পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনের হলফনামাতেও মিলল না একটি জরুরি তথ্য। কতগুলি আবেদন তালিকায় নাম ফেরানোর জন্য, আর কতগুলি কারও নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে, সেই পৃথক হিসাব দেওয়া হয়নি। অথচ আপিলের পাহাড় জমে রয়েছে। পাঁচ মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১ লক্ষের কিছু বেশি আবেদন।

কমিশনের হিসাবে, মোট আপিল ৩৮ লক্ষ ২০ হাজার ৬৮৩টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ১ লক্ষ ২ হাজার ২৩১টির; বকেয়া ৩৭ লক্ষ ১৮ হাজার ৪৫২টি। অর্থাৎ, প্রদত্ত সংখ্যা থেকে হিসাব করলে নিষ্পত্তির হার প্রায় ২.৬৮ শতাংশ, বকেয়া প্রায় ৯৭.৩২ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান আপিল প্রক্রিয়ার ধীরগতির ছবিই তুলে ধরছে।

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর কমিশন পাল্টা হলফনামাটি জমা দেয়। কংগ্রেস নেতা প্রসেনজিৎ বসুর আবেদনের ভিত্তিতে ১৭ জুলাই জারি হওয়া নোটিসের জবাবে এই তথ্য জানানো হয়েছে। বসু বকেয়া আপিল এবং তালিকায় নাম সংযোজন ও বিয়োজনের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছিলেন।

পৃথক হিসাবের অভাবে বকেয়া আবেদনকে সরাসরি ভোটাধিকার হারানো মানুষের সংখ্যা বলা যাবে না। নিজের নাম ফেরানোর আবেদন এবং অন্যের নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি এক বিষয় নয়। দুটিকে একসঙ্গে ধরলে কতজন ভোটার নিজেদের নাম ফেরানোর অপেক্ষায় রয়েছেন, সেই প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া যায় না।

এই কারণেই গত ২৫ অগস্টের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট আবেদনগুলির ধরন অনুযায়ী হিসাব চেয়েছিল। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ জানতে চায়, কত আবেদন জমা পড়েছে, কত নিষ্পত্তি হয়েছে এবং নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলিতে কী প্রতিকার চাওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি, কত আবেদন মঞ্জুর হয়েছে ও তার ভিত্তিতে ভোটার তালিকায় কী পরিবর্তন করা হয়েছে, সেই তথ্যও চাওয়া হয়। কমিশনের আইনজীবী তখন অনলাইনে আবেদন পরিচালনার ব্যবস্থায় কিছু সমস্যা থাকার কথাও জানিয়েছিলেন; দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সেগুলি বদলানোর আলোচনা চলছিল।

আদালতের কাছে আবেদনকারীদের দাবি ছিল, তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের আপিল আগে শোনা হোক। যাঁরা আপিলে জিতেছেন, তাঁদের নাম নিয়ে সম্পূরক তালিকা প্রকাশের দাবিও ওঠে। প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আসন্ন পুরভোট ও পরবর্তী পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, সময়মতো নাম না উঠলে সংশ্লিষ্ট মানুষ ভোট দিতে পারবেন না। আদালত স্পষ্ট করে, গোটা প্রক্রিয়া ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের অনেক আগেই শেষ হওয়া প্রয়োজন।

এখানে সময়ের প্রশ্নটি তাই নিছক প্রশাসনিক নয়। আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পরেও সেই সিদ্ধান্ত ভোটার তালিকায় কার্যকর হওয়া জরুরি। শুনানি শেষ হওয়া, অনুকূল সিদ্ধান্ত পাওয়া এবং সংশোধিত তালিকায় নাম ওঠা আলাদা ধাপ। নির্বাচনের আগে শেষ ধাপটি সম্পূর্ণ না হলে মামলায় সাফল্য পেলেও ভোট দেওয়ার সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যায়। আদালতের চাওয়া তথ্য এই ব্যবধান বুঝতে সাহায্য করবে।

