কলম বনাম তলোয়ার

যা জানা জরুরি
- পুজোর বাংলা ছবির বাজারে এ বার লড়াইটা শুধু বক্স অফিসে নয়, ইতিহাসের পাতাতেও।
- সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’-এর হাত ধরে পর্দায় ফিরছে এক সময়ের নিষিদ্ধ উপন্যাস, ঔপনিবেশিক শাসন এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার গল্প।
- আর সেই ছবির প্রচারে সামনে এসেছে রবীন্দ্রসংগীত ‘তোমারেই করিয়াছি’।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পুজোর বাংলা ছবির বাজারে এ বার লড়াইটা শুধু বক্স অফিসে নয়, ইতিহাসের পাতাতেও। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’-এর হাত ধরে পর্দায় ফিরছে এক সময়ের নিষিদ্ধ উপন্যাস, ঔপনিবেশিক শাসন এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার গল্প। আর সেই ছবির প্রচারে সামনে এসেছে রবীন্দ্রসংগীত ‘তোমারেই করিয়াছি’। ‘পথের দাবী’-র প্রকাশের শতবর্ষে শরৎচন্দ্রকে নতুন করে পর্দায় আনার আয়োজন, ছবিটির ঘোষিত মুক্তির সময় দুর্গাপুজো।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে, গানটি গেয়েছেন মোহন সিং খাঙ্গুরা, ঈশান মিত্র ও অন্তরা ভট্টাচার্য। এর আগে প্রকাশিত হয়েছে ‘সইতে সইতে’। গানকে প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে তোলায় ছবির ঐতিহাসিক সংঘাতের পাশাপাশি আবেগের দিকটিও ধীরে ধীরে সামনে আসছে। ছবির মূল দ্বন্দ্ব বোঝাতে সৃজিত বলেছেন লেখকের কলম আর অত্যাচারী তলোয়ারের অসম লড়াইয়ের কথা। অর্থাৎ একদিকে রাষ্ট্রশক্তি, অন্যদিকে একজন লেখকের শব্দ।
প্রদীপ কুমার নন্দীর প্রযোজনায় ছবিতে রয়েছেন আবির চট্টোপাধ্যায়, টোটা রায়চৌধুরী, মিমি চক্রবর্তী, দিব্যাণী মণ্ডল, ঋক চট্টোপাধ্যায়, দেবপ্রিয় মুখোপাধ্যায়, সঞ্জয় নাগ, কৌশানী মুখোপাধ্যায় ও কাঞ্চন মল্লিক। নির্মাতার কথায়, গল্প এগোবে ইতিহাস ও সাহিত্যের দুই পরিসর মিলিয়ে। তাই এটিকে শুধু পরিচিত উপন্যাসের আর একটি সরল চলচ্চিত্ররূপ ভাবলে ছবিটির ঘোষিত ভাবনার একটা বড় অংশই বাদ পড়ে যায়।
১৯২৬ সালে বই আকারে প্রকাশিত ‘পথের দাবী’-র কেন্দ্রে সব্যসাচী। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবী সংগঠন, স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন—সব মিলিয়েই তৈরি উপন্যাসের উত্তেজনা। ভারতী, সুমিত্রা এবং অপূর্বর মতো চরিত্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে ব্যক্তিগত অনুভূতির সংঘাতও সামনে আসে। রোমাঞ্চের ভিতরেই শরৎচন্দ্র ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন রাজনৈতিক মুক্তির প্রশ্ন।
আর সেই কারণেই বইটির ইতিহাসও কম নাটকীয় নয়। ব্রিটিশ সরকার উপন্যাসটি নিষিদ্ধ করেছিল। ফলে ‘পথের দাবী’-র সাহিত্যিক জনপ্রিয়তার সঙ্গে জুড়ে যায় রাষ্ট্রীয় দমনের ইতিহাসও। একটি গল্প, কয়েকটি চরিত্র, কিছু সংলাপ—সেগুলিই কীভাবে শাসকের কাছে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, এই উপন্যাস সেই প্রশ্নটি সামনে আনে। প্রকাশের একশো বছর তাই শুধু পুরনো বইকে নতুন করে মনে করার উপলক্ষ নয়; লেখার সামাজিক শক্তি নিয়েও ভাবার সুযোগ।
