‘মুসলিমদের ভারতছাড়া করতে চাইলে আর হিন্দু থাকা যায় না’: আমেরিকায় ভাগবত

যা জানা জরুরি
- বৈচিত্র্য কোনও সমাজের দুর্বলতা নয়, মানুষের অন্তর্নিহিত ঐক্যের অলংকার—আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে এই বার্তাই দিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত।
- সেই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে ভারত থেকে বাদ দেওয়ার ভাবনাকেও সরাসরি নাকচ করেছেন তিনি।
- তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, কোনও হিন্দু যদি মনে করেন ভারতে মুসলমানদের স্থান নেই, তা হলে তিনি আর হিন্দু থাকবেন না।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বৈচিত্র্য কোনও সমাজের দুর্বলতা নয়, মানুষের অন্তর্নিহিত ঐক্যের অলংকার—আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে এই বার্তাই দিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত। সেই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে ভারত থেকে বাদ দেওয়ার ভাবনাকেও সরাসরি নাকচ করেছেন তিনি। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, কোনও হিন্দু যদি মনে করেন ভারতে মুসলমানদের স্থান নেই, তা হলে তিনি আর হিন্দু থাকবেন না।
সঙ্ঘের শতবর্ষ উপলক্ষে আন্তর্জাতিক জনসংযোগ অভিযানের অংশ হিসেবে আমেরিকা সফরে গিয়েছেন ভাগবত। শনিবার নিউ ইয়র্কে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের এক সমাবেশে হিন্দুত্ব, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং ভারতের জাতীয় পরিচয় নিয়ে কথা বলেন তিনি। পরে ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে ‘ইউনিভার্সাল ওয়াননেস সেলিব্রেশন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তাঁর মূল বক্তৃতার বিষয়ও ছিল বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল ‘আমেরিকান হিন্দুস ফর এনগেজমেন্ট অ্যান্ড ডায়ালগ’ বা ‘অ্যাহেড’। প্রথম সারিতে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
একদল মুসলমানের সঙ্গে তাঁর পূর্ববর্তী কথোপকথনের প্রসঙ্গ টেনে ভাগবত বলেন, হিন্দুত্বের মৌলিক শিক্ষা হল—উপাসনার পথ আলাদা হতে পারে, কিন্তু সব পথের লক্ষ্য একই। প্রত্যেক মানুষের সমান মর্যাদা রয়েছে। তাঁর কথায়, “কোনও হিন্দু যদি মনে করেন ভারতে কোনও মুসলমান থাকা উচিত নয়, তবে তিনি হিন্দু থাকবেন না। নিজেকে হিন্দু বলতে চাইলে বিশ্বাস করতে হবে, সব পথ একই লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যায় এবং প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা সমান।”
সঙ্ঘপ্রধানের ব্যাখ্যা, বাহ্যিক পরিচয়, ভাষা, ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস কিংবা উপাসনাপদ্ধতির দিক থেকে মানুষ আলাদা হলেও অন্তরে তাদের মধ্যে মৌলিক ঐক্য রয়েছে। সেই ঐক্যকে মুছে দিয়ে একরূপতা চাপিয়ে দেওয়া হিন্দু দর্শনের লক্ষ্য নয়। বরং বিভিন্ন পরিচয়কে স্বীকৃতি দেওয়া, সম্মান করা এবং রক্ষা করাই কর্তব্য। তাঁর ভাষায়, “বৈচিত্র্য আমাদের সহজাত ঐক্যের অলংকার। তাকে গ্রহণ করতে হবে, সম্মান করতে হবে এবং রক্ষা করতে হবে।”
ভারত ও আমেরিকার মধ্যে তুলনাও টানেন ভাগবত। তিনি বলেন, আমেরিকার ক্ষেত্রে যেমন বহুত্বের কথা বলা হয়, ভারতের ক্ষেত্রে বলা হয় বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের কথা। ঐক্য এবং বৈচিত্র্য—দুই দেশেরই স্বভাবের গভীরে রয়েছে। তাঁর মতে, একটি রাষ্ট্র কেবল ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ কোনও ভূখণ্ড নয়; বিশ্বব্যবস্থায় প্রত্যেক রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকে। স্বামী বিবেকানন্দকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, প্রত্যেক জাতিরই একটি নিয়তি রয়েছে। ভারতের নিয়তি হল নিজে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য উপলব্ধি করা এবং সময়ে সময়ে বিশ্বকেও সেই উপলব্ধির পথ দেখানো।
মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য বোঝাতে গিয়েও চিন্তার ভূমিকার কথা বলেন ভাগবত। মানুষের চিন্তা করার স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু সেই চিন্তা কোন দিকে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিই আসল প্রশ্ন। যথার্থ চিন্তা মানুষকে ঈশ্বরের কাছাকাছি নিয়ে যায়, আর স্বার্থপর ও সংকীর্ণ চিন্তা তাকে পশুপ্রবৃত্তির দিকে ঠেলে দেয়। শুধু নিজের জন্য সঞ্চয় নয়, অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই মানবিকতার পরিচয়—মত সঙ্ঘপ্রধানের।
মুসলমানদের প্রতি সঙ্ঘের মনোভাব বোঝাতে ১৯৯৬ সালের চরখি দাদরি বিমান দুর্ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। হরিয়ানার আকাশে সৌদি আরব ও কাজাখস্তানের দুটি যাত্রীবাহী বিমানের সংঘর্ষে ৩৪৯ জন নিহত হন। ভাগবতের দাবি, দুর্ঘটনার পরে সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকেরাই প্রথম ঘটনাস্থলে পৌঁছে মৃতদেহ উদ্ধার, শনাক্তকরণ এবং পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার কাজে সাহায্য করেছিলেন। তখন মৃতেরা মুসলমান কি না, তা নিয়ে কেউ ভাবেননি।
ভাগবতের এই বক্তব্য এমন সময় এল, যখন তাঁর সফর ঘিরে আমেরিকায় তীব্র বিতর্ক চলছে। নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনের অনুষ্ঠানটির বিরোধিতা করে বলেছিলেন, সঙ্ঘের রাজনৈতিক দর্শন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী আদর্শের পরিপন্থী। তবে অনুষ্ঠানটি বেসরকারি হওয়ায় তা বাতিল করার আইনি ক্ষমতা নগর প্রশাসনের রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
আমেরিকার আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনও ভাগবতের ভিসা প্রত্যাহার এবং সঙ্ঘের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করেছিল। কমিশনের সুপারিশ অবশ্য বাধ্যতামূলক নয় এবং মার্কিন সরকার তাতে কোনও পদক্ষেপও করেনি। ভারত এই কমিশনের মূল্যায়নকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
এই বিতর্কের আবহে ভাগবতের অন্তর্ভুক্তিমূলক বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সঙ্ঘ সম্পর্কে বিদেশে যে সংখ্যালঘুবিরোধী ধারণা রয়েছে, তার মোকাবিলায় তিনি হিন্দুত্বকে ধর্মীয় বহুত্ব, মানবমর্যাদা ও সামাজিক সহাবস্থানের দর্শন হিসেবেই তুলে ধরলেন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