আপিলের এই ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার জন্য। এসআইআরের সময় প্রায় ৬০ লক্ষ দাবি ও আপত্তি খতিয়ে দেখতে পশ্চিমবঙ্গ এবং প্রতিবেশী ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডের প্রায় ৭০০ বিচারবিভাগীয় আধিকারিককে কাজে লাগানো হয়েছিল। পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ও বিচারপতিদের নেতৃত্বে ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করেন। অর্থাৎ, প্রাথমিক যাচাইয়ের পর সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের সামনে পুনর্বিবেচনার পথ রাখা হয়।

গত ২৪ এপ্রিলও শীর্ষ আদালত বলেছিল, নাম বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে জরুরি শুনানির প্রয়োজন দেখাতে পারলে সেই আবেদনকে সাধারণ ক্রমের বাইরে শুনতে হবে। অগস্টের শুনানিতে আদালত ফের সময় বেঁধে নিষ্পত্তির উপর জোর দেয়। প্রয়োজন হলে আরও ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথাও জানায় বেঞ্চ। আবেদনকারীরা নির্দিষ্ট কিছু কেন্দ্রের পরিস্থিতি তুললেও আদালতের বক্তব্য ছিল, উদ্বেগ গোটা রাজ্যের ভোটারদের নিয়ে; পর্যালোচনা কয়েকটি কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

অন্য আবেদনকারীদের আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন তথ্যের অধিকার আইনে পাওয়া একটি জবাবের উল্লেখ করে জানান, বহু আপিল বাদ পড়া ভোটারদের করা নয়। সেই বক্তব্যও পৃথক হিসাবের প্রয়োজনকে সামনে আনে। কোন ধরনের আবেদন বেশি জমছে, তা জানা গেলে শুনানির অগ্রাধিকার এবং অতিরিক্ত বিচারব্যবস্থার প্রয়োজন নির্ধারণ সহজ হবে। তবে আবেদন জমা পড়েছে বলেই অভিযোগ সঠিক প্রমাণিত হয় না। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি ও যুক্তি সতর্কভাবে খতিয়ে দেখেই বিচারমঞ্চকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কমিশনের তরফে অবশ্য শুনানিতে জানানো হয়েছিল, নিষ্পত্তির গতি বাড়াতে ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। কমিশনের আইনজীবী ডি এস নাইডু বলেন, ইতিমধ্যে বৈঠক হয়েছে এবং আরও বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রাইব্যুনালগুলিও প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছে। ফলে কমিশনের অবস্থান ছিল, আবেদনের চাপ সামলাতে সংশ্লিষ্ট বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্ট কমিশন, ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে আরও আলোচনার পরামর্শ দেয়। কতগুলি অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজন হতে পারে, তা-ও জানতে চায়। বিচারপতি বাগচীর পর্যবেক্ষণের মূল কথা ছিল, তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের আপিল করার অধিকার রয়েছে এবং যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে সেই অধিকারের কার্যকর প্রতিকার মিলতে হবে। আদালত আরও ইঙ্গিত দেয়, কোনও আপিল মঞ্জুর হওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার থাকলে বাদ পড়া ব্যক্তির অধিকার কার্যকর করার জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করা সম্ভব।

সেই বিচারে এখন দুটি প্রশ্ন পাশাপাশি থাকছে: আবেদনের নিষ্পত্তি কত দ্রুত হবে এবং অনুকূল সিদ্ধান্ত বাস্তবে কার্যকর হতে কত সময় লাগবে। শুধু মোট মামলার সংখ্যা জানালে প্রথমটির আংশিক ছবি মেলে; দ্বিতীয়টির উত্তর পেতে মঞ্জুর হওয়া আবেদন ও সংশোধিত তালিকার মিল প্রয়োজন। ভোটারের কাছে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন স্পষ্ট সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোটার তালিকায় নিজের অবস্থান জানার সুযোগ।