বিহারের ব্যাঙ্কিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে জন সুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোরের জয় শুধু একটি আসনের ফল নয়, রাজ্যের রাজনীতিতে সম্ভাব্য নতুন সমীকরণের ইঙ্গিতও বটে। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ব্যাঙ্কিপুরে কিশোরের জয় অবশ্যই বিজেপির জন্য বড় ধাক্কা। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল বিজেপির চেয়ে আরও বেশি উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি)-র কাছে। কারণ, বিরোধী রাজনীতির বিকল্প মুখ হিসেবে প্রশান্ত কিশোরের উত্থান সরাসরি আরজেডির রাজনৈতিক পরিসরেই আঘাত হানতে পারে।
ব্যাঙ্কিপুর আসনটি গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিজেপির দখলে ছিল। শহুরে মধ্যবিত্ত, উচ্চবর্ণ ভোটার এবং সংগঠনিক শক্তির জোরে দলটি এখানে কার্যত অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। সেই আসনেই প্রশান্ত কিশোর প্রায় ১৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হওয়ায় বিজেপির সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং ভোটভিত্তির ক্ষয় স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে উপনির্বাচনে সাধারণত শাসক বা শক্তিশালী দলের সংগঠনই বাড়তি সুবিধা পায়। সেখানে বিজেপির পরাজয় দলের কাছে নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর।
তবে এই ফলের রাজনৈতিক অভিঘাত বিজেপির সীমা ছাড়িয়ে আরও দূর পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। কারণ, এই নির্বাচনে আরজেডি কার্যত প্রতিযোগিতা থেকেই ছিটকে গিয়েছে। দলটির ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া দেখিয়েছে যে বিজেপিবিরোধী ভোটের একটি অংশ আর আরজেডিকে স্বাভাবিক বিকল্প হিসেবে দেখছে না। সেই ভোটের বড় অংশই প্রশান্ত কিশোরের দিকে সরে এসেছে।
প্রশান্ত কিশোর দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন, বিহারের রাজনীতিতে লালু প্রসাদ যাদব ও নীতীশ কুমারের যুগ শেষের পথে। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যের মানুষ জাতপাতের পুরনো সমীকরণ ছেড়ে উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক দক্ষতার ভিত্তিতে নতুন রাজনীতি চাইছেন। ব্যাঙ্কিপুরের ফল তাঁর সেই দাবিকে অন্তত আংশিকভাবে বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছে।
আরজেডির সমস্যা এখানেই। এতদিন বিজেপিবিরোধী ভোটের প্রধান ভরকেন্দ্র ছিল তারা। কিন্তু যদি সেই ভোট ধীরে ধীরে জন সুরাজের দিকে সরে যেতে শুরু করে, তাহলে ভবিষ্যতের বিধানসভা নির্বাচনে আরজেডির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে শহরাঞ্চল, তরুণ ভোটার, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং প্রথমবার ভোট দিতে আসা প্রজন্মের মধ্যে প্রশান্ত কিশোর যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করছেন, তা আরজেডির জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে বিজেপির জন্য এই ফল সতর্কবার্তা হলেও দলটির সংগঠন, আর্থিক সামর্থ্য এবং বিস্তৃত ভোটভিত্তি এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। একটি উপনির্বাচনের ফলকে রাজ্যজুড়ে জনসমর্থনের চূড়ান্ত সূচক বলা যাবে না। বিজেপি চাইলে সংগঠন পুনর্গঠন, প্রার্থী নির্বাচনে পরিবর্তন এবং স্থানীয় অসন্তোষ দূর করে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ এখনও রাখে।
আরজেডির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে কঠিন। কারণ, দলটির সামনে এখন দ্বৈত লড়াই। একদিকে বিজেপির মোকাবিলা, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের মধ্যেই নতুন শক্তি হিসেবে উঠে আসা প্রশান্ত কিশোরকে সামলানো। ফলে বিরোধী ভোটে বিভাজনের আশঙ্কা আরও বাড়ছে।
এই উপনির্বাচন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে। প্রশান্ত কিশোর কেবল নির্বাচনী কৌশলবিদ নন, তিনি এখন নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম নেতা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছেন। এতদিন অনেকেই মনে করতেন তাঁর জনপ্রিয়তা মূলত প্রচারনির্ভর। কিন্তু একটি কঠিন আসনে সরাসরি নির্বাচনে জয় সেই ধারণাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, কিশোরের প্রচারে উন্নয়ন, শিক্ষা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলি গুরুত্ব পেয়েছে। জাতিগত মেরুকরণের বাইরে গিয়ে এই ধরনের ইস্যুভিত্তিক প্রচার যদি ভবিষ্যতেও ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারে, তাহলে বিহারের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
তবে এই ফলের ভিত্তিতে বড় সিদ্ধান্তে পৌঁছনোও ঠিক হবে না। উপনির্বাচনের ভোটাভ্যাস অনেক সময় সাধারণ নির্বাচনের থেকে আলাদা হয়। স্থানীয় ইস্যু, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং কম ভোটদানের হার ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখে। তাই ব্যাঙ্কিপুরের সাফল্যকে রাজ্যজুড়ে পুনরাবৃত্তি করতে হলে জন সুরাজকে আরও শক্তিশালী সংগঠন গড়তে হবে এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে সমানভাবে প্রভাব বিস্তার করতে হবে।
সব মিলিয়ে ব্যাঙ্কিপুরের ফল বিজেপিকে সতর্ক করেছে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে আরও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে আরজেডির ভবিষ্যৎ নিয়ে। প্রশান্ত কিশোর যদি বিজেপিবিরোধী ভোটের নতুন কেন্দ্র হয়ে ওঠেন, তাহলে বিহারের রাজনীতিতে বহুদিনের প্রতিষ্ঠিত সমীকরণ বদলে যেতে পারে। সেই অর্থে এই উপনির্বাচনের সবচেয়ে বড় বার্তা শুধু বিজেপির হার নয়, বরং বিরোধী রাজনীতির নেতৃত্ব নিয়ে নতুন প্রতিযোগিতার সূচনা।