Home বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চোখ নাকি ক্যামেরা? মেটার চশমায় গোপনীয়তার ফাঁক

চোখ নাকি ক্যামেরা? মেটার চশমায় গোপনীয়তার ফাঁক

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
6 views 4 minutes read
A+A-
Reset

মেটার নতুন স্মার্ট চশমা সত্যিই কতটা তার ইতিমধ্যে পাওয়া ‘পারভার্ট গ্লাসেস’ বা ‘বিকৃতকামীদের চশমা’ তকমাকে সার্থক করে তুলবে, তা এখনই বলা কঠিন। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—চোখের সামনে যা দেখা হচ্ছে এবং সেই দৃশ্য গোপনে ক্যামেরাবন্দি করার মধ্যে যে সীমারেখা ছিল, এই প্রযুক্তি তা ক্রমশ ঝাপসা করে দিচ্ছে।

গত এক সপ্তাহে মেটার স্মার্ট চশমা নিয়ে সমালোচনা বেড়েছে। ব্রিটেনের পাব চেন ওয়েদারস্পুনস, থিয়েটার গোষ্ঠী এটিজি, একাধিক রেস্তরাঁ, স্কুল এবং সদস্য-নির্ভর ক্লাব নিজেদের চত্বরে এই চশমা নিষিদ্ধ করেছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নে এই প্রতিষ্ঠানগুলির অবস্থান প্রশংসনীয়। বরং প্রশ্ন উঠছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি কি ফের প্রযুক্তির গতির থেকে পিছিয়ে পড়ছে?

উদ্বেগের কারণ একেবারেই কাল্পনিক নয়। ইতিমধ্যেই নারীদের হেনস্তার ঘটনায় এই ধরনের পরিধানযোগ্য ক্যামেরা ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। চলতি বছরের গোড়ায় বিবিসি এমন কয়েক জন মহিলার সঙ্গে কথা বলেছিল, যাঁদের অনুমতি ছাড়াই ভিডিও করা হয়েছিল এবং পরে সেই ছবি বা ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। একটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কনটেন্ট নির্মাতা ভিডিও সরিয়ে নেওয়ার বিনিময়ে ওই মহিলার কাছেই টাকা দাবি করেছিলেন।

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে নথিভুক্ত যৌন অপরাধের সংখ্যা ১১ শতাংশ বেড়েছিল। এই বৃদ্ধির অর্ধেকেরও বেশি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল অনুমতি ছাড়া যৌন ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া এবং ‘সাইবারফ্ল্যাশিং’। দৈনন্দিন জীবনে স্মার্ট চশমার ব্যবহার যদি আরও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তা হলে এই ধরনের অপরাধের সুযোগ আরও বাড়তে পারে—এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।

তবে সমস্যাটা শুধু যৌন হেনস্তায় আটকে নেই। প্রশ্নটি আরও মৌলিক—কেউ কি প্রতিদিনের জীবনে নিজের অজান্তে অন্যের ক্যামেরায় বন্দি হতে চান?

প্রকাশ্য জায়গায় ভিডিও করা সব সময় বেআইনি নয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে স্মার্ট চশমা পরে থাকা একজন ব্যক্তি আশপাশের প্রত্যেককে তাঁদের সম্মতি ছাড়াই নজরদারির আওতায় রাখার নৈতিক অধিকার পেয়ে গেলেন।

মেটার চশমায় ক্যামেরা চালু হলে একটি এলইডি আলো জ্বলে ওঠে এবং সেটি বন্ধ করা যায় না—সংস্থার দাবি, এটিই গোপন রেকর্ডিং ঠেকানোর সুরক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হল, দূর থেকে বা ব্যস্ত পরিবেশে একজন মানুষ সেই ছোট্ট আলো আদৌ খেয়াল করবেন কি?

পাব, পার্ক, সমুদ্রসৈকত কিংবা কর্মক্ষেত্র কোনওটাই তো সিনেমার সেট নয়, যেখানে প্রত্যেকে জানেন কখন ক্যামেরা চলছে।

মেটার লক্ষ্য আরও বড়

মার্ক জ়াকারবার্গের সংস্থা এই প্রযুক্তিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। ফলে প্রকল্পটি থেকে পিছিয়ে আসার সম্ভাবনা খুব কম। বরং মেটার লক্ষ্য আরও উচ্চাভিলাষী—মুখে পরা এই স্মার্টফোন-সদৃশ প্রযুক্তিকে এক দিন হাতে ধরা স্মার্টফোনের মতোই সর্বব্যাপী করে তোলা।

