ক সময় দ্রুত এবং আপসহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণকেই নিজেদের শাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরত বিজেপি। সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ কিংবা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাশের মতো বিতর্কিত পদক্ষেপও দলটি নিয়েছিল বিরোধিতা বা সম্ভাব্য প্রতিবাদের তোয়াক্কা না করে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় সেই পরিচিত দৃঢ়তার জায়গায় দেখা যাচ্ছে সতর্কতা, পরামর্শ এবং প্রয়োজনে পিছিয়ে আসার প্রবণতা। রাজস্থানে বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো উন্নয়নে বিপুল অর্থ বরাদ্দ থেকে গোয়ায় ধর্মান্তর-বিরোধী বিল স্থগিত রাখা—ঘটনাগুলি ইঙ্গিত দিচ্ছে, জনমত ও রাজনৈতিক চাপের প্রতি বিজেপি এখন আগের চেয়ে বেশি সংবেদনশীল।

এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি জুলাইয়ে দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্র-যুব বিক্ষোভ। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ক্রমে সরকারের নিয়োগ, পরীক্ষা পরিচালনা এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। আন্দোলনের চাপে বারো বছরের মধ্যে প্রথম কোনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয় বলে উল্লেখ করেছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। তারপর থেকেই কেন্দ্র এবং বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলির আচরণে অনেক বেশি হিসাবি মনোভাব লক্ষ করা যাচ্ছে।

রাজস্থানের ভজনলাল শর্মা সরকার ২১ আগস্ট রাজ্যের বিদ্যালয়গুলির পরিকাঠামো আমূল বদলে দিতে তিন বছরে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। বিরোধী ছাত্র সংগঠনের বিদ্যালয় নিরীক্ষা কর্মসূচির মধ্যেই এই ঘোষণা তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্যে স্থানীয় সংস্থার নির্বাচন সামনে। ভাঙাচোরা বিদ্যালয় ভবন, শৌচাগার ও পানীয় জলের অভাব কিংবা অপর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নিয়ে অসন্তোষ যাতে বৃহত্তর আন্দোলনে পরিণত না হয়, সরকার আগেভাগেই তা সামাল দিতে চেয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।

গোয়ায় সতর্কতার ছবিটি আরও স্পষ্ট। রাজ্য মন্ত্রিসভা ‘গোয়া প্রহিবিশন অব আন-লফুল কনভার্সন অব রিলিজিয়ন বিল, ২০২৬’ অনুমোদন করেছিল। বলপ্রয়োগ, প্রলোভন, প্রতারণা অথবা বিয়ের মাধ্যমে বেআইনি ধর্মান্তরের অভিযোগে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল প্রস্তাবিত আইনে। এমনকি কোনও কোনও ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধানও ছিল। কিন্তু বিরোধীদের পাশাপাশি বিজেপির নিজের কয়েকজন বিধায়ক এবং সরকার-সমর্থক নির্দল সদস্যও প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত তথ্য ও আলোচনা ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে বিলটি আনা হচ্ছে; এতে গোয়ার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদ সাওয়ান্ত বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠকের পর বর্ষাকালীন অধিবেশনে বিলটি পেশ না করার সিদ্ধান্ত নেন। বিজেপি বিধায়ক মাইকেল লোবো প্রকাশ্যেই বলেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার তাড়াহুড়ো করেছিল। যে দল সাধারণত ধর্মান্তর-বিরোধী আইনকে তার আদর্শগত কর্মসূচির অংশ বলে মনে করে, তার একটি রাজ্য সরকারের এই পিছিয়ে আসা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

দিল্লিতেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। ২০ জুলাইয়ের ছাত্র বিক্ষোভে ছররা গুলিতে এক উনিশ বছরের তরুণ আহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। প্রথম দিকে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে অনিচ্ছুক থাকলেও লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী আহত তরুণ ও তাঁর মাকে নিয়ে থানার সামনে সাত ঘণ্টা অবস্থান করার পরে ২১ আগস্ট মামলা দায়ের করা হয়। বিরোধীদের চাপ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার বদলে প্রশাসন শেষ পর্যন্ত সাড়া দিয়েছে।

বিজেপির একাংশ অবশ্য কোনও রাজনৈতিক সঙ্কটের কথা মানতে নারাজ। তাদের যুক্তি, চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে মোট দেশজ উৎপাদন ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধি সরকারের পক্ষে স্বস্তির সংবাদ। দিল্লিতে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বরের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে সামনে এনে ঘরোয়া অস্বস্তি আড়াল করতে পারে বলে তাদের আশা।

তবু দলের অন্য একটি অংশ বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে অতীতের দু’টি অস্বস্তিকর পর্বের তুলনা করছে। একটি, ২০০৫ সালে পাকিস্তান সফরে লালকৃষ্ণ আডবাণীর মহম্মদ আলি জিন্নাকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বলা ঘিরে বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সংঘাত। অন্যটি, ১৯৯০ সালে মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকর হওয়ার পরে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমীকরণ বদলে যাওয়া। দলীয় নেতাদের আশঙ্কা, ২০১৪ সাল থেকে ব্যবহৃত কিছু রাজনৈতিক স্লোগান আর আগের মতো ধারালো নেই। বিশেষ করে যুবসমাজের একটি প্রভাবশালী অংশের কাছে মোদীর প্রত্যক্ষ জনসংযোগও আগের মতো অনুরণন তুলছে না।

নিট-বিরোধী ছাত্র আন্দোলন যদি পরীক্ষা ও নিয়োগের সীমা ছাড়িয়ে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং শাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বৃহত্তর ক্ষোভে পরিণত হয়, তা হলে বিজেপিকে আরও নমনীয় হতে হতে পারে। তবে এই সতর্কতাকে দুর্বলতার চূড়ান্ত প্রমাণ বলাও তাড়াহুড়ো হবে। কৃষক আন্দোলনের পরে তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ধাক্কার পরেও বিজেপি রাজনৈতিক গতিপথ সংশোধন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।

আজও দলটি দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন। পার্থক্য শুধু এই—আগে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বিরোধীদের মোকাবিলা করা হত; এখন সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বুঝে সিদ্ধান্তের গতি ও ভাষা ঠিক করা হচ্ছে। অর্থাৎ বিজেপির রাজনীতিতে দৃঢ়তা অদৃশ্য হয়নি, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাপ মাপার নতুন রাজনৈতিক হিসাব।