Home সংস্কৃতি ও বিনোদন ১০ টাকায় ভারতীয় স্পাইডার-ম্যান!

১০ টাকায় ভারতীয় স্পাইডার-ম্যান!

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
11 views 5 minutes read
A+A-
Reset

স্পাইডার-ম্যানকে ভারতীয় করে তোলার গল্পটা আজকের নয়। সদ্য মুক্তি পাওয়া ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’-এর মতো ছবিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা দেখে মনে হতে পারে, এই সুপারহিরোর ভারতীয় জনপ্রিয়তা বুঝি সাম্প্রতিক। আসলে তার শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে কয়েক দশক আগে। সেই ইতিহাসে আছে সস্তার কমিকস, সত্যজিৎ রায় ও স্ট্যান লিকে ঘিরে এক রহস্যময় কাহিনি এবং শেষ পর্যন্ত জন্ম নেওয়া এক দেশি স্পাইডার-ম্যান—পবিত্র প্রভাকর

২০০৪ সালে মার্ভেল কমিকসের অনুমোদনে প্রকাশিত হয় ‘স্পাইডার-ম্যান: ইন্ডিয়া’। নাম বদলাল, ঠিকানা বদলাল, বদলে গেল চরিত্রের জগতও। পিটার পার্কার হয়ে গেল পবিত্র প্রভাকর। নিউ ইয়র্কের বদলে তার গল্পের মঞ্চ মুম্বই। আর চেনা লাল-নীল পোশাকের সঙ্গে জুড়ে গেল ধুতি, মোজারি ও সোনালি বালা।

এই ভারতীয় স্পাইডার-ম্যান তৈরির অন্যতম কারিগর শরদ দেবরাজন। উদ্দেশ্য ছিল শুধু বিদেশি কমিকসের গল্প ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করা নয়। লক্ষ্য ছিল স্পাইডার-ম্যানের চরিত্রটিকেই ভারতীয় সমাজ, সংস্কৃতি ও বাস্তবতার মধ্যে নতুন করে গড়ে তোলা।

সত্যজিৎ-স্ট্যান লি: গল্প, না সত্যি?

ভারতীয় স্পাইডার-ম্যানের ইতিহাসে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় সম্ভবত সত্যজিৎ রায় ও স্ট্যান লিকে ঘিরে থাকা একটি গল্প।

ইন্টারনেটে বহু দিন ধরেই একটি কাহিনি ঘোরে—সত্যজিৎ রায় নাকি নিউ ইয়র্কে গিয়ে স্ট্যান লির সঙ্গে দেখা করেছিলেন। দু’জনের আলোচনায় উঠে এসেছিল ভারতীয় স্পাইডার-ম্যান তৈরির সম্ভাবনা। রায় নাকি চরিত্রটির ভারতীয় সংস্করণ নিয়ে ভাবতেও আগ্রহী ছিলেন।

শুনতে দারুণ। কিন্তু সমস্যা হল, এই গল্পের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলেনি।

দেবরাজনও জানিয়েছেন, মার্ভেলের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার সময় তিনি এই ঘটনার কোনও নিশ্চিত প্রমাণ পাননি। ২০০৪ সালে ‘স্পাইডার-ম্যান: ইন্ডিয়া’ প্রকাশের পর থেকেই গল্পটি নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে।

অর্থাৎ সত্যজিৎ রায়-স্ট্যান লির সাক্ষাৎ এবং ভারতীয় স্পাইডার-ম্যানের পরিকল্পনার কাহিনি আপাতত রহস্যই। নথিবদ্ধ ইতিহাস অবশ্য অন্য কথা বলে—পবিত্র প্রভাকর এবং তাঁর জগতের নির্মাণ করেছিলেন দেবরাজন ও তাঁর সহযোগীরা।

যে কমিকসের দাম ছিল মাত্র ১০-১৫ টাকা

পবিত্র প্রভাকরের জন্ম বুঝতে হলে তারও আগে ফিরতে হবে ভারতীয় কমিকসের বাজারে।

১৯৯০-এর দশকে ভারতে মার্ভেল বা ডিসির কমিকস পাওয়া আজকের মতো সহজ ছিল না। বড় শহরের কিছু বইয়ের দোকানে দামি আমদানি করা সংস্করণ মিলত। নইলে পুরনো বইয়ের দোকান ঘুরে ভাগ্যের উপর নির্ভর করতে হত।

শরদ দেবরাজন ও তাঁর সহ-প্রতিষ্ঠাতা সুরেশ এই জায়গাতেই বড় সুযোগ দেখেছিলেন। প্রথমে ডিসি কমিকসের সুপারম্যান, ব্যাটম্যান এবং ‘ম্যাড ম্যাগাজিন’-এর প্রকাশনার অধিকার নেওয়া হয়। পরে আসে মার্ভেলের আঞ্চলিক প্রকাশনার অধিকারও।

তার পরেই বদলে যায় হিসাব।

ইংরেজির পাশাপাশি বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় কমিকস প্রকাশিত হতে শুরু করে। আর দাম? মাত্র ১০ থেকে ১৫ টাকা

ফলে যে সুপারহিরো কমিকস এত দিন অনেক ভারতীয় পরিবারের নাগালের বাইরে ছিল, সেটাই পৌঁছে যায় দেশের নানা প্রান্তের পাঠকের হাতে। বিক্রি হয় লক্ষ লক্ষ কপি।

আর এই অভিজ্ঞতাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনে—ভারতীয় পাঠক শুধু বিদেশি সুপারহিরোর গল্প পড়তে চায় না। সে সেই গল্পের মধ্যে নিজের জীবনকেও দেখতে চায়।