তবে ‘পথের দাবী’ শুধু ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবের গল্প নয়। স্বাধীনতার প্রশ্নের পাশাপাশি সেখানে রয়েছে নারীর অবস্থান, সামাজিক আচার এবং ধনী-দরিদ্রের ব্যবধানের মতো বিষয়ও। সুমিত্রা ও ভারতী শুধু বিপ্লবীদের পাশে দাঁড়ানো পার্শ্বচরিত্র নন; তাঁদের নিজেদের মত, সিদ্ধান্ত এবং সম্পর্কের জটিলতাও রয়েছে। ফলে বাইরের শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা চাইতে গিয়ে সমাজের ভিতরের বাধাগুলিও গল্পের অংশ হয়ে ওঠে।
সেই জায়গা থেকেই ব্যক্তিস্বাধীনতা ও দেশের স্বাধীনতার সম্পর্কটিও নতুন করে পড়া যায়। একজন মানুষ রাষ্ট্রের কাছ থেকে মুক্তি চাইছেন, অথচ নিজের সমাজে তিনি কতটা স্বাধীন—এই প্রশ্নটি শতবর্ষ পরেও অচেনা নয়। ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ সেই বৃহত্তর পরিসরকে পর্দায় কতটা জায়গা দেয়, সেটিই দেখার।
ছবির নামেও যেন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে দুটো শক্তি—একদিকে সম্রাটের নামে পরিচালিত রাষ্ট্র, অন্যদিকে একজন লেখক। কিন্তু এই সংঘাতকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে শুধু তেজি সংলাপ যথেষ্ট নয়। একজন লেখক নিজের সময়ের ভয়, আপস, ক্ষোভ এবং আকাঙ্ক্ষাকে কীভাবে লেখায় মিশিয়ে দেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ব্যক্তিজীবন আর তাঁর সৃষ্ট চরিত্রেরা কোথায় এসে একে অন্যের ছায়া হয়ে ওঠে, ছবিটির ঘোষিত কাঠামো সেই প্রশ্নও তুলতে পারে।
রবীন্দ্রসংগীতের ব্যবহারও তাই কৌতূহল তৈরি করছে। রাজনৈতিক উত্তেজনায় ভরা একটি ছবিতে গান কি নিছক আবেগের বিরতি, নাকি চরিত্রের ভিতরের কথাই আরও জোরে বলবে—তার উত্তর মিলবে ছবিতে। গান প্রকাশের প্রচারকে অবশ্যই পুরো ছবির শিল্পমূল্যের মাপকাঠি বলা যায় না। তবে বাংলা সাহিত্যকে কেন্দ্র করে এমন বড় আয়োজনের আবহ তৈরি করতে সংগীত যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে, তার ইঙ্গিত মিলছে।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শরৎচন্দ্রকে কী ভাবে দেখা হচ্ছে, তা নিয়ে। তাঁকে পাঠ্যবইয়ের পাতায় স্থির করে রাখা সহজ; তাঁর সময়ের ভয়, অস্বস্তি, ঝুঁকি এবং বিদ্রোহকে জীবন্ত করে তোলা অনেক কঠিন। পুজোর ছবির ভিড়ে সৃজিত মুখোপাধ্যায় সেই কঠিন কাজটিই সামনে রাখছেন।
দর্শকের কৌতূহল তাই শুধু কে কেমন অভিনয় করলেন, তা নিয়ে নয়। একশো বছর আগে লেখা একটি বই আজকের পর্দায় কী ভাবে কথা বলে—সেটাই আসল প্রশ্ন। আর সেখানে কলমের সঙ্গে তলোয়ারের লড়াইটা যে এখনও বেশ জমজমাট, তা বলাই যায়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



