ইরানের যুদ্ধ-ক্ষতিপূরণের দাবি সরাসরি খারিজ করে উল্টে তেহরানের কাছেই ক্ষতিপূরণ চাইলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, আমেরিকার কাছ থেকে অর্থ দাবি করার আগে গত কয়েক দশকে ইরান এবং ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর হাতে নিহত ও আহতদের জন্য তেহরানকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
ট্রাম্পের এই পাল্টা দাবি হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতাকেও আরও কঠিন করে তুলেছে।
ইরানের তরফে শর্ত ছিল স্পষ্ট—হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফেরাতে হলে আমেরিকাকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে, অবরোধ বন্ধ করতে হবে এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানের প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণের বিষয়েও এগোতে হবে।
জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যে প্রাথমিক শান্তি-সমঝোতার চেষ্টা হয়েছিল, সেখানেও ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন আলোচনায় এসেছিল। কিন্তু সেই সমঝোতা দ্রুত ভেঙে পড়ে। দু’দেশ ফের সংঘাতের পথে ফেরার পর এখন ক্ষতিপূরণই হয়ে উঠেছে নতুন কূটনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্র।
‘আগে হিসাব মেটাক ইরান’
ইরানের দাবির জবাবে কার্যত পাল্টা হিসাব খুলেছেন ট্রাম্প। তাঁর যুক্তি, ক্ষতিপূরণের আলোচনা যদি হয়, তা হলে শুধু সাম্প্রতিক যুদ্ধের ক্ষতি দিয়ে হিসাব শুরু করা যাবে না।
গত প্রায় ৫০ বছরে ইরান অথবা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলির কর্মকাণ্ডে নিহত ও আহত মার্কিন সেনা এবং সাধারণ নাগরিকদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ও বিবেচনায় আনতে হবে বলে দাবি করেছেন তিনি।
শুধু আমেরিকানদের নয়, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং গাজার মতো বিভিন্ন সংঘাতক্ষেত্রে ইরানের ভূমিকার কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের কথাও সামনে এনেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের বক্তব্যের সারকথা—ইরান যদি যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ চায়, তা হলে তাকেও অতীতের হত্যাকাণ্ড, আহত এবং সম্পত্তির ক্ষতির হিসাব মেটাতে হবে।
অর্থাৎ, তেহরান যে যুক্তিতে ওয়াশিংটনের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইছে, একই যুক্তি ঘুরিয়ে ইরানের বিরুদ্ধেই প্রয়োগ করতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন।
দাবির আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন
তবে ট্রাম্পের উত্থাপিত অতীতের সব ঘটনার সঙ্গে ইরানের প্রত্যক্ষ যোগ কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর দাবির মধ্যে এমন একটি হামলার প্রসঙ্গও এসেছে, যার জন্য আল-কায়দাকে দায়ী করা হয়েছিল, ইরানকে নয়।
ফলে ট্রাম্পের দাবি কতটা আইনি বা কূটনৈতিক ভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, তা স্পষ্ট নয়। আপাতত কোনও নির্দিষ্ট অঙ্কের আনুষ্ঠানিক ক্ষতিপূরণ প্রস্তাবের চেয়ে এটিকে তেহরানের দাবির বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের পাল্টা রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
আসল লড়াই হরমুজ ঘিরে
ক্ষতিপূরণের এই চাপানউতোরের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণের জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইতিমধ্যেই চাপ তৈরি হয়েছে। বেড়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। তার প্রভাব পড়ছে ভারত-সহ বিশ্বের বহু দেশের বাজারে।
ভারতীয় শেয়ার বাজারেও তেলের বাড়তি দামের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যেই ইরান ওমানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ভাবে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট পথ তৈরির বিষয়ে এগোচ্ছে। ব্যবস্থা কার্যকর হলে হরমুজ দিয়ে কোন জাহাজ কী ভাবে চলবে, তার উপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়তে পারে।
ওয়াশিংটনের কাছে সেটাই বড় উদ্বেগ। সামরিক চাপ দিয়েও আমেরিকা এখনও পর্যন্ত প্রণালীতে আগের মতো অবাধ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে পারেনি।
চাপে ট্রাম্পও
দীর্ঘায়িত সংঘাত, জ্বালানির দাম এবং তার জেরে মূল্যবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে দেশের ভিতরেও চাপ বাড়ছে ট্রাম্পের উপর।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বিশেষ করে গ্রামীণ এবং গাড়িনির্ভর আমেরিকার ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। ফলে দ্রুত হরমুজ খুলে দেওয়াকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার রাজনৈতিক প্রয়োজনও রয়েছে হোয়াইট হাউসের।
কিন্তু সেই পথেই এখন বড় বাধা ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন।
ইরান চাইছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত করা এবং যুদ্ধের ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ। ট্রাম্প সেই দাবি মেনে নেওয়ার বদলে উল্টে তেহরানের কাছেই বহু দশকের হিসাব চাইছেন।
ফলে ক্ষতিপূরণের বিতর্ক এখন আর শুধু অর্থের অঙ্ক নিয়ে নয়। এটি হয়ে উঠেছে যুদ্ধের দায় কার—সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াই।
তেহরানের দাবি, সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের প্রাণ ও সম্পত্তির ক্ষতির দায় আমেরিকার। ওয়াশিংটনের পাল্টা বক্তব্য, ইতিহাসের হিসাব খুললে ইরানের দায়ই কম নয়।
দু’পক্ষ যখন পরস্পরের দিকে ক্ষতিপূরণের বিল ঠেলে দিচ্ছে, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—হরমুজ খুলতে যে সমঝোতা দরকার, তার জায়গাটা কি আদৌ আর বাকি আছে?