পিটার পার্কার থেকে পবিত্র প্রভাকর

কিন্তু পিটার পার্কারকে শুধু নাম বদলে ভারতীয় বানিয়ে দিলেই তো আর ভারতীয় স্পাইডার-ম্যান তৈরি হয় না।

সমস্যাটা ছিল চরিত্রের সামাজিক অবস্থান নিয়েও। আমেরিকায় পিটার পার্কার অতিরিক্ত পড়াশোনা করার কারণে ‘বইপোকা’ হিসেবে ঠাট্টার শিকার হতে পারে। কিন্তু ভারতীয় সমাজে ভাল ছাত্র হওয়া সাধারণত নেতিবাচক বিষয় নয়।

তাই পবিত্রর গল্পও আলাদা করে তৈরি করতে হয়েছিল।

পবিত্রকে দেখানো হয় গ্রামের ছেলে হিসেবে। বৃত্তি পেয়ে সে মুম্বইয়ে পড়তে আসে। সেখানে এক দিকে ঝাঁ চকচকে মহানগর, অন্য দিকে তার গ্রামীণ শিকড়। নতুন শহরে তার নিজের জায়গা তৈরি করার লড়াইও হয়ে ওঠে গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অর্থাৎ সুপারহিরো হওয়ার আগে পবিত্র ছিল একেবারেই পরিচিত এক ভারতীয় কিশোর—যে নতুন শহরে এসে নিজেকে খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

মাকড়সার কামড় নয়, এক প্রাচীন যোগী

পবিত্রর স্পাইডার-ম্যান হয়ে ওঠার গল্পেও এল বড় পরিবর্তন।

পিটার পার্কার তেজস্ক্রিয় মাকড়সার কামড়ে অতিমানবীয় ক্ষমতা পেয়েছিল। পবিত্রর ক্ষেত্রে সেই জায়গা নিল ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা ও রহস্যবাদ।

অত্যাচারীদের হাত থেকে পালানোর সময় পবিত্রর দেখা হয় এক প্রাচীন যোগীর সঙ্গে। তাঁর মাধ্যমেই পবিত্র লাভ করে অতিমানবীয় শক্তি।

অর্থাৎ পশ্চিমি স্পাইডার-ম্যানের ক্ষমতার উৎস যেখানে বিজ্ঞান ও বিকিরণ, ভারতীয় সংস্করণে সেখানে যোগ হল রহস্যবাদ এবং মহাবিশ্বের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ধারণা।

ধুতি পরে গেটওয়ে অব ইন্ডিয়ার উপর দিয়ে!

পবিত্রর সবচেয়ে বড় চমক অবশ্য তার চেহারায়।

চেনা লাল-নীল রং রাখা হলেও পোশাকে এল ধুতির আদল। পায়ে মোজারি, হাতে সোনালি বালা। উদ্দেশ্য পরিষ্কার—স্পাইডার-ম্যানকে চিনতে যাতে এক মুহূর্তও ভুল না হয়, আবার দেখলেই যেন বোঝা যায়, এই নায়ক ভারতীয়।

ভাবনাটাও ছিল বেশ মজার। ভারতীয় শিশুরা যেন কল্পনা করতে পারে, স্পাইডার-ম্যান গেটওয়ে অব ইন্ডিয়ার উপর দিয়ে জাল ছুড়ে উড়ছে, রিকশার উপর দিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে কিংবা দীপাবলিতে আন্টি মায়ার সঙ্গে উৎসব করছে।

যে নায়ককে এত দিন নিউ ইয়র্কের আকাশচুম্বী অট্টালিকার মধ্যে দেখা গিয়েছে, সেই একই নায়ক এ বার ঢুকে পড়ল মুম্বইয়ের রাস্তায়।

তবে এত পরিবর্তনের পরেও একটি জিনিস বদলায়নি—বড় শক্তির সঙ্গে আসে বড় দায়িত্ব।

শুরুটা ছিল কমিকসে, স্বপ্নটা আরও বড়

দুই দশক পেরিয়ে আজ পবিত্র প্রভাকরের সেই পরীক্ষার দিকে তাকালে বোঝা যায়, ভাবনাটি কতটা সময়োপযোগী ছিল।

বিশ্ব বিনোদনে এখন স্থানীয় গল্প, সংস্কৃতি ও চরিত্রকে আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে তুলে ধরার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। জাপানি অ্যানিমে কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার কে-ড্রামা ও কে-পপ দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বজোড়া সাফল্য পেতে নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলতে হয় না।

দেবরাজনের পরবর্তী কাজেও সেই চিন্তার ছাপ রয়েছে। হনুমান ও কর্ণের মতো ভারতীয় পৌরাণিক চরিত্রকে আধুনিক কমিকস ও ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। তাঁর সংস্থা গ্রাফিক ইন্ডিয়ার লক্ষ্যও ভারতকে শুধু অ্যানিমেশন ও কমিকসের ‘আউটসোর্সিং কেন্দ্র’ হিসেবে না দেখে মৌলিক গল্পের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

সেই অর্থে পবিত্র প্রভাকর শুধু ভারতীয় স্পাইডার-ম্যান নন। তিনি একটা সময়ের পরীক্ষাও—কী ভাবে বিশ্বের জনপ্রিয় এক চরিত্রকে নিজের মাটি, ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশিয়ে সম্পূর্ণ নতুন করে জন্ম দেওয়া যায়।

আর সেই যাত্রার শুরু হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন ভারতীয় পাঠকের হাতে একটি সুপারহিরো কমিকস পৌঁছে যেত মাত্র ১০-১৫ টাকায়

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles