প্রেমে ‘ওয়ান্স মোর’, গল্পে একটু কম

যা জানা জরুরি
- প্রেমে কি সত্যিই দ্বিতীয় সুযোগ বলে কিছু থাকে?
- নাকি পুরনো ক্ষত বয়ে নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া নিছক আত্মপ্রবঞ্চনা?
- নবাগত পরিচালক বিঘ্নেশ শ্রীকান্তের তামিল ছবি ওয়ান্স মোর এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রেমে কি সত্যিই দ্বিতীয় সুযোগ বলে কিছু থাকে? নাকি পুরনো ক্ষত বয়ে নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া নিছক আত্মপ্রবঞ্চনা? নবাগত পরিচালক বিঘ্নেশ শ্রীকান্তের তামিল ছবি ওয়ান্স মোর এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজে। প্রথমার্ধে সেই খোঁজ বেশ সতেজ, কোমল এবং হৃদয়ছোঁয়া। কিন্তু বিরতির পর চেনা নাটকীয়তার ভিড়ে ছবিটি ধীরে ধীরে নিজের তৈরি করা মায়াটাই হারিয়ে ফেলে।
রঘুবরণ আট বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে এক ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতি। সেই অতীত তার জীবন থেকে আনন্দ, স্বাভাবিকতা—প্রায় সবকিছুই কেড়ে নিয়েছে। নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে সে যেন বেঁচে থাকার বদলে শুধু দিন কাটায়। ঠিক তখনই তার জীবনে ফিরে আসে কলেজের কনিষ্ঠ সহপাঠী অঞ্জলি। প্রাণচঞ্চল, অকপট এবং প্রবলভাবে জেদি অঞ্জলি রঘুবরণের বিষণ্ণতার একেবারে বিপরীত মেরু।
রঘুবরণ তাকে এড়িয়ে যেতে চায়, কিন্তু অঞ্জলি সহজে পিছু হটার মানুষ নয়। তার অবিরাম উপস্থিতি, খুনসুটি এবং সরল আন্তরিকতার মধ্যে দিয়েই ধীরে ধীরে বরফ গলতে শুরু করে। যে মানুষটি জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, সে আবার হাসতে শেখে, কথা বলতে শেখে, এমনকি ভালোবাসার সম্ভাবনাতেও বিশ্বাস করতে শুরু করে।
ছবিটির সবচেয়ে সুন্দর জায়গা এখানেই। পরিচালক সম্পর্কটিকে বড় বড় সংলাপ কিংবা অতিরিক্ত আবেগ দিয়ে তৈরি করেননি। বরং ছোট কথোপকথন, অস্বস্তিকর নীরবতা, চোখাচোখি আর দৈনন্দিন মুহূর্তের মধ্য দিয়েই দু’জন মানুষের দূরত্ব কমিয়েছেন। ফলে প্রেমটা সিনেমার ‘ঘটনা’ না হয়ে ধীরে ধীরে জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
আরও ভালো লাগে, গল্পটি আত্মহত্যা, সমলিঙ্গের সম্পর্ক, মানসিক অবসাদ কিংবা শারীরিক ঘনিষ্ঠতার মতো বিষয়কে আলাদা করে ‘বার্তা’ বানানোর চেষ্টা করেনি। এগুলি গল্পের স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই এসেছে। ফলে ছবির সংবেদনশীলতা অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে।
অর্জুন দাসও এখানে নিজের পরিচিত গম্ভীর, বিষণ্ণ পর্দা-ব্যক্তিত্বকে নতুনভাবে ব্যবহার করেছেন। রঘুবরণের চুপ করে থাকা থেকে ধীরে ধীরে জীবনের দিকে ফিরে আসার যাত্রাটি তিনি খুব বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। বিশেষ করে নীরব দৃশ্যগুলিতে তাঁর চোখই যেন সংলাপের কাজ করে।
তবে ছবির আসল প্রাণ অদিতি শঙ্কর। অঞ্জলির প্রাণোচ্ছলতা, দুষ্টুমি আর জেদ চরিত্রটিকে সহজেই বিরক্তিকর করে তুলতে পারত। কিন্তু অদিতির স্বাভাবিক অভিনয় তাকে বরং প্রাণবন্ত করে তোলে। কখনও কখনও অঞ্জলির আচরণ ব্যক্তিগত পরিসরের সীমা ছুঁয়ে ফেললেও অদিতির অভিনয় চরিত্রটির প্রতি দর্শকের সহানুভূতি ধরে রাখে। অর্জুন ও অদিতির পর্দার রসায়নও ছবির অন্যতম বড় শক্তি।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দ্বিতীয়ার্ধে সেই সূক্ষ্মতা আর থাকে না।
রঘুবরণের অতীতের প্রেম ইন্দ্রাকে ঘিরে গল্প যত এগোয়, ততই চিত্রনাট্য চেনা পথে হাঁটতে শুরু করে। সোনা ওলিকাল চরিত্রটিতে যথেষ্ট আকর্ষণ তৈরি করলেও রঘুবরণ ও ইন্দ্রার সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং কেন ভেঙে গেল, সেই জায়গাগুলি আরও গভীরভাবে নির্মাণ করা দরকার ছিল। ফলে অতীতের সত্য সামনে আসার পর যে আবেগের বিস্ফোরণ ঘটানোর চেষ্টা করা হয়, তার ভিতটাই খুব শক্ত নয়।
কয়েকটি চরিত্রের সিদ্ধান্তও স্বাভাবিক মানুষের আচরণের চেয়ে চিত্রনাট্যের প্রয়োজনেই নেওয়া বলে মনে হয়। এখান থেকেই ছবির গতি কমতে থাকে। প্রথমার্ধের মিষ্টি, স্বাভাবিক প্রেমের গল্পটি দ্বিতীয়ার্ধে ক্রমশ দীর্ঘ, ভারী এবং অনুমানযোগ্য হয়ে ওঠে। যে গল্প শুরুতে চরিত্রদের অনুভূতির উপর ভরসা করেছিল, শেষদিকে সেখানে নাটকীয়তার উপর নির্ভরতা বেড়ে যায়।
তবে প্রযুক্তিগত দিক থেকে ওয়ান্স মোর যথেষ্ট মসৃণ। হেশম আবদুল ওয়াহাবের সুর ছবির কোমল আবহকে আরও গভীর করেছে। ‘ভা কান্নাম্মা’ এবং ‘ইধয়ম’ গান দুটিও গল্পের আবেগের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশে যায়। অরবিন্দ বিশ্বনাথনের চিত্রগ্রহণ ছবির প্রেম, বিষণ্ণতা এবং পুনরুদ্ধারের মুহূর্তগুলিকে নরম, উষ্ণ আবহে ধরে রেখেছে।
শেষ পর্যন্ত ওয়ান্স মোর