কাজিরাঙা সংলগ্ন প্রস্তাবিত বিলাসবহুল হোটেল প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জেরে গ্রেপ্তার হওয়া ভূমি-অধিকার আন্দোলনের নেতা প্রণব দলেকে স্থানীয় আদালত জামিন দেওয়ার একদিনের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ) প্রয়োগ করল অসম সরকার। সরকারের দাবি, তাঁর কর্মকাণ্ড “জনশৃঙ্খলা রক্ষা ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার পক্ষে ক্ষতিকর”।
প্রণব দলে অসমের অন্যতম পরিচিত আদিবাসী ও ভূমি-অধিকার কর্মী। গত ১২ জুলাই গোলাঘাট পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। ২৮ জুন কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের লাগোয়া ইংলে পাথরে প্রস্তাবিত একটি বিলাসবহুল হোটেল প্রকল্পের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। একই মামলায় আরও চার জন আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বহু বছর ধরেই দলে ওই প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছেন। তাঁর অভিযোগ, এই প্রকল্প পরিবেশের ক্ষতি করবে এবং স্থানীয় আদিবাসী গ্রামবাসীদের উচ্ছেদের ঝুঁকি তৈরি করবে।
পুলিশের এফআইআরে দাবি করা হয়েছে, দলে ও প্রায় ৫০ জন সমর্থক পরিকল্পিতভাবে দা, ধারালো লাঠিসহ বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করেন। তাঁরা সিমেন্ট মিক্সারে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেন, কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের উপর হামলা চালান, জনতাকে উসকে দেন এবং ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের হুমকি দেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
২৯ জুলাই গোলাঘাটের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক প্রণব দলেকে জামিন দেওয়ার সময় বলেন, তদন্তে পুলিশের অভিযোগের পক্ষে প্রাথমিকভাবে কোনও ভিডিও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী অফিসার কোনও “মারাত্মক অস্ত্র”ও উদ্ধার করতে পারেননি।
তদন্তে সহযোগিতার শর্তে জামিন মঞ্জুর করে আদালত পর্যবেক্ষণ করে, “পরিবেশ সংরক্ষণ ও আদিবাসী মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন যেখানে জড়িত, সেখানে মানুষের উদ্বেগকে দমন করতে ফৌজদারি আইনকে ব্যবহার করা উচিত নয়। প্রকৃত জনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয় মানুষের কণ্ঠরোধ করে নয়, তাঁদের কথা শুনে।”
আদালত আরও জানায়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে চা-জনজাতির মতো সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে তারা রাষ্ট্র বা কর্পোরেট সংস্থার সঙ্গে সমান অবস্থানে আলোচনা করতে পারে না। তাই সমাজকর্মী বা আন্দোলনের নেতাদের “বহিরাগত গোলমাল সৃষ্টিকারী” হিসেবে দেখলে দীর্ঘমেয়াদে কোনও ইতিবাচক ফল মিলবে না। বরং সব পক্ষকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমেই স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
জামিনের পর এনএসএ
তবে আদালত জামিন দিলেও প্রণব দলে তখনও গোলাঘাট জেলা কারাগারে ছিলেন। সেই সময়ই গোলাঘাটের পুলিশ সুপারের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অসম সরকার তাঁর বিরুদ্ধে এনএসএ-তে আটক রাখার নির্দেশ জারি করে।
সরকারি নির্দেশে বলা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রকৃতি, গুরুত্ব, পুনরাবৃত্তি এবং সম্ভাব্য পরিণতি বিবেচনা করে সরকার মনে করেছে, মুক্তি পেলে তিনি আবারও জনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবিরোধী কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়তে পারেন।
এনএসএ-র নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গোলাঘাট জেলায় তাঁর বিরুদ্ধে মোট ১৩টি মামলা রয়েছে। সেগুলিতে বেআইনি জমায়েত, দাঙ্গা, ভয় দেখানো-সহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ, তিনি রাস্তা অবরোধ থেকে শুরু করে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং ব্যক্তিগত ও বিশেষ স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থির করার চেষ্টা করেছেন।
এছাড়া, তাঁর বিরুদ্ধে বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন (এফসিআরএ)লঙ্ঘন করে সন্দেহজনক বিদেশি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও আনা হয়েছে।
৪০ বছর বয়সি প্রণব দলে গ্রেটার কাজিরাঙা ল্যান্ড অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস কমিটি-র আহ্বায়ক। চলতি বছরের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি বোকাখাট কেন্দ্র থেকে নির্দল প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে জেনেভায় রাষ্ট্রপুঞ্জের ব্যবসা ও মানবাধিকার বিষয়ক ফোরামেও তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন।