বাংলাস্ফিয়ার: ঘর থেকে উঠে বেশ জোর পায়েই পাশের ঘরে গেলেন। দরজা পেরিয়েই থমকে দাঁড়ালেন—কেন এসেছিলেন এখানে? কিছু একটা নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কী?
বন্ধুর সঙ্গে গল্প করতে করতে চমৎকার একটা কথা মনে এসেছিল। বলতে যাবেন, অথচ ঠিক সেই মুহূর্তে শব্দটাই উধাও। পরিচিত কারও নাম মনে পড়ছে না। একটি কাজ শেষ করতে আগের চেয়ে বেশি মনঃসংযোগ করতে হচ্ছে। বইয়ের একই অনুচ্ছেদ দু’বার পড়েও মনে থাকছে না। কখনও আবার নির্দিষ্ট কোনও ভুল নয়—সারাটা দিনই যেন মাথার ভিতর একটা অদৃশ্য কুয়াশা।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক রোগের নাম নয় ‘ব্রেন ফগ’। অথচ চিকিৎসকদের কাছে এই অভিযোগ নিয়ে আসা মানুষের সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে সাম্প্রতিক চিকিৎসা গবেষণায় শব্দটি ক্রমশ জায়গা করে নিচ্ছে। কোভিড-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার সূত্রে ‘ব্রেন ফগ’ নিয়ে আলোচনা সবচেয়ে বেশি হলেও এখন দেখা যাচ্ছে, অন্ত্রের প্রদাহ থেকে মেনোপজ, স্লিপ অ্যাপনিয়া থেকে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি—বহু শারীরিক সমস্যার সঙ্গেই জড়িয়ে থাকতে পারে এই মানসিক কুয়াশা।
কিংস কলেজ লন্ডনের কগনিটিভ অ্যান্ড কম্পিউটেশনাল নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক এবং ব্রেন ফগ গবেষক অ্যাডাম হ্যাম্পশায়ারের বক্তব্যের সারকথা, সমস্যাটি বাস্তব। মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থেকে দৈনন্দিন জীবন—সব কিছুর উপর তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই একে নিছক ভুলে যাওয়া বা বয়সের স্বাভাবিক ফল বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি বুঝতে হবে। ব্রেন ফগ নিজে কোনও রোগ নয়, একটি উপসর্গ। ফলে চিকিৎসার প্রথম কাজ কুয়াশা সরানোর ওষুধ খোঁজা নয়; খুঁজে বার করা, কুয়াশাটি তৈরি হচ্ছে কেন।
কখন সাধারণ ভুলে যাওয়া আর কখন ‘ব্রেন ফগ’
চাবি কোথায় রেখেছেন মনে না পড়া কিংবা পরিচিত একটি নাম সাময়িক ভাবে ভুলে যাওয়া মাত্রই ব্রেন ফগ নয়। চিকিৎসকদের উদ্বেগ বাড়ে তখন, যখন মনঃসংযোগ, স্মৃতি, শব্দ খুঁজে পাওয়া বা চিন্তাভাবনার গতি কমে যাওয়ার সমস্যা দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করতে শুরু করে।
গুরুতর ক্ষেত্রে কাজ চালিয়ে যাওয়া, সংসারের দায়িত্ব পালন কিংবা স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আবার জটিলতা হল, অনেকের প্রচলিত বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক আসে। তাঁরা উত্তর ঠিকই দিতে পারেন, কিন্তু একই উত্তর পেতে তাঁদের মস্তিষ্ককে আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছে। ফলে পরীক্ষার রিপোর্ট ‘স্বাভাবিক’ দেখে রোগীর সমস্যাকে কাল্পনিক ভাবারও সুযোগ নেই।
বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, থাইরয়েডের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া, এমনকি ডিমেনশিয়ার প্রাথমিক পর্যায়েও এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু তার বাইরেও রয়েছে অন্তত ছ’টি কারণ, যেগুলি সহজে আমাদের নজরে আসে না।
১. পেটের অসুখের কুয়াশা পৌঁছতে পারে মস্তিষ্কে
অন্ত্র আর মস্তিষ্ক যে পরস্পরের সঙ্গে নিবিড় ভাবে যুক্ত, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে তার প্রমাণ ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। সাধারণ পরিপাকতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের বড় অংশই ব্রেন ফগের কথা জানান।
সবচেয়ে চমকপ্রদ উদাহরণ সিলিয়াক ডিজ়িজ়। এই রোগে গ্লুটেনের কারণে ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রদাহ তৈরি হয়। পেট ফাঁপা বা ডায়েরিয়ার মতো পরিচিত উপসর্গের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক রোগীর মানসিক কুয়াশাও হয়। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, প্রায় এক-চতুর্থাংশ রোগীর ক্ষেত্রে ব্রেন ফগই প্রধান বা একমাত্র লক্ষণ হতে পারে।
ধারণা করা হয়, অন্ত্রের প্রদাহের প্রভাব শরীরের অন্য অংশ হয়ে মস্তিষ্কেও পৌঁছতে পারে। ছোট একটি গবেষণায় সদ্য সিলিয়াক রোগ ধরা পড়া রোগীদের গ্লুটেনমুক্ত খাবারে রাখার পরে এক বছরের মধ্যে তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষার ফল উন্নত হয়েছিল। একই সঙ্গে ক্ষুদ্রান্ত্রের ক্ষতও সেরে উঠেছিল।
এখানেই খাদ্যের গুরুত্ব। অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবারের সঙ্গে মনঃসংযোগ কমে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা হচ্ছে। তাই গোটা শস্য, শাকসবজি, ফল, বাদাম, মাছ এবং আঁশসমৃদ্ধ খাবারের উপর নির্ভরশীল ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাসকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা।
২. লং কোভিড: মস্তিষ্কের সুরক্ষা-প্রাচীরেই কি ফাটল?
