় আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারেন বলে তাঁদের আশা।
নেপালের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ইতিমধ্যে ২৭০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। দেশটির বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যায় অন্তত ১,২৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ।
অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণকাজে সাহায্যের জন্য অস্ট্রেলিয়ার ৩৮ জন সরকারি কর্মকর্তা, বিপর্যয় মোকাবিলা বিশেষজ্ঞ ও মানবিক সহায়তাকর্মী নেপালে পৌঁছেছেন। বিশেষ ড্রোন পরিষেবা দেওয়ার জন্য ১৫ সদস্যের অস্ট্রেলীয় বিপর্যয় সহায়তা দল শুক্রবার গভীর রাতে কাঠমান্ডুতে নামে। মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজে সাহায্য করতে অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পুলিশের আরও সাত বিশেষজ্ঞের শনিবার রওনা হওয়ার কথা।
নেপাল সরকারের ৪ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, বিপর্যয়ে ১,২৯৪ জনের মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৫,০৫৩ জন। তাঁদের মধ্যে ৫৮৩ জন বিদেশি নাগরিক। অন্যদিকে, চিন সরকারের ৫ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, সে দেশে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৩১ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



