জ্বালানির টানে পাকিস্তানে কড়াকড়ি, সরকারি বিদেশসফরে নিষেধ

যা জানা জরুরি
- পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের ধাক্কায় জ্বালানির দাম ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তেই ফের কঠোর সাশ্রয়নীতি চালু করল পাকিস্তান।
- বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সরকারি গাড়ির জ্বালানি বরাদ্দ অর্ধেক করা, কর্তাদের বিদেশসফর বন্ধ রাখা এবং দোকানবাজারের সময় বেঁধে দেওয়ার নির্দেশ জারি…
- সরকারি ভাষ্যে, উদ্দেশ্য জ্বালানি বাঁচানো এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের ধাক্কায় জ্বালানির দাম ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তেই ফের কঠোর সাশ্রয়নীতি চালু করল পাকিস্তান। বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সরকারি গাড়ির জ্বালানি বরাদ্দ অর্ধেক করা, কর্তাদের বিদেশসফর বন্ধ রাখা এবং দোকানবাজারের সময় বেঁধে দেওয়ার নির্দেশ জারি করেছে। বিয়েবাড়ির খাবারের তালিকাতেও রাশ টানা হয়েছে। সরকারি ভাষ্যে, উদ্দেশ্য জ্বালানি বাঁচানো এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো।
এই ব্যবস্থাকে ‘লকডাউনের মতো’ বলা হলেও সাধারণ মানুষের চলাফেরা বা বিদেশযাত্রার উপর সার্বিক নিষেধাজ্ঞা জারি হয়নি। বিদেশসফরের বিধিনিষেধ মূলত মন্ত্রী, সাংসদ ও সরকারি কর্তাদের জন্য। দোকানবাজারও সারাদিন বন্ধ থাকছে না। ব্যবসার সময়সীমা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক সরকারগুলিকেও একই ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনা করতে বলেছে। ফলে গোটা পাকিস্তানে একই মুহূর্তে অভিন্ন বিধিনিষেধ কার্যকর হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।
নির্দেশ অনুযায়ী, দোকান, বাজার, বিপণিবিতান, মুদিখানা এবং সাধারণ নিত্যপণ্যের দোকান রাত ন’টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল ও অন্যান্য বাণিজ্যিক উৎসবস্থল খোলা রাখা যাবে রাত দশটা পর্যন্ত। রেস্তরাঁ, কাফে, খাবারের দোকান এবং স্বতন্ত্র ফল ও সবজির দোকান বন্ধের সময় রাত এগারোটা। তবে খাবার কিনে বাড়ি নিয়ে যাওয়া এবং বাড়িতে খাবার পৌঁছে দেওয়ার পরিষেবার ক্ষেত্রে ওই সময়সীমা প্রযোজ্য হবে না।
জরুরি পরিষেবায় ছাড় রাখা হয়েছে। হাসপাতাল, চিকিৎসাকেন্দ্র, ওষুধের দোকান, পরীক্ষাগার এবং চিকিৎসাসামগ্রীর দোকান সময়ের বিধিনিষেধের বাইরে। ছাড় রয়েছে স্বতন্ত্র রুটির দোকান, তন্দুর, দুধ ও দুগ্ধপণ্যের দোকান, পেট্রলপাম্প, প্রাকৃতিক গ্যাসের জ্বালানিকেন্দ্র এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জ দেওয়ার কেন্দ্রেরও। তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা, দূরভাষে গ্রাহক পরিষেবার কেন্দ্র, ব্যায়ামাগার ও ক্রীড়াকেন্দ্রও এই ছাড় পাবে। বিয়েসংক্রান্ত অনুষ্ঠানে অতিথিদের জন্য একটিমাত্র পদ পরিবেশনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি গাড়ির জ্বালানি বরাদ্দ আগামী তিন মাসের জন্য ৫০ শতাংশ কমানো হচ্ছে। তবে সশস্ত্র বাহিনী, আধাসামরিক বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, জরুরি পরিষেবা এবং কেন্দ্রীয় রাজস্ব বিভাগের কাজের প্রয়োজনীয় গাড়িগুলি ছাড় পাবে। এই সংস্থাগুলির প্রশাসনিক ও সরাসরি অভিযানসংক্রান্ত নয়, এমন কাজে ব্যবহৃত গাড়ির ক্ষেত্রে কাটছাঁট কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ বাহিনী বা দপ্তরের পরিচয় দেখালেই সমস্ত গাড়ি ছাড় পাবে না।
সরকারি খরচেও একাধিক নিয়ন্ত্রণ এসেছে। চলতি অর্থবর্ষে কর্মীদের বেতনভাতা ছাড়া অন্যান্য ব্যয়ের বাজেট পাঁচ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; মাসে মাসে সেই কাটছাঁট হবে। বিদেশে পাকিস্তানের দূতাবাসগুলিও এর আওতায় পড়বে, যদিও বাড়িভাড়া, শিক্ষার খরচ ও চিকিৎসার ব্যয় বহাল থাকবে। নতুন সরকারি গাড়ি কেনা নিষিদ্ধ। তথ্যপ্রযুক্তির সরঞ্জাম ছাড়া অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহার্য জিনিস কেনাও বন্ধ থাকবে। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য কয়েকটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
