বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অবসান ঘোষণা করে একে ঐতিহাসিক সাফল্য বলে তুলে ধরেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, “আবার তেল চলাচল হবে, গোটা অঞ্চল এবং বিশ্বের জন্যই তা উপকারী হবে।”

কিন্তু ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরেও ঠিক কী বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। কারণ সমঝোতা স্মারকের চূড়ান্ত পাঠ এখনও প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং লেবাননের প্রশ্নে এখনও বহু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

ট্রাম্প পরে নিউ ইয়র্ক টাইমস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার শুরু হতে চলা বৃহত্তর আলোচনায় যদি ইরান নতুন পরমাণু চুক্তিতে সম্মত না হয়, তাহলে আমেরিকা আবারও সামরিক হামলা চালাতে পারে।

ঘোষণার পরপরই কী জানা গিয়েছে এবং কোন বিষয়গুলি এখনও অমীমাংসিত, তা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।

১. হরমুজ প্রণালী: খুলছে কি না, তা নিয়েই বিভ্রান্তি

রবিবার সন্ধ্যায় ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীর বিষয়ে একেবারে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেন, “হরমুজ প্রণালীকে বিনা টোলে খুলে দেওয়ার অনুমোদন দিলাম এবং একই সঙ্গে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিলাম। বিশ্বের জাহাজগুলি চলতে শুরু করুক। তেল চলাচল হোক।”

কিন্তু মাত্র এক ঘণ্টা পরেই তাঁর বক্তব্যে পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি জানান, শুক্রবার নির্ধারিত শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরেই প্রণালী খোলা হবে এবং তার মূল উদ্দেশ্য হবে সমুদ্রের মাইন অপসারণ।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাঁর প্রথম ঘোষণায় হরমুজ প্রণালীর প্রসঙ্গই উল্লেখ করেননি।

অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা মেহর জানিয়েছে, সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে যে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে “ইরানের ব্যবস্থাপনায়” প্রণালী পুনরায় চালু হবে।

এই জায়গাটিই সবচেয়ে বিতর্কিত। আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরেই বলে এসেছে যে হরমুজ প্রণালীতে কোনও ধরনের টোল ব্যবস্থা বা নিয়ন্ত্রণ তারা মেনে নেবে না। গত মাসেই ট্রাম্প বলেছিলেন, “এই প্রণালী সবার জন্য খোলা থাকবে। এর নিয়ন্ত্রণ কারও হাতে থাকবে না।”

ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইতালির নেতারাও দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালীকে নিঃশর্তভাবে খুলতে হবে এবং সেখানে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।

তবে এত অনিশ্চয়তার মধ্যেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত কমতে শুরু করেছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেলের দাম যে উচ্চতায় উঠেছিল, তা নেমে এসেছে মার্চ মাসের শুরুর দিকের স্তরে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত তেল ও গ্যাস অবকাঠামো পুরোপুরি চালু করতে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে। তার ওপর জাহাজ সংস্থা এবং বিমা কোম্পানিগুলি আদৌ এই জলপথকে নিরাপদ বলে মনে করবে কি না, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।

২. লেবানন: যুদ্ধবিরতির আওতায় কি সত্যিই এসেছে?

প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি আলোচনার সময় সবচেয়ে বড় মতভেদের একটি ছিল লেবাননকে চুক্তির আওতায় আনা হবে কি না।

ইরানের উপ-বিদেশমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি এ বিষয়ে একেবারে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “লেবানন-সহ সমস্ত ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী ও তাৎক্ষণিক অবসান ঘোষণা করা হয়েছে।”

মধ্যস্থতাকারী শাহবাজ শরিফও একই কথা বলেছেন। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “উভয় পক্ষ লেবানন-সহ সমস্ত ক্ষেত্রে সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে।”

কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম ঘোষণায় লেবাননের কোনও উল্লেখই ছিল না। তাঁর বক্তব্য প্রায় সম্পূর্ণভাবে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরেই ছিল।

