হাইলাইটস:
- রাজ্য বিজেপি সভাপতি দাবি করলেন, পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হবে।
- একই সঙ্গে তিনি ‘মৌলবাদ’ ও ‘উগ্রপন্থার’ প্রসঙ্গ তুলে বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা টানেন।
- প্রশাসনের প্রতি আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, উৎসবের পরিবেশ কোনওভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।
- তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির এই মন্তব্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে কটাক্ষ করেছে।
বাংলাস্ফিয়ার: দুর্গাপুজোকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক তরজা আরও তীব্র হল। রাজ্য বিজেপির সভাপতি বৃহস্পতিবার দাবি করেছেন, এ বছরের দুর্গাপুজো শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, রাজ্যে ‘মৌলবাদের বিস্তার’ রুখতে না পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কলকাতায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিজেপি নেতা বলেন, বাংলার মানুষের কাছে দুর্গাপুজো কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব। সব সম্প্রদায়ের মানুষ এই উৎসবে অংশ নেন। সেই ঐতিহ্য বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কথায়, “বাংলার সংস্কৃতিতে উৎসবই বড়। দুর্গাপুজো শান্তিপূর্ণভাবেই হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। কিন্তু সমাজে যে ধরনের মৌলবাদী প্রবণতা বাড়ছে, তা নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।”
তিনি দাবি করেন, প্রতিবেশী বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, মন্দিরে ভাঙচুর এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার যে অভিযোগ উঠেছে, তা পশ্চিমবঙ্গের জন্যও সতর্কবার্তা। তাঁর মতে, সময় থাকতে এই ধরনের প্রবণতা মোকাবিলা না করলে ভবিষ্যতে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
বিজেপির অভিযোগ, রাজ্যের শাসক দল ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির কারণে মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে না। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, প্রশাসন যদি নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করে, তবে উৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তবে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির এই মন্তব্যকে রাজনৈতিক প্রচারের অংশ বলেই ব্যাখ্যা করেছে। দলের নেতাদের বক্তব্য, দুর্গাপুজো নিয়ে অযথা আতঙ্ক তৈরি করার চেষ্টা করছে বিজেপি। তাঁদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গে প্রতি বছরই শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রশাসন নিরাপত্তার জন্য বিস্তৃত ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
তৃণমূলের মতে, বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে বাংলার সামাজিক সম্প্রীতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানোর কোনও যুক্তি নেই। রাজ্যে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে বসবাস করছেন এবং উৎসবের সময় পারস্পরিক সহযোগিতার ঐতিহ্য রয়েছে। সেই ঐতিহ্য নষ্ট করার চেষ্টা রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দুর্গাপুজোকে ঘিরে নিরাপত্তা, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং অনুপ্রবেশের মতো বিষয় গত কয়েক বছর ধরেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী রাজ্য হওয়ায় বাংলাদেশ-সংক্রান্ত প্রসঙ্গ প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে আসে। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই অনুপ্রবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং মৌলবাদকে তাদের অন্যতম রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে তৃণমূল অভিযোগ করে, এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
এদিকে রাজ্য প্রশাসন ইতিমধ্যেই দুর্গাপুজোকে সামনে রেখে নিরাপত্তা পরিকল্পনা শুরু করেছে। কলকাতা-সহ বিভিন্ন জেলায় পুলিশ ও প্রশাসনের বৈঠক চলছে। বড় পুজো কমিটিগুলির সঙ্গে সমন্বয়, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ভিড় ব্যবস্থাপনা, নজরদারি ক্যামেরা, ড্রোন পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি পরিষেবা জোরদারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, উৎসবের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোনওরকম শৈথিল্য থাকবে না।
প্রতি বছরই দুর্গাপুজোয় লাখ লাখ মানুষ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মণ্ডপ পরিদর্শনে বের হন। দেশ-বিদেশ থেকেও পর্যটকেরা আসেন। ফলে নিরাপত্তা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং জনসমাগম পরিচালনা প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়।
রাজনৈতিক মহলের মতে, উৎসবের আবহে এমন মন্তব্য আগামী দিনে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়াতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—দুর্গাপুজো শান্তিপূর্ণ, আনন্দময় এবং সম্প্রীতির পরিবেশেই সম্পন্ন হোক। প্রশাসনও সেই লক্ষ্যেই প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে বলে সরকারি সূত্রের দাবি।