তিন মাসের বিদেশসফর নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও কিছু ছাড় রয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের বৃত্তি, নির্দিষ্ট সরকারি ব্যবস্থায় প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তির অধীনে পাঠক্রম এই নিষেধের বাইরে। একান্ত প্রয়োজনীয় সফরে মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সাংসদ ও সরকারি কর্তাদের বিমানের সাধারণ শ্রেণিতে যাতায়াত করতে হবে। বৈঠক যথাসম্ভব দূরসংযোগে করার নির্দেশ রয়েছে। সরকারি নৈশভোজ বন্ধ, তবে বিদেশি প্রতিনিধিদলের আপ্যায়নে ছাড় আছে। অপরিহার্য আলোচনা, প্রশিক্ষণ বা সম্মেলন সরকারি ভবনেই আয়োজন করতে হবে।
এই সিদ্ধান্তের পিছনে রয়েছে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার উপর যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান চাপ। আমেরিকা ও ইরানের সংঘাতের পাশাপাশি লোহিত সাগর ঘিরে নতুন উদ্বেগ তেল ও গ্যাস পরিবহণকে অনিশ্চিত করেছে। পাকিস্তানের সামনে তাই দু’দিকের সমস্যা: আমদানির খরচ বাড়ছে, আবার প্রয়োজনমতো সরবরাহ পাওয়ার নিশ্চয়তাও কমছে। গ্যাসের জোগানে বিঘ্ন ঘটলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দামের সাম্প্রতিক হিসাবেও চাপটি স্পষ্ট। ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে ঘোষিত সংশোধনে প্রতি লিটার পেট্রলের দাম দাঁড়িয়েছে ৩৯০.৭৯ পাকিস্তানি রুপি এবং ডিজেলের দাম ৪২৪.৯২ রুপি। আগের দিনের তুলনায় পেট্রল ০.৪৩ রুপি সস্তা হলেও ডিজেল বেড়েছে ৩.৪৭ রুপি। এই হার ১৮ সেপ্টেম্বরের জন্য প্রযোজ্য। ফলে সামান্য পেট্রলদর হ্রাসকে সামগ্রিক স্বস্তি বলা কঠিন। ডিজেলের বাড়তি দাম পণ্য পরিবহণ ও কৃষিকাজের খরচে চাপ ফেলতে পারে।
পাকিস্তান এখন প্রতিদিন জ্বালানির দাম সংশোধন করছে। আগে পাক্ষিক, পরে সাপ্তাহিক পর্যালোচনা হত। নতুন ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারের সাত দিনের গড় দামের ভিত্তিতে হার নির্ধারিত হচ্ছে। ফলে বাজারের ওঠাপড়া দ্রুত পৌঁছচ্ছে ক্রেতার কাছে, বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
মানুষকে কিছুটা সুরাহা দিতে মোটরসাইকেল, রিকশা ও ছোট গাড়ির জন্য নির্দিষ্ট মাসিক সীমার মধ্যে প্রতি লিটারে ১০০ পাকিস্তানি রুপি ভর্তুকির ব্যবস্থাও চালু হয়েছে। কিন্তু সুবিধা পাওয়ার নিবন্ধনপ্রক্রিয়া নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে করাচির এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, মোটরসাইকেল ও পরিচয়পত্রের তথ্য নথিভুক্ত করতে গিয়ে তাঁকে বারবার অসুবিধায় পড়তে হয়েছে। অর্থাৎ ঘোষিত সহায়তা বাস্তবে কত সহজে মানুষের কাছে পৌঁছবে, সেই প্রশ্নও থাকছে।
এ বছর এমন কড়াকড়ি প্রথম নয়। মার্চে যুদ্ধের অভিঘাত সামলাতে দু’সপ্তাহ স্কুল বন্ধ, সরকারি দপ্তরে জ্বালানি ব্যবহার কমানো এবং বাড়ি থেকে কাজের ব্যবস্থা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়। নতুন ঘোষণায় ফের ব্যয়সাশ্রয়ের পথে ফিরল সরকার। তবে মার্চের স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্তকে সেপ্টেম্বরের নতুন নির্দেশ বলে ধরে নেওয়া যাবে না। এবারের ঘোষণার কেন্দ্রে রয়েছে সরকারি ব্যয়, সফর এবং ব্যবসার সময়।
সাশ্রয়ের প্রয়োজন থাকলেও তার সামাজিক মূল্য রয়েছে। রাতে দোকান খোলা রাখার সময় কমলে বিক্রি ও কর্মীদের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে জ্বালানি ব্যবহার না কমালে আমদানির বাড়তি বোঝা সামলানো আরও কঠিন হবে। পাকিস্তানের সামনে এখন তাই একই সঙ্গে দুটি কাজ: জরুরি পরিষেবা ও উৎপাদনের জন্য জ্বালানি নিশ্চিত করা এবং সেই ব্যবস্থা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবিকা যতটা সম্ভব রক্ষা করা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