এক দশকেরও বেশি আগে গুগলের স্মার্ট চশমা বাজারে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মেটা এ বার চশমাটিকে আরও আকর্ষণীয়, ব্যবহারযোগ্য এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী করেছে। ব্রিটেনে দাম শুরু হচ্ছে ২৬৯ পাউন্ড থেকে।

বাজার ধরতে বিজ্ঞাপনেও জোর দেওয়া হচ্ছে। এ বছরের গ্রীষ্মের প্রচারে কাইলি জেনারকে মুখ করা হয়েছে। ছোট সন্তানের বাবা-মায়েদের উদ্দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে—‘নেভার মিস আ মোমেন্ট’। অর্থাৎ, সন্তানের জীবনের কোনও মুহূর্ত যেন ক্যামেরাবন্দি করা থেকে বাদ না যায়।

কিন্তু প্রশ্ন হল, কোনও মুহূর্ত হাতছাড়া না করার এই তাড়নায় অন্য কারও ব্যক্তিগত মুহূর্তও কি অজান্তে আপনার ক্যামেরায় ঢুকে পড়বে?

সবটাই কি খারাপ? মোটেই নয়

স্মার্ট চশমার সম্ভাব্য উপকারিতাও যথেষ্ট। বিশেষ করে দৃষ্টিহীন বা ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে। লেখা পড়ে শোনানো, সামনে থাকা বস্তু বা দৃশ্যের বর্ণনা দেওয়া—এই সুবিধাগুলি কারও দৈনন্দিন জীবন অনেকটাই সহজ করে দিতে পারে। কেউ কেউ এই প্রযুক্তিকে জীবন বদলে দেওয়ার মতোও মনে করছেন।

তাই ব্রিটেন বা অন্য কোনও দেশে বিধিনিষেধ আরোপের সময় এই ব্যবহারগুলিকে আলাদা করে দেখা জরুরি। যেমন সাধারণ ভাবে পোষ্য প্রাণীর প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও দৃষ্টিহীন মানুষের সহায়ক কুকুরের ক্ষেত্রে ছাড় থাকে, তেমনই বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে স্মার্ট চশমার ব্যবহারেও যুক্তিসঙ্গত ব্যতিক্রম রাখা যেতে পারে।

কিন্তু উপকারের সম্ভাবনা দেখিয়ে ঝুঁকির প্রশ্নটি চাপা দেওয়া যায় না।

নিয়ম আসবে কবে?

প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ কঠিন—এ কথা সত্যি। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা আরও একটি বিষয় দেখিয়েছে। ব্রিটিশ সরকার যখন তরুণদের স্মার্টফোন ব্যবহার সীমিত করার উদ্যোগ নিচ্ছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে যৌন ছবি তৈরির বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি হচ্ছে, তখন পরিধানযোগ্য প্রায়-গোপন ক্যামেরার বিস্তার নিয়ে নীতিনির্ধারকদের নীরবতা যথেষ্ট উদ্বেগজনক।

গত দুই দশকের ডিজিটাল অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা একটাই—প্রযুক্তি সংস্থাগুলি তাদের পণ্যকে ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণাধীন ‘হাতিয়ার’ হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে সেই নিয়ন্ত্রণ প্রায় কখনওই সম্পূর্ণ থাকে না।

মেটার স্মার্ট চশমাও তার ব্যতিক্রম নয়।

সমস্যা তাই চশমায় নয়, চোখের সামনে থাকা দৃশ্যের মালিক কে—এই প্রশ্নে। একজন ব্যবহারকারী কখন ক্যামেরা চালু করবেন, সেটি তাঁর সিদ্ধান্ত। কিন্তু তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কখন ক্যামেরাবন্দি হবেন, সেই সিদ্ধান্ত যদি তাঁর হাতে না থাকে, তা হলে প্রযুক্তি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সীমারেখা নিয়ে নতুন করে ভাবতেই হবে।

প্রযুক্তি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার পরে তার অপব্যবহারের ক্ষতি সামলানোর চেষ্টা করার চেয়ে, এখনই সম্মতি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নজরদারির স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।

চোখে যা দেখা যায়, তা আর ক্যামেরায় যা ধরা পড়ে—দুটিকে এক করে দেওয়ার আগে অন্তত এই পার্থক্যটুকু বাঁচিয়ে রাখা দরকার।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles