Home খবর সেমেস্টার গেল এআইয়ের ঘাড়ে!

এ বার শুধু প্রবন্ধ লিখে দেওয়া নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন প্রজন্মের ‘এআই এজেন্ট’ চাইলে একজন ছাত্রের হয়ে প্রায় গোটা সেমেস্টারই চালিয়ে দিতে পারে। অনলাইন ক্লাসে ঢুকে বক্তৃতা দেখা, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, পরীক্ষা দেওয়া, প্রবন্ধ লেখা, আলোচনায় মন্তব্য করা, সহপাঠীদের সঙ্গে কথোপকথন—এমনকি নির্দিষ্ট সময়ে অ্যাসাইনমেন্ট জমাও দিতে পারে তারা।

অর্থাৎ, ছাত্রকে শুধু লক্ষ্যটা বলে দিলেই হল। বাকিটা যন্ত্রের দায়িত্ব।

শিক্ষাজগতে তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলে কে পড়াশোনা করছে? ছাত্র, নাকি তার হয়ে কাজ করা কোনও এআই?

এত দিন চ্যাটজিপিটির মতো জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করলেও ছাত্রকে অন্তত কিছুটা সক্রিয় থাকতে হত। প্রশ্ন লিখতে হত, উত্তর চাইতে হত, সেটি কপি করে জমা দিতে হত। ‘এজেন্টিক এআই’ সেই মানবিক ধাপগুলিও অনেকটাই সরিয়ে দিতে পারে।

একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিলে এ ধরনের এআই নিজেই একের পর এক কাজ সম্পন্ন করতে পারে। অনলাইন লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে ঢোকা থেকে শুরু করে কাজ শেষ করে জমা দেওয়া—পুরো প্রক্রিয়াটিই হয়ে উঠতে পারে স্বয়ংক্রিয়।

‘আইনস্টাইন’-এর কাণ্ড

এই সম্ভাব্য বিপদের একটি আলোচিত উদাহরণ ‘আইনস্টাইন’ নামে একটি এআই পরিষেবা।

চলতি বছরের গোড়ায় সামনে আসা এই ব্যবস্থাটি দাবি করেছিল, মাসে ৪০ ডলারের বিনিময়ে ক্যানভাসের মতো অনলাইন শিক্ষামঞ্চে এটি ছাত্রের ‘ডিজিটাল প্রতিনিধি’ হয়ে কাজ করতে পারে।

বক্তৃতা দেখা, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, প্রবন্ধ লেখা, অনলাইন আলোচনায় মন্তব্য করা—এমনকি অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার কাজও করতে পারত সেটি।

ক্যানভাসের মালিক ইনস্ট্রাকচারের তরফে আইনি নোটিস পাওয়ার পর আইনস্টাইনের ওয়েবসাইট বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, একটি পরিষেবা বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ একই ধরনের কাজ করার প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই নানা উপায়ে সহজলভ্য।

আর এখানেই আসল বিপদ।

নকলও যখন ‘মানুষের মতো’

একজন ছাত্র যদি এআইকে একটি প্রবন্ধ লিখতে বলে, শিক্ষক সেই লেখার ভাষা বা ধরন দেখে সন্দেহ করতে পারেন। কিন্তু কোনও এআই এজেন্ট যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত ‘ছাত্র’ সেজে অনলাইন ক্লাসে ঢোকে, পাঠ্যবস্তু পড়ে, পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং সহপাঠীদের মন্তব্যের জবাব দেয়, তা হলে তাকে শনাক্ত করা অনেক কঠিন।

কারণ অনলাইন শিক্ষার বড় অংশেই ছাত্রের ডিজিটাল কর্মকাণ্ডকেই উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়।

সেই দুর্বল জায়গাটিই কাজে লাগাতে পারে এআই এজেন্ট।

সমস্যার ব্যাপ্তি বোঝাচ্ছে সাম্প্রতিক গবেষণাও। আমেরিকার ২০টি সরকারি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৫ হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রীর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, বিপুল সংখ্যক পড়ুয়া পড়াশোনার কাজে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করছে। তাঁদের একটি অংশ সরাসরি অসদুপায়েও তা ব্যবহার করছে।

