হাইলাইটস:
• প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে সরিয়ে দেওয়ায় কিয়েভ-সহ একাধিক শহরে বিরল বিক্ষোভ।
• ড্রোন যুদ্ধকৌশলের অন্যতম শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা পদত্যাগ করে সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান।
• সেনাপ্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কির সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে।
• যুদ্ধের মাঝেই সরকারের অন্দরের বিভাজন ইউক্রেনের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধের পঞ্চম বছরে ইউক্রেনের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে বিরোধ এবার প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জনপ্রিয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর কিয়েভ-সহ বিভিন্ন শহরে বিরল জনবিক্ষোভ শুরু হয়েছে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এমন প্রকাশ্য প্রতিবাদ ইউক্রেনে খুবই অস্বাভাবিক বলে মনে করা হচ্ছে।
মাত্র ছয় মাস আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া ৩৫ বছর বয়সী ফেদোরভকে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকীকরণের অন্যতম স্থপতি হিসেবে দেখা হতো। ড্রোন যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, দ্রুত অস্ত্র সংগ্রহ এবং সামরিক ক্রয়ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগের জন্য তিনি সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।
সরকারি রদবদলের ঘোষণার পরই ফেদোরভ প্রকাশ্যে সেনাপ্রধান জেনারেল ওলেক্সান্দর সিরস্কির বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁর অভিযোগ, আধুনিক যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সংস্কার আটকে দেওয়া হয়েছে, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বহু উদ্যোগ ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাহত করা হয়েছে। যদিও সিরস্কি সরাসরি অভিযোগের জবাব না দিয়ে বলেছেন, তাঁর একমাত্র লক্ষ্য যুদ্ধ পরিচালনা।
এই বিরোধের জেরে কিয়েভে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের সামনে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখান। তাঁদের হাতে ছিল “লজ্জা”, “কেন?” এবং “রাশিয়াই খুশি হচ্ছে” লেখা প্ল্যাকার্ড। অনেক বিক্ষোভকারী দাবি করেন, ফেদোরভকে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা উচিত। একই ধরনের প্রতিবাদ ডিনিপ্রো, ওডেসা ও আরও কয়েকটি শহরেও দেখা যায়।
বিতর্ক আরও গভীর হয় যখন ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর ড্রোন যুদ্ধের দায়িত্বে থাকা উপ-কমান্ডার পাভলো ইয়েলিজারভ পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ফেদোরভকে সরিয়ে দেওয়া দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য “বড় আঘাত” এবং এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি একমত নন। তাঁর পদত্যাগ সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরেও অসন্তোষের ইঙ্গিত দিয়েছে।
ফেদোরভের সমর্থকদের দাবি, তিনি ড্রোন উৎপাদন ও ব্যবহারে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। কম খরচে অধিক কার্যকর অস্ত্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, রুশ বাহিনীর রসদ সরবরাহে আঘাত হানা এবং প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধকৌশল গ্রহণের ফলে সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছিল। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ক্রয়ব্যবস্থায় দুর্নীতি কমানোর উদ্যোগও তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ায়।
তবে সমালোচকদের মতে, সেনাবাহিনীতে নতুন সদস্য নিয়োগ ও সমন্বয় নিয়ে ফেদোরভের সঙ্গে সামরিক নেতৃত্বের মতপার্থক্য দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। জেলেনস্কি স্বীকার করেছেন যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সেনা নেতৃত্বের মধ্যে সম্পর্ক ভেঙে পড়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে “এক পক্ষ বেছে নিতে” হয়েছে।
রাজনৈতিক সংকট প্রশমিত করতে জেলেনস্কি নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘপাল্লার হামলা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত এক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। তবে এই পরিবর্তনে পরিস্থিতি শান্ত হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সরকারের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ইউক্রেনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। ইউরোপীয় মিত্ররাও ঘটনাপ্রবাহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা কমে যাওয়ার পর ইউরোপই এখন ইউক্রেনের প্রধান আর্থিক ও সামরিক সমর্থক। এমন পরিস্থিতিতে নেতৃত্বের অস্থিরতা যুদ্ধ পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক আস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।