হাইলাইটস
- ১০ দিনের মধ্যে তৃতীয়বার ভেঙে পড়ল কিউবার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড।
- জ্বালানি সংকট, জীর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পরিস্থিতি আরও জটিল।
- দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ, বাড়ছে জনঅসন্তোষ।
- অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা।
- বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, দ্রুত সংস্কার না হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
মাত্র ১০ দিনের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো ভেঙে পড়েছে কিউবার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড। প্রতিবারই গোটা দেশ কার্যত অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষের মনে বাড়ছে একটাই প্রশ্ন—এই বিদ্যুৎব্যবস্থা কি আদৌ আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব?
ক্যারিবীয় দ্বীপদেশটির ৯৫ লক্ষের বেশি মানুষ গত কয়েক মাস ধরে তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সরকার এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও তেল সরবরাহে বাধার কথা বললেও, জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে সংকটের মূল কারণ বহু দশক ধরে অবহেলিত বিদ্যুৎ অবকাঠামো। পুরোনো তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি গবেষক হোর্হে পিনিয়নের ভাষায়, কিউবার বিদ্যুৎব্যবস্থার ভরসা হয়ে থাকা কেন্দ্রগুলো এখন “জীর্ণ, বিকল এবং কার্যত শেষ পর্যায়ে”।
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে পরিস্থিতি আরও অসহনীয়। ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও প্রায় ৮০ শতাংশ আর্দ্রতার মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। খাবার নষ্ট হচ্ছে, পানীয় জলের সংকট দেখা দিচ্ছে, মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে।
একসময় সালসার সুরে মুখর থাকা কিউবার রাস্তায় এখন শোনা যাচ্ছে হাঁড়ি-পাতিল বাজিয়ে প্রতিবাদের আওয়াজ। দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শহরে ক্ষোভ বাড়ছে।
হাভানার বাসিন্দা আলবের্তো বলেন, “এক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ এলেও জল তোলা, ফোন চার্জ দেওয়া আর জরুরি কাজ শেষ করার সময় পাওয়া যায় না। মানুষ এখন শুধু দ্রুত সমাধান চায়।”
সরকার অবশ্য বলছে, তাদের হাত কার্যত বাঁধা। জ্বালানিমন্ত্রী ভিসেন্তে দে লা ও লেভির দাবি, জ্বালানির তীব্র ঘাটতির পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশও পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে ওয়াশিংটন-হাভানা সম্পর্কের অবনতিও সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার পর বহু বিদেশি হোটেল, শিপিং ও বিমান সংস্থা কিউবায় কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে বা নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ ও সরবরাহ ব্যবস্থাও বড় ধাক্কা খেয়েছে।
একজন বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিকারক জানান, তাঁর কয়েক ডজন কনটেনার এখনও বিদেশি বন্দরে আটকে রয়েছে। কবে সেগুলো কিউবায় পৌঁছবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অভাব ও সরকারি পরিষেবার অবনতিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। একসময়ের তুলনামূলক নিরাপদ দেশ কিউবায় এখন চুরি, ছিনতাই ও সহিংস অপরাধের ঘটনাও বাড়ছে বলে অভিযোগ।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, বিদ্যুৎ ও জলসংকটের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে নতুন করে বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক বন্দির সংখ্যাও বেড়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও অস্বস্তি বাড়ছে। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংস্কার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন আলোচনার খবর ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীন কাস্ত্রো পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বেসরকারি খাত সম্প্রসারণ ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ১৭৬টি সংস্কারমূলক পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও জ্বালানি সরবরাহে মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া এসব উদ্যোগে সংকট কাটবে না।
বুধবার কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ ফিরলেও বেশিরভাগ জায়গায় আবারও দীর্ঘ লোডশেডিং শুরু হয়েছে।
হাভানার শিল্পী ও একক মা লরা গার্সিয়ার কথায়, “মানুষ এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে পারে না। আমরা শুধু আজকের কষ্টটা সামলানোর চেষ্টা করছি।”
টানা ৭২ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত শুধু একটি কথাই বলেন, “যেটা ভেঙে পড়ার কথা, সেটাই যেন কিছুতেই পুরোপুরি ভেঙে পড়ছে না।”