গবেষকদের মতে, শুধু এআই শনাক্তকারী সফ্‌টওয়্যারের উপর নির্ভর করে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। মূল্যায়নের পদ্ধতিই বদলাতে হবে।

স্কুলেও একই ছবি

বিশ্ববিদ্যালয়েই যে সমস্যা সীমাবদ্ধ, তা নয়।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের সমীক্ষায় প্রতি ১০ জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে একজন জানিয়েছে, পড়াশোনার সবটা বা অধিকাংশই এখন চ্যাটবটের সাহায্যে করে। ৫৯ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর ধারণা, তাদের স্কুলে এআই ব্যবহার করে নকল করা অন্তত মাঝেমধ্যে ঘটে।

অর্থাৎ সমস্যা শুধু ‘কে এআই ব্যবহার করছে’ তা নয়। বরং প্রশ্নটা এখন—এআই কোথায় ছাত্রকে সাহায্য করছে, আর কোথায় ছাত্রের জায়গাটাই দখল করছে?

সমাধান নিষেধাজ্ঞায় নয়?

শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করছেন, এআই নিষিদ্ধ করাই সমস্যার শেষ উত্তর নয়। প্রযুক্তি যত দ্রুত বদলাচ্ছে, তাকে শনাক্ত করার সফ্‌টওয়্যারও তত দ্রুত পুরনো হয়ে যেতে পারে।

বরং মূল্যায়নের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।

যেমন—ছাত্রকে নিজের যুক্তি মৌখিক ভাবে ব্যাখ্যা করতে বলা, কাজের বিভিন্ন ধাপ দেখানো, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা শ্রেণিকক্ষের আলোচনার সঙ্গে উত্তরের যোগ তৈরি করা। অর্থাৎ শুধু ‘কী লিখেছে’ নয়, কী ভাবে ভাবল—সেটাকেও মূল্যায়নের অংশ করা।

অনলাইন পরীক্ষায় নজরদারি বাড়ানোর কথাও উঠছে। কিন্তু তাতে আবার ছাত্রের গোপনীয়তা এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার প্রশ্ন সামনে আসছে।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদদের আলোচনাতেও তাই মূল প্রশ্নটি ঘুরে ফিরে এসেছে—অনলাইনে জমা পড়া কাজটির পিছনে চিন্তাভাবনাটি আসলে কার?

ডিগ্রি মানুষের, নাকি মেশিনের?

এআই এজেন্টের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত প্রযুক্তিগত নয়, শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়েই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য যদি শুধু নম্বর, ক্রেডিট এবং শেষে একটি শংসাপত্র দেওয়া হয়, তা হলে এআই এজেন্ট সেই প্রক্রিয়াটি অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ‘শেষ’ করে দিতে পারে।

কিন্তু শিক্ষা যদি হয় চিন্তা করতে শেখা, ভুল করা, ভুল থেকে সংশোধন করা, যুক্তি তৈরি করা এবং অন্য মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন—তবে ছাত্রের হয়ে একটি যন্ত্র গোটা সেমেস্টার শেষ করে দেওয়া আসলে পড়াশোনা নয়।

সেটা পড়াশোনার অভিনয়

আর এখানেই এআই এজেন্ট নকলের পুরনো সমস্যাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। অনলাইনে যদি ছাত্রের পরিচয়, উপস্থিতি, লেখা, পরীক্ষা এবং এমনকি সহপাঠীদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগও যন্ত্র নিখুঁত ভাবে নকল করতে পারে, তা হলে বিশ্ববিদ্যালয় নিশ্চিত হবে কী ভাবে—ডিগ্রিটা শেষ পর্যন্ত সত্যিই কোনও মানুষ অর্জন করেছেন?

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles