বাংলাস্ফিয়ার: ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানির বিরুদ্ধে ঘুষ ও প্রতারণার অভিযোগে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলা খারিজ করে দিল আমেরিকার একটি আদালত। সোমবার ব্রুকলিনের ডিস্ট্রিক্ট জজ নিকোলাস গারাউফিস মামলাটি খারিজের আবেদন মঞ্জুর করেন। এর আগে মার্কিন বিচার দফতর জানিয়েছিল, তারা আর এই মামলা চালিয়ে যেতে চায় না।
২০২৪ সালে আদানির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল যে, তাঁর সংস্থা আদানি গোষ্ঠীর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান যাতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন পেতে পারে, তার জন্য ভারতীয় সরকারি আধিকারিকদের ঘুষ দেওয়ার পরিকল্পনায় তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে অভিযোগ ছিল, সংস্থার দুর্নীতিবিরোধী নীতি সম্পর্কে আশ্বাসজনক তথ্য দিয়ে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করা হয়েছিল।
আদানি গোষ্ঠী প্রথম থেকেই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। গৌতম আদানি নিজেও এই মামলায় অভিযোগের জবাব দিতে কখনও মার্কিন আদালতে হাজির হননি।
গত ১৮ মে মার্কিন বিচার দফতর জানিয়ে দেয়, তারা আর আদানির বিরুদ্ধে মামলাটি এগিয়ে নিয়ে যাবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্ট পদে থাকার সময় একাধিক আলোচিত আর্থিক অপরাধের মামলা থেকে ফেডারেল কৌঁসুলিদের সরে আসার যে নজির তৈরি হয়েছে, আদানি মামলাও তার অন্যতম।
তবে বিচার দফতর মামলা প্রত্যাহার করতে চাইলেও আদালতের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন ছিল। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কৌঁসুলিরা কোনও ফৌজদারি মামলা আর চালাতে না চাইলে তাঁদের বাধ্য করার ক্ষমতা বিচারকদের অত্যন্ত সীমিত। তা সত্ত্বেও বিচারপতি গারাউফিস বিচার দফতরের সিদ্ধান্তের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন।
বিচার দফতরের প্রথম ব্যাখ্যাকে তিনি যথেষ্ট মনে করেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল, মামলাটি প্রত্যাহারের পক্ষে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত সাধারণ এবং সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ বোঝার পক্ষে যথেষ্ট নয়।
এর পর ৪ জুলাই আদালতে জমা দেওয়া নথিতে বিচার দফতরের পদস্থ আধিকারিক ট্রেন্ট ম্যাককটার জানান, মামলাটির মূল ঘটনাপ্রবাহ আমেরিকার বাইরে ঘটেছে, অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন এবং মামলাটি বিচার দফতরের বর্তমান অগ্রাধিকারের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সেই কারণেই মামলা আর না চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ম্যাককটার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সেই সব প্রতিবেদনও ‘মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন, যেখানে দাবি করা হয়েছিল, আমেরিকায় আদানির ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের কোনও যোগসূত্র থাকতে পারে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের নভেম্বরে অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার আগেই গৌতম আদানি আমেরিকায় ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
এই বিষয়টি নিয়েই সরাসরি আদানির কাছে ব্যাখ্যা চান বিচারপতি গারাউফিস। তিনি জানতে চান, অভিযোগপত্র খারিজ করার বিনিময়ে কোনও কিছু দেওয়ার বিষয়ে কোনও চুক্তির কথা আদানির জানা আছে কি না।
১৫ জুলাই আদালতে জমা দেওয়া শপথপত্রে আদানি জানান, এমন কোনও চুক্তির কথা তাঁর জানা নেই। তবে তিনি স্বীকার করেন, আমেরিকায় ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি তিনি আগেই দিয়েছিলেন। আদানি আরও জানান, তাঁর আইনজীবীরা বিচার দফতরের সঙ্গে বৈঠকের সময় বলেছিলেন, ওই বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি মামলার সম্ভাব্য নিষ্পত্তির আলোচনার একটি অংশ হতে পারে।
আদানির আইনজীবী রবার্ট গিউফ্রা অবশ্য একই দিনে আদালতে জমা দেওয়া নথিতে জানান, বিচার দফতর তাঁদের স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, মামলা নিষ্পত্তির কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকায় বিনিয়োগে আদানি গোষ্ঠীর আগ্রহ বা প্রতিশ্রুতিকে বিবেচনায় নেওয়া হবে না।
শেষ পর্যন্ত বিচার দফতরের ব্যাখ্যা এবং আদানির শপথপত্র বিবেচনা করে বিচারপতি গারাউফিস মামলা খারিজের আবেদন মঞ্জুর করেছেন। ফলে ২০২৪ সালে শুরু হওয়া বহুল আলোচিত ঘুষ ও বিনিয়োগকারী প্রতারণার ফৌজদারি মামলায় গৌতম আদানির বিরুদ্ধে মার্কিন বিচার দফতরের আইনি পদক্ষেপের আপাতত অবসান ঘটল।