সংস্কৃতি ও বিনোদন

হোটেলের আয়নায় আফগানিস্তান

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • কাবুলের ইন্টার-কন্টিনেন্টাল হোটেলকে কেন্দ্র করে লিস ডুসে সেই অসম্ভব কাজটিই করেছেন তাঁর দ্য ফাইনেস্ট হোটেল ইন কাবুল: আ পিপল্‌স হিস্ট্রি অব আফগানিস্তান বইয়ে।
  • হোটেলটির জন্ম, জৌলুস, যুদ্ধ, রক্তপাত এবং অবিশ্বাস্য টিকে থাকার গল্পের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন গত প্রায় অর্ধশতকের আফগানিস্তানকে।
  • বিবিসির প্রবীণ সাংবাদিকের প্রথম বইটি ২০২৬ সালের নারী অকল্পকাহিনি পুরস্কার পেয়েছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

একটি হোটেল কি একটি দেশের ইতিহাস বলতে পারে? কাবুলের ইন্টার-কন্টিনেন্টাল হোটেলকে কেন্দ্র করে লিস ডুসে সেই অসম্ভব কাজটিই করেছেন তাঁর দ্য ফাইনেস্ট হোটেল ইন কাবুল: আ পিপল্‌স হিস্ট্রি অব আফগানিস্তান বইয়ে। হোটেলটির জন্ম, জৌলুস, যুদ্ধ, রক্তপাত এবং অবিশ্বাস্য টিকে থাকার গল্পের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন গত প্রায় অর্ধশতকের আফগানিস্তানকে।

বিবিসির প্রবীণ সাংবাদিকের প্রথম বইটি ২০২৬ সালের নারী অকল্পকাহিনি পুরস্কার পেয়েছে। বইটির ভাষা সহজ, দৃষ্টিভঙ্গি মানবিক। তবে চরিত্রের বিপুল ভিড় এবং আফগানিস্তানের দ্রুত বদলে যাওয়া রাজনৈতিক ইতিহাসের ঘনঘটা কখনও কখনও পাঠককে কিছুটা বিভ্রান্তও করে—দ্য হিন্দু-র পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এমনই মূল্যায়ন।

ডুসে প্রথম কাবুলে পৌঁছেছিলেন ১৯৮৮ সালের বড়দিনে। তাঁর দায়িত্ব ছিল আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের খবর সংগ্রহ করা। ইন্টার-কন্টিনেন্টালে ওঠার সময় তিনি ভাবতেও পারেননি, এই হোটেলই আগামী কয়েক দশকে তাঁর আফগানিস্তান-অভিজ্ঞতার অন্যতম স্থায়ী ঠিকানা হয়ে উঠবে। প্রায় এক বছর সেখানেই ছিলেন তিনি। পরবর্তী দশকগুলিতে সাংবাদিকতার সূত্রে বারবার আফগানিস্তানে ফিরে এসে থেকেছেন সেই একই হোটেলে।

তাই বইটি নিছক নথি, সাক্ষাৎকার আর রাজনৈতিক ইতিহাসের সংকলন নয়। এর ভিতরে মিশে আছে একজন সাংবাদিকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং আফগান মানুষের প্রতি গভীর মমতা।

ইন্টার-কন্টিনেন্টালের যাত্রা শুরু ১৯৬৯ সালে, রাজা জাহির শাহের শাসনকালে। তখন কাবুলকে বলা হত ‘প্রাচ্যের প্যারিস’। পাহাড়ের মাথায় দাঁড়ানো পাঁচতারা হোটেলটি ছিল আধুনিক আফগানিস্তানের স্বপ্নের এক দৃশ্যমান প্রতীক।

সেখানে হত পোশাকের প্রদর্শনী, গানের অনুষ্ঠান, বিলাসবহুল নৈশভোজ। অতিথিদের তালিকায় থাকতেন বিদেশি কূটনীতিক, পর্যটক, শিল্পী এবং দেশের অভিজাতরা। ‘আফগানিস্তানের এলভিস’ নামে পরিচিত জনপ্রিয় গায়ক আহমদ জাহির সেখানে গান গেয়েছেন। এসেছেন আন্তর্জাতিক তারকা গ্লোরিয়া গেনরও।

কিন্তু হোটেলের ঝলমলে দুনিয়ার বাইরে ছিল সম্পূর্ণ অন্য এক আফগানিস্তান। দারিদ্র্যে জর্জরিত দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে ইন্টার-কন্টিনেন্টালের জীবন ছিল প্রায় কল্পকাহিনি। পাশ্চাত্যধর্মী আধুনিকতা আর অভিজাতদের বিলাস যে সমাজের বৃহত্তর বাস্তবতা থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন ছিল, ডুসে সেই বৈপরীত্য আড়াল করেননি। সেই বিচ্ছিন্নতা, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দুর্নীতি ও বৈষম্য কীভাবে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, তার ছবিও বইয়ে ধরা পড়ে।

তার পর ইতিহাস দ্রুত গতি নেয়।

১৯৭৩ সালে জাহির শাহকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন তাঁর আত্মীয় মহম্মদ দাউদ খান। তারপর কমিউনিস্ট অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, ১৯৭৯ সালের সোভিয়েত আগ্রাসন, মুজাহিদিনদের প্রতিরোধ, গৃহযুদ্ধ, তালিবানের প্রথম উত্থান, আমেরিকার নেতৃত্বে সামরিক অভিযান এবং শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে তালিবানের প্রত্যাবর্তন—আফগানিস্তানের প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক পালাবদলের সাক্ষী থেকেছে ইন্টার-কন্টিনেন্টাল।