এই পরিস্থিতি ইজরায়েলের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। কারণ ইরান-আমেরিকা শান্তি আলোচনায় ইজরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং শান্তি চুক্তির খবরে দেশটির সরকারও তৎক্ষণাৎ কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু-র নিজস্ব রাজনৈতিক কারণও রয়েছে, যার জন্য তিনি ইরান এবং তার মিত্র গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে সংঘাত চালিয়ে যেতে আগ্রহী হতে পারেন। বিশেষ করে লেবাননে হিজবুল্লাহকে ঘিরে পরিস্থিতি এখনও উত্তপ্ত।

এর আগে রবিবার চুক্তি ঘোষণার প্রস্তুতি চলাকালীন ইজরায়েলের এক হামলায় বেইরুটের দক্ষিণ উপকণ্ঠে একটি বহুতল ভবন ধ্বংস হয়ে যায়। ওই হামলায় তিন জন নিহত এবং ছয় জন আহত হন।

ট্রাম্প পরে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-কে বলেন, এই হামলার কারণেই শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরে কয়েক ঘণ্টার বিলম্ব হয়েছিল।

গত কয়েক সপ্তাহে লেবানন নিয়ে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর মধ্যে একাধিকবার মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। দুই সপ্তাহ আগে বেইরুটে আরেকটি হামলার পর ট্রাম্প নাকি ব্যক্তিগত আলোচনায় নেতানিয়াহুকে “পাগল” বলে অভিহিত করেছিলেন। এমনকি সাম্প্রতিক হামলার পরও তিনি বলেন, নেতানিয়াহুর “বিচারবোধের অভাব রয়েছে”।

এই কারণেই অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, লেবানন ইস্যুই ভবিষ্যতে এই শান্তি চুক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র হতে পারে।

৩. ইরানের পরমাণু কর্মসূচি: মূল সমস্যা এখনও অমীমাংসিত

যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির কথা বলা হয়েছিল, সেই প্রশ্নে এখনও কোনও চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। ট্রাম্প আবারও বলেছেন, “ইরান কখনও পরমাণু অস্ত্র পাবে না।” কিন্তু পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ৬০ দিন ধরে পরমাণু ইস্যুতে পৃথক আলোচনা চলবে। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন যে আলোচনা ব্যর্থ হলে নতুন করে মার্কিন সামরিক হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইতালির যৌথ বিবৃতিতেও একই বার্তা দেওয়া হয়েছে। তারা জানিয়েছে, ইরান যদি তার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। ইরান বরাবরই দাবি করে এসেছে যে তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। দেশটি এখনও প্রকাশ্যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগ করার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৪০০ কিলোগ্রামের বেশি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নিয়েই সবচেয়ে কঠিন দরকষাকষি হতে চলেছে। এই ইউরেনিয়ামের একটি বড় অংশ এমন মাত্রায় সমৃদ্ধ করা হয়েছে, যা পরমাণু অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি বলে বিবেচিত হয়।

ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপও কম নয়। কারণ তাঁর প্রথম প্রেসিডেন্ট থাকার সময় তিনি ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি থেকে আমেরিকাকে বের করে এনেছিলেন। সেই চুক্তি হয়েছিল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে।

চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পরই ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের গতি অনেক বাড়িয়ে দেয়।

ফলে নতুন আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে—ইরানের হাতে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কী হবে এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের জন্য কতটা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।

মার্কিন রিপাবলিকান সেনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, তিনি আসন্ন পরমাণু আলোচনা “খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করবেন”।

সামনের দিনগুলিই নির্ধারণ করবে চুক্তির ভবিষ্যৎ

এখন পর্যন্ত যা বোঝা যাচ্ছে, তা হল যুদ্ধ থামানোর রাজনৈতিক ঘোষণা হয়েছে, কিন্তু শান্তির স্থায়ী কাঠামো এখনও তৈরি হয়নি। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ, লেবাননে সংঘর্ষ বন্ধ হওয়া এবং সবচেয়ে বড় কথা, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি—এই তিনটি প্রশ্নের কোনওটিরই স্পষ্ট সমাধান এখনও সামনে আসেনি।

শুক্রবার জেনেভায় সম্ভাব্য চুক্তি স্বাক্ষর এবং তার পরবর্তী পরমাণু আলোচনা সফল হলে তবেই বোঝা যাবে এই যুদ্ধবিরতি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ খুলছে, নাকি এটি কেবল আরেকটি অস্থায়ী বিরতি।