ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই তা যেন জুড বেলিংহ্যামের একক প্রদর্শনীতে পরিণত হচ্ছে। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিরুদ্ধে তিনি জোড়া গোল করে দলকে জয় এনে দিয়েছেন। তার আগের রাউন্ডে মেক্সিকোর বিরুদ্ধেও করেছিলেন দুটি গোল। মাত্র ২৩ বছর বয়সী এই আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারের বিশেষত্বই হল—সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের সেরাটা তুলে ধরা।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন গোলের বন্যার যুগ চলছে। টুর্নামেন্টের সম্প্রসারণের ফলে ম্যাচ বেড়েছে, বেড়েছে গোলও। সর্বকালের দুই সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতা—লিওনেল মেসি (২১) ও কিলিয়ান এমবাপ্পে (২০)—এখনও ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলছেন। তাঁদের সঙ্গে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকার প্রথম সারিতেই রয়েছেন হ্যারি কেন (১৪)। অন্যদিকে মাত্র পাঁচ ম্যাচে সাত গোল করে এরলিং হালান্ডও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার আগেই তিনিও এই তালিকার শীর্ষে উঠে আসতে পারেন।
কিন্তু এই বিশ্বসেরা ফরোয়ার্ডদের কেউই গত দুটি নক-আউট ম্যাচে বেলিংহ্যাম যা করেছেন, তা করতে পারেননি। শুধু তাঁরা নন, গত চার দশকে আর কোনও ফুটবলারই পারেননি।১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে দিয়েগো মারাদোনার পর প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা দুটি নক-আউট ম্যাচে জোড়া গোল করলেন বেলিংহ্যাম। এমন কীর্তি অনেক সময় পরিস্থিতির কারণে ঘটে যেতে পারে, কিন্তু বেলিংহ্যামের ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তাঁর ক্ষেত্রে এটি মোটেই আকস্মিক নয়।
ইংল্যান্ডের জার্সিতে তাঁর মোট ১২টি গোলের মধ্যে ৯টিই এসেছে বড় টুর্নামেন্টে। বিশ্বকাপে করেছেন সাতটি, ইউরো ২০২৪-এ দুটি। ইংল্যান্ডের হয়ে অন্তত ১২ গোল করা বাকি ৪৪ জন ফুটবলারের মধ্যে কেউই বড় টুর্নামেন্টে গোল করার অনুপাতে বেলিংহ্যামের ধারেকাছেও নেই।আন্তর্জাতিক ফুটবলের বৃহত্তর পরিসরেও ছবিটা একই। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে থাকা অন্যান্য তারকাদের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের মোট খেলার সময়ের তুলনায় বড় টুর্নামেন্টে গোল করার হারে বেলিংহ্যাম সবার থেকে অনেক এগিয়ে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তাঁর গোলের পরিসংখ্যান কৃত্রিমভাবে ফুলে-ফেঁপে ওঠেনি। পেনাল্টি থেকে গোল করে কিংবা দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গোলের পাহাড় গড়ে তিনি এই রেকর্ড বানাননি।উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হালান্ড একবার বিশ্বের ১৫৯ নম্বরে থাকা মলদোভার বিরুদ্ধে এক ম্যাচে পাঁচ গোল করেছিলেন। কিন্তু বেলিংহ্যাম যে দলগুলির বিরুদ্ধে গোল করেছেন, তাদের কোনওটিই গোলের সময় ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৪৮-এর নিচে ছিল না।
এমনকি অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে করা তাঁর গোলগুলিও ছিল নাটকীয়। হ্যাম্পডেন পার্কে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটি প্রীতি ম্যাচে তিনি গোল করেছিলেন—যে মাঠে ইংল্যান্ডের জন্য পরিবেশ সবসময়ই বৈরী। এছাড়া বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচে এবং গ্রিসের বিরুদ্ধে নেশনস লিগে তাঁর আরও দুটি গোল এসেছে ৮৭ মিনিটের পরে, দুটিই ছিল সমতাসূচক গোল।
এবার প্রশ্ন উঠছে, সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে কি তিনি টানা তৃতীয় ম্যাচেও ইংল্যান্ডের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন?এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড মাত্র চারবার কোনও খেলোয়াড়ের কাছ থেকে পেনাল্টি ছাড়া অন্তত ০.৬ এক্সপেক্টেড গোল (Expected Goals বা xG) পেয়েছে। অবাক করার বিষয়, তার একটি ছিল ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে এজরি কনসার। বাকি তিনটিই এসেছে নক-আউট পর্বে বেলিংহ্যামের কাছ থেকে।সবচেয়ে বড় সুযোগগুলো খুঁজে নেওয়ার এবং সেগুলিকে গোলে পরিণত করার ক্ষমতায় তিনি এই মুহূর্তে ইংল্যান্ডের সেরা।ইউরোপের অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের গোল ভুলে যান। যখন বিশ্বমঞ্চে সত্যিকারের পরীক্ষা আসে, যখন একটি গোলই ইতিহাস বদলে দিতে পারে, তখন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম একটাই—জুড বেলিংহ্যাম।