হাইলাইটস:

  • কলকাতার সরকারি ও সরকারি-পোষিত স্কুলে নিরামিষ মিড-ডে মিল প্রকল্পে ইসকনের ভূমিকার পক্ষে সওয়াল মুখ্যমন্ত্রীর।
  • দাবি, আগের তৃণমূল সরকারের আমলে প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছিল।
  • ইসকনের খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও মানবিক বলে উল্লেখ।
  • বিরোধীদের অভিযোগ, ধর্মীয় সংগঠনকে সরকারি প্রকল্পে যুক্ত করা ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপন্থী।
  • সরকার জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের পুষ্টি ও মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।

বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতার সরকারি ও সরকারি-পোষিত স্কুলগুলিতে নিরামিষ মিড-ডে মিল প্রকল্পে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন)-এর অংশগ্রহণ নিয়ে চলমান বিতর্কের মাঝেই ফের তাদের পক্ষেই অবস্থান স্পষ্ট করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “ইসকন শান্তি আনতে পারে। ওরা বহু বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানবসেবার কাজ করছে। স্কুলের শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরামিষ খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে।”

মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, আগের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সময় মিড-ডে মিল প্রকল্পে একাধিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি, নিম্নমানের খাবার সরবরাহ এবং অর্থ তছরুপের অভিযোগ উঠেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই বর্তমান সরকার স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে।

তিনি বলেন, “আমরা চাই শিশুরা সময়মতো ভালো মানের খাবার পাক। কোনও রকম কাটমানি বা দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না। ইসকনের মতো প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হলে প্রকল্পের মান আরও উন্নত হবে।”

সরকারি সূত্রের দাবি, ইসকনের রান্নাঘরগুলিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিপুল পরিমাণ খাবার প্রস্তুত করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ে তা স্কুলে পৌঁছে দেওয়ারও সুসংগঠিত ব্যবস্থা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কলকাতার বহু স্কুলে নিরামিষ খাবার সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তবে এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, একটি ধর্মীয় সংগঠনকে সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্পে যুক্ত করা সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের বক্তব্য, সরকার চাইলে বেসরকারি ক্যাটারিং সংস্থা বা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে একই পরিষেবা দিতে পারত।

মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য এই সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “ইসকনকে তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য নয়, দক্ষতার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। তারা কোনও ধর্মীয় শিক্ষা দেবে না, শুধুমাত্র খাবার সরবরাহ করবে। মানবসেবাই তাদের কাজ।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, অতীতে মিড-ডে মিল প্রকল্পে দুর্নীতির কারণে বহু জায়গায় শিক্ষার্থীরা নিম্নমানের খাবার পেয়েছে। কোথাও খাবারে পোকা, কোথাও পর্যাপ্ত পরিমাণ না থাকা, আবার কোথাও বরাদ্দ অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছিল। সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধ করতেই সরকার নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

শিক্ষা দফতরের একাংশের মতে, কলকাতার মতো মহানগরে কেন্দ্রীয় রান্নাঘর থেকে নির্দিষ্ট সময়ে খাবার পৌঁছে দেওয়ার জন্য বড় ও অভিজ্ঞ সংস্থার প্রয়োজন। ইসকনের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সেই প্রয়োজন মেটাতে সহায়ক হতে পারে।

অন্যদিকে, শিক্ষক সংগঠন এবং কয়েকটি নাগরিক সংগঠন দাবি করেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। কীভাবে সংস্থা নির্বাচন করা হয়েছে, চুক্তির শর্ত কী এবং খাদ্যের গুণমান কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে—এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশেরও দাবি উঠেছে।

সরকার জানিয়েছে, নির্ধারিত পুষ্টিমানের ভিত্তিতেই খাবারের তালিকা তৈরি হবে। শিশুদের প্রয়োজনীয় ক্যালোরি, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টিগুণ নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। নিয়মিত খাদ্যের মান পরীক্ষাও করা হবে।

এই ইস্যুতে রাজনৈতিক সংঘাত যতই তীব্র হোক না কেন, সরকারের বক্তব্য স্পষ্ট—মিড-ডে মিল প্রকল্পের মূল লক্ষ্য শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং স্কুলে উপস্থিতির হার বৃদ্ধি। সেই লক্ষ্য পূরণে যে সংস্থা সবচেয়ে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে, তাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।

ফলে ইসকনকে ঘিরে বিতর্ক আপাতত থামার কোনও লক্ষণ নেই। একদিকে মুখ্যমন্ত্রী প্রকল্পটিকে দুর্নীতিমুক্ত ও কার্যকর করার যুক্তি তুলে ধরছেন, অন্যদিকে বিরোধীরা ধর্মনিরপেক্ষতা ও সরকারি নীতির প্রশ্ন তুলছে। শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, খাবারের মান এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব উপকারের উপর।