রাষ্ট্রনায়কেরা এসেছেন, ক্ষমতা হারিয়েছেন, কেউ নিহত হয়েছেন, কেউ দেশ ছেড়েছেন। কিন্তু হোটেলটি কোনও না কোনও ভাবে টিকে থেকেছে।

আর এখানেই বইটির আসল শক্তি।

এই গল্পের নায়ক হোটেলের ঝলমলে স্থাপত্য নয়। নায়ক বিদেশি সাংবাদিকরাও নন। নায়ক হোটেলের সাধারণ আফগান কর্মীরা—পরিচ্ছন্নতাকর্মী হজরত, প্রথম মহিলা রন্ধনকর্মী আবিদা, প্রকৌশলী আমানুল্লাহ, প্রথম দিকের মহিলা পরিবেশিকাদের অন্যতম মালালাই এবং তাঁদের মতো আরও অনেকে।

যুদ্ধের মধ্যে জানলা ভেঙেছে। বিদ্যুৎ নেই, জল নেই। শয়নকক্ষ কখনও আশ্রয়কক্ষে পরিণত হয়েছে। তবু কারও কাজ থামেনি। কেউ বিছানার চাদর বদলেছেন, কেউ রান্নাঘরের উনুন জ্বালিয়েছেন, কেউ ভেঙে পড়া লিফটের বদলে সিঁড়ি দিয়ে অতিথিদের মালপত্র বয়ে নিয়ে গিয়েছেন।

তাঁদের কাছে হোটেলটি শুধু কর্মস্থল ছিল না। ছিল ‘মিস্‌লে খানা’—নিজের বাড়ির মতো।

এই স্বাভাবিক জীবনযাপনের পাশেই বইয়ে রয়েছে হিংসার ভয়াবহতা। হোটেলে একাধিক জঙ্গি হামলায় অতিথি ও কর্মী নিহত হয়েছেন। বন্দুকধারীরা ঘরে ঘরে ঢুকেছে, সিঁড়িতে বোমা ছুড়েছে, আলমারির ভিতরে লুকিয়ে থাকা কর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে।

বইয়ের শুরুতেই রয়েছে এমনই এক মুহূর্ত—২০২১ সালের একটি বিয়ের অনুষ্ঠান। প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, তালিবান এগিয়ে আসছে কাবুলের দিকে। খবরটি পৌঁছতেই মুহূর্তে বদলে যায় অনুষ্ঠানের আবহ। আনন্দের জায়গা নেয় আতঙ্ক। অতিথিরা পালাতে শুরু করেন। কাঁদতে থাকেন নববধূ।

একটি ব্যক্তিগত আনন্দের অনুষ্ঠানে আচমকা ঢুকে পড়ে একটি দেশের জাতীয় বিপর্যয়। ডুসের কাহিনিবিন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাগুলির একটি এটাই।

তবে ‘জনগণের ইতিহাস’ হিসেবে একটি হোটেলকে কেন্দ্র করার এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। আফগানিস্তানের বিশাল ভৌগোলিক, জাতিগত ও সামাজিক বৈচিত্র্য কোনও একটি অভিজাত নগর-হোটেলের চার দেওয়ালের মধ্যে সম্পূর্ণ ধরা সম্ভব নয়। তার উপর একের পর এক কর্মী, অতিথি, শাসক, যুদ্ধনেতা ও সাংবাদিকের গল্প আসতে থাকায় নাম ও সময়ের হিসাব রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত জীবনের গল্প থেকে হঠাৎ বৃহত্তর রাজনৈতিক ইতিহাসে চলে যাওয়ায় বর্ণনাও মাঝেমধ্যে কিছুটা ভারী হয়ে ওঠে।

তবু বইটির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব অন্য জায়গায়।

আফগানিস্তানকে শুধু যুদ্ধ, তালিবান, সন্ত্রাস এবং বিদেশি সেনাবাহিনীর গল্প হিসেবে দেখেননি ডুসে। তিনি দেখিয়েছেন অন্য এক আফগানিস্তান—যেখানে যুদ্ধের মাঝেও মানুষ হাসে, প্রেমে পড়ে, বিয়ে করে, রান্না করে, কাজ করে এবং পরের দিনের জন্য বেঁচে থাকার চেষ্টা করে।

দেশটি বারবার ভেঙেছে। শাসক বদলেছে। যুদ্ধ এসেছে, গিয়েছে। হোটেলের দেওয়ালে গুলির দাগ পড়েছে, জানলা চুরমার হয়েছে। কিন্তু মানুষগুলো থেকে গিয়েছে।

সেই অর্থে ইন্টার-কন্টিনেন্টাল শুধু একটি হোটেল নয়। এটি বারবার ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা আফগানিস্তানেরই এক ক্ষুদ্র প্রতিরূপ—একটি দেশ, যা ক্ষতবিক্ষত হয়, কিন্তু পুরোপুরি হার মানে না।

শেষ পর্যন্ত ডুসের বইটি আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের চেয়েও বেশি কিছু হয়ে ওঠে। এটি সেই সাধারণ মানুষগুলির প্রতি এক সাংবাদিকের দীর্ঘ, বিষণ্ণ, মমতাময় এবং অদ্ভুত ভাবে আশাবাদী প্রেমপত্র।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles