র জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার নেপথ্যে কোনও বৃহত্তর ষড়যন্ত্র ছিল কি না, সেই তদন্তে নতুন করে গুরুত্ব দিল কলকাতা হাই কোর্ট। ষড়যন্ত্রে কয়েক জনের সম্ভাব্য ভূমিকা কী ভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার গতিপথ ব্যাখ্যা করে সিবিআইকে একটি পৃথক রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। রিপোর্টটি মুখবন্ধ খামে পেশ করতে হবে।

শুক্রবার বিচারপতি শম্পা সরকার এবং বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটির রুদ্ধদ্বার শুনানি হয়। তদন্তের অগ্রগতি সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট এবং মামলার কেস ডায়েরির প্রতিলিপি আদালতে জমা দেয় সিবিআই। বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছে, ওই নথিগুলি রিপোর্টের সঙ্গে মুখবন্ধ খামেই সংরক্ষণ করতে হবে। মামলার পরবর্তী শুনানি হবে ২৪ সেপ্টেম্বর।

সিবিআইয়ের পক্ষে উপস্থিত অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেলকে বেঞ্চ বলেছে, তদন্তকারীরা কোন সূত্র ধরে ষড়যন্ত্রে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন, তা নতুন রিপোর্টে স্পষ্ট করতে হবে। আদালতের নির্দেশের ভাষায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা চিহ্নিত করতে তদন্তকারী সংস্থা যে পথে এগিয়েছে, সেই পথটির বিবরণ দিতে হবে। তবে তদন্তের গোপনীয়তার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় কিংবা আদালতে পেশ করা রিপোর্টের বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। গোটা শুনানিই হয়েছে রুদ্ধদ্বার কক্ষে।

২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আর জি কর হাসপাতালের একটি সেমিনার কক্ষে কর্তব্যরত স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার হয়। পরের দিন কলকাতা পুলিশের সঙ্গে যুক্ত তৎকালীন নাগরিক স্বেচ্ছাসেবক সঞ্জয় রায়কে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তে পুলিশের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ১৩ আগস্ট মামলাটি সিবিআইয়ের হাতে তুলে দিয়েছিল কলকাতা হাই কোর্ট। পরবর্তী সময়ে শিয়ালদহ আদালত সঞ্জয়কে ধর্ষণ ও হত্যায় দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়।

কিন্তু সঞ্জয় একাই অপরাধটি করেছিল কি না, ঘটনার আগে বা পরে অন্য কারও ভূমিকা ছিল কি না এবং প্রমাণ নষ্ট করে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল কি না—এই প্রশ্নগুলি তখনও মেটেনি। নিহত চিকিৎসকের বাবা-মা প্রথম থেকেই তদন্তে একাধিক অসঙ্গতি এবং বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আচরণ, থানায় অভিযোগ নথিভুক্ত করতে দেরি, ঘটনাস্থলে বহু মানুষের উপস্থিতি এবং দ্রুত দেহ সৎকার—সব কিছুরই পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।

প্রথম পর্যায়ের তদন্তে সিবিআই আর জি করের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ এবং তৎকালীন টালা থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক অভিজিৎ মণ্ডলকে গ্রেফতার করেছিল। অভিযোগ ছিল, প্রমাণ নষ্ট এবং ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সে সময় তদন্তকারী সংস্থা আদালতে জানিয়েছিল, সন্দীপ ও অভিজিতের ফোনের তথ্য, কলের তালিকা, হাসপাতাল ও থানার নজরদারি ক্যামেরার ছবি এবং কয়েকটি সন্দেহজনক নম্বর পরীক্ষা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র বা যোগসাজশ অনুসন্ধানের কথাও সিবিআই জানিয়েছিল। তড়িঘড়ি দেহ সৎকার এবং দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের দাবি উপেক্ষার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হয়।

তদন্তের গতি এবং পদ্ধতি নিয়ে নিহত চিকিৎসকের বাবা-মা পরে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। ২০২৬ সালের ২১ মে আদালত সিবিআইয়ের পূর্বাঞ্চলীয় যুগ্ম অধিকর্তার নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি নতুন বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের নির্দেশ দেয়। ৯ আগস্ট রাতে চিকিৎসকের নৈশভোজের সময় থেকে তাঁর দেহ সৎকার পর্যন্ত গোটা ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে পরীক্ষা করতে বলা হয় দলটিকে।

২৫ জুন জমা পড়া রিপোর্ট দেখে তদন্তের অগ্রগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল বেঞ্চ। আদালত প্রশ্ন তুলেছিল, সিবিআইয়ের হাত কে বেঁধে রেখেছে এবং নতুন বিশেষ দলের তদন্ত আগের তদন্তের পুনরাবৃত্তিতে পরিণত হচ্ছে কি না। ৬ আগস্ট আর একটি অগ্রগতি-রিপোর্ট পেশ করে সিবিআই অতিরিক্ত সময় চায়। বেঞ্চ তখন তদন্ত যাতে লক্ষ্যচ্যুত না হয়, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়ে ২৮ আগস্টের মধ্যে নতুন রিপোর্ট চেয়েছিল।

শুক্রবারের নির্দেশে বোঝা যাচ্ছে, আদালত এখন সাধারণ অগ্রগতি-রিপোর্টে সন্তুষ্ট না থেকে সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা ও সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর প্রমাণগত পথ জানতে চাইছে। এটি এখনও কারও অপরাধ প্রমাণ নয়। তবে তদন্ত যে আর কেবল সঞ্জয় রায়ের অপরাধে সীমাবদ্ধ নেই এবং ঘটনার আগে-পরে সম্ভাব্য যোগসাজশ ও ধামাচাপার অভিযোগও বিচারাধীন অনুসন্ধানের কেন্দ্রে রয়েছে, হাই কোর্টের নির্দেশে তা আরও স্পষ্ট হল।