কোভিড সেরে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ বা মাস পরেও বহু মানুষ অভিযোগ করেছেন—মাথা কাজ করছে না, মন বসছে না, স্মৃতি আগের মতো নেই। ‘লং কোভিড’-এর অন্যতম আলোচিত উপসর্গ হয়ে ওঠে ব্রেন ফগ।
২০২৪ সালে আয়ারল্যান্ডের গবেষকদের একটি গবেষণা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়। মস্তিষ্ককে রক্তের মধ্যে থাকা নানা পদার্থ থেকে রক্ষা করে একটি বিশেষ বাধা—‘ব্লাড-ব্রেন ব্যারিয়ার’। গবেষকেরা বিশেষ কনট্রাস্ট ব্যবহার করে দেখেন, লং কোভিড থাকলেও যাঁদের ব্রেন ফগ নেই তাঁদের ক্ষেত্রে এই বাধা স্বাভাবিক। কিন্তু ব্রেন ফগে আক্রান্ত কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কনট্রাস্ট মস্তিষ্কের দিকে চলে যাচ্ছে—অর্থাৎ সুরক্ষা-ব্যবস্থার স্বাভাবিক অখণ্ডতা বিঘ্নিত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
অন্য গবেষণায় মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গের পরিবর্তন এবং কিছু অঞ্চলে রক্তপ্রবাহের সমস্যারও ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।
এর কোনও একটি নিশ্চিত ‘ম্যাজিক পিল’ এখনও নেই। তবে ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি র্যান্ডমাইজ়ড গবেষণায় দশ সপ্তাহের ব্যক্তিনির্ভর কগনিটিভ রিহ্যাবিলিটেশনে উপকারের ইঙ্গিত মিলেছে। রোগীকে দৈনন্দিন লক্ষ্য পূরণের কৌশল শেখানো হয়েছিল ভিডিয়ো সেশনের মাধ্যমে। উন্নতি অন্তত ছ’মাস স্থায়ী হয়েছিল।
৩. পেরিমেনোপজ: নাম-শব্দ-সংখ্যা হঠাৎ কেন হারিয়ে যায়
মেনোপজের আগের পর্যায় বা পেরিমেনোপজে বহু মহিলার অভিযোগ—পরিচিত নাম মনে পড়ছে না, ঠিক শব্দটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, সংখ্যা ভুলে যাচ্ছেন। গবেষণা অনুযায়ী, মেনোপজে উত্তরণের সময়ে প্রায় ৬০ শতাংশ মহিলার কোনও না কোনও ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অসুবিধা হতে পারে।
সম্ভাব্য যোগসূত্রটি ইস্ট্রোজেন। স্মৃতি ও পরিকল্পনা-সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অঞ্চলগুলির কাজে এই হরমোনের ভূমিকা রয়েছে। যাঁদের ‘হট ফ্ল্যাশ’ বেশি হয়, তাঁদের স্মৃতি পরীক্ষায় তুলনামূলক খারাপ ফলের নজিরও রয়েছে।
আশার কথা, অধিকাংশের ক্ষেত্রেই পরিবর্তন সামান্য এবং পেরিমেনোপজ পেরিয়ে যাওয়ার পরে স্থায়ী হয় না। শুধু স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি কার্যকর—এমন শক্তিশালী প্রমাণও নেই। বরং নিয়মিত শরীরচর্চা, বিশেষত রেজ়িস্ট্যান্স ট্রেনিং, স্বাস্থ্যকর খাদ্য, সামাজিক যোগাযোগ এবং অ্যালকোহল কমানোর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
৪. নাক ডাকেন না? তবুও স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকতে পারে
স্লিপ অ্যাপনিয়া বললেই আমরা ভাবি প্রচণ্ড নাক ডাকা এবং ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসা। কিন্তু মহিলাদের ক্ষেত্রে ছবিটি অনেক সময় আলাদা। স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত বহু মহিলা নাক ডাকেন না, ঘুমের মধ্যে শ্বাসরোধের ঘটনাও পরিবারের চোখে পড়ে না।
অথচ দিনের বেলা ক্লান্তি এবং ব্রেন ফগ থাকতে পারে।
চার বছর ধরে ১,১০০-র বেশি প্রাপ্তবয়স্ককে পর্যবেক্ষণ করে একটি গবেষণায় দেখা যায়, স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকা ব্যক্তিদের মনঃসংযোগ, দৃশ্যগত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং স্মৃতিশক্তির অবনতি তুলনামূলক দ্রুত হতে পারে। মস্তিষ্কের ‘হোয়াইট ম্যাটার’-এ পরিবর্তনেরও প্রমাণ পাওয়া যায়।
