হাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় উপাদান ‘অন্ধকার পদার্থ’ বা ডার্ক ম্যাটারের সন্ধানে মিলেছে নতুন সূত্র। আমেরিকার সাউথ ডাকোটায় ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১.৬ কিলোমিটার নীচে বসানো একটি যন্ত্রে এমন একটি কণার সংঘর্ষ ধরা পড়েছে, যার বৈশিষ্ট্য অন্ধকার পদার্থের সম্ভাব্য কণা ‘উইম্প’-এর সঙ্গে মিলে যায়। তবে বিজ্ঞানীরা এখনই অন্ধকার পদার্থ আবিষ্কারের দাবি করছেন না। তাঁদের সতর্ক বক্তব্য—এটি দীর্ঘ অনুসন্ধানের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে।

সাউথ ডাকোটার ব্ল্যাক হিলস অঞ্চলের পরিত্যক্ত সোনার খনিতে গড়ে তোলা স্যানফোর্ড ভূগর্ভস্থ গবেষণাগারে চলছে ‘লাক্স-জেপলিন’ বা ‘এলজেড’ পরীক্ষা। মহাজাগতিক রশ্মি ও অন্যান্য বিকিরণের প্রভাব এড়াতেই পরীক্ষাগারটিকে এত গভীরে রাখা হয়েছে। সেখানে একটি বিশাল নলাকার শনাক্তকারী যন্ত্রে প্রায় ১০ টন অতি বিশুদ্ধ তরল জেনন রাখা হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, অন্ধকার পদার্থের কোনও কণা জেনন পরমাণুর কেন্দ্রকের সঙ্গে ধাক্কা খেলে সামান্য শক্তি স্থানান্তরিত হবে। তার ফলে অতিবেগুনি আলোর ক্ষীণ ঝলক তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পরমাণুর কেন্দ্রকটি সামান্য সরে যাবে। একেই বলা হয় ‘নিউক্লিয়ার রিকয়েল’। এলজেড যন্ত্রে ধরা পড়া ঘটনাটিতে ঠিক এমনই লক্ষণ দেখা গিয়েছে।

২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সংগৃহীত ২২০ দিনের তথ্য নতুন করে বিশ্লেষণ করে ঘটনাটি চিহ্নিত করেন গবেষকেরা। সংঘর্ষে প্রায় ২৪৮ কিলো-ইলেকট্রনভোল্ট শক্তির প্রতিঘাত তৈরি হয়েছিল। এই শক্তির মাত্রা সাধারণ অনুসন্ধানের সীমার চেয়ে বেশি। তাই আগের বিশ্লেষণে ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। অনুসন্ধানের পরিধি বাড়ানোর পরই তার তাৎপর্য সামনে আসে।

গবেষকদের মতে, ঘটনাটি সত্যিই অন্ধকার পদার্থের কারণে ঘটে থাকলে সংশ্লিষ্ট উইম্প কণাটির ভর প্রোটনের তুলনায় অন্তত ২০০ গুণ বেশি হতে পারে। পরিচিত পটভূমিগত বিকিরণ থেকে এমন ঘটনা ঘটার আশঙ্কা প্রায় ২০০ বারের মধ্যে এক বার। ফলটির পরিসংখ্যানগত গুরুত্ব ২.৬ সিগমা। অথচ পদার্থবিদ্যায় কোনও আবিষ্কার নিশ্চিত করতে সাধারণত পাঁচ সিগমা প্রয়োজন।

গবেষণার প্রধান লেখক ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যাম এরিকসেন বলেছেন, এটি অন্ধকার পদার্থ প্রত্যক্ষ করার প্রথম আভাস হতে পারে। কিন্তু মাত্র একটি ঘটনা পাওয়া গিয়েছে বলে কোনও চূড়ান্ত দাবি করা সম্ভব নয়।

দৃশ্যমান নক্ষত্র, গ্রহ ও জীবজগৎ মিলিয়ে মহাবিশ্বের মোট পদার্থের মাত্র ১৫ শতাংশ গঠিত। বাকি প্রায় ৮৫ শতাংশই অন্ধকার পদার্থ বলে মনে করা হয়। এটি আলো নির্গত বা প্রতিফলিত করে না; তাই দূরবিনে দেখা যায় না। ছায়াপথগুলির উপর তার মহাকর্ষীয় প্রভাব থেকেই অস্তিত্বের অনুমান। এলজেড পরীক্ষায় আরও এমন ঘটনা ধরা পড়লে শতবর্ষব্যাপী সেই রহস্যের পর্দা অবশেষে উঠতে পারে।