বিশেষত মহিলাদের স্লিপ অ্যাপনিয়ার বড় অংশই ধরা পড়ে না বলে অনুমান। অথচ রোগ নির্ণয় হলে সিপ্যাপ বা CPAP চিকিৎসা উল্লেখযোগ্য উপকার করতে পারে।
৫. ভিটামিন বি১২: শুধু একটি ‘স্বাভাবিক’ রিপোর্টই শেষ কথা নয়
৬৫ বছরের বেশি বয়স, সম্পূর্ণ নিরামিষ বা ভেগান খাদ্যাভ্যাস এবং নির্দিষ্ট ধরনের পাকস্থলী বা অন্ত্রের অস্ত্রোপচারের ইতিহাস থাকলে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। সঙ্গে ব্রেন ফগ থাকলে বিষয়টি চিকিৎসকের নজরে আনা প্রয়োজন।
পুরনো হলেও গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, বি১২ ঘাটতিজনিত স্নায়ু বা মানসিক উপসর্গ থাকা কিছু রোগীর প্রচলিত রক্তপরীক্ষার মান আপাত ভাবে স্বাভাবিক ছিল। তাই নির্দিষ্ট ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকেরা প্রয়োজনে অন্য পরীক্ষাও বিবেচনা করতে পারেন।
তবে এখান থেকে ‘ব্রেন ফগ মানেই বি১২ খেতে হবে’—এমন সিদ্ধান্ত বিপজ্জনক। ঘাটতি বা ঝুঁকির কারণ না থাকলে নির্বিচারে সাপ্লিমেন্ট খেয়ে লাভ নাও হতে পারে।
৬. দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা মস্তিষ্কের ‘ব্যান্ডউইডথ’ খেয়ে নেয়
ফাইব্রোমায়ালজিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে সমস্যাটি এত পরিচিত যে তার আলাদা নামই হয়ে গিয়েছে—‘ফাইব্রো ফগ’।
ব্যাখ্যাটি আকর্ষণীয়। দীর্ঘক্ষণ ব্যথা সামলাতে মস্তিষ্ককে অবিরাম কাজ করতে হয়। ফলে মনঃসংযোগ ও স্মৃতির জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক সম্পদের একাংশ যেন ব্যথা সামলাতেই ব্যয় হয়ে যায়। তার সঙ্গে যোগ হয় ঘুমের সমস্যা। দুইয়ে মিলে স্মৃতি ও মনঃসংযোগ আরও খারাপ হতে পারে।
ব্যথার যথাযথ চিকিৎসা ও ঘুমের সমস্যা সামলানোর পাশাপাশি মাঝারি মাত্রার অ্যারোবিক ব্যায়াম ফাইব্রোমায়ালজিয়ার উপসর্গ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মক্ষমতা—দু’টির ক্ষেত্রেই সহায়ক হতে পারে।
কুয়াশার চিকিৎসা নয়, খুঁজতে হবে কুয়াশার উৎস
‘ব্রেন ফগ’-এর সবচেয়ে বড় বিপদ সম্ভবত দুটি বিপরীত প্রতিক্রিয়ায়। এক দিকে একে নিছক বয়স, আলস্য বা ‘মনের ভুল’ বলে উড়িয়ে দেওয়া। অন্য দিকে সামান্য ভুলে যাওয়াকেই ভয়াবহ স্নায়ুরোগের লক্ষণ ভেবে আতঙ্কিত হওয়া।
দুটিই ভুল।
মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, থাইরয়েডের সমস্যা থেকে শুরু করে আরও নানা অবস্থায় ব্রেন ফগ দেখা দিতে পারে। তাই উপসর্গটি যদি ক্রমাগত থাকে, বাড়তে থাকে অথবা কাজ, পড়াশোনা, সংসার কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা দেয়, চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করাই যুক্তিযুক্ত।
কারণ ‘ব্রেন ফগ’-এর জন্য একটিমাত্র পরীক্ষা নেই, একটিমাত্র কারণও নেই, তাই একটিমাত্র চিকিৎসাও নেই। কারও ক্ষেত্রে সমস্যার মূলে থাকতে পারে ঘুম, কারও অন্ত্রের প্রদাহ, কারও হরমোনের পরিবর্তন, কারও ভিটামিনের ঘাটতি, আবার কারও দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা কোভিড-পরবর্তী শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন।
অর্থাৎ মাথার ভিতরের সেই কুয়াশাটিই শেষ কথা নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে সেটি বরং একটি সংকেত—শরীরের কোথাও কিছু ঘটছে, যার কারণটি খুঁজে পাওয়া দরকার। আর কারণটি যদি চিকিৎসাযোগ্য হয়, তবে সেই অনুসন্ধানই হয়তো কুয়াশা কাটিয়ে আবার চিন্তাকে স্বচ্ছ করে তোলার প্রথম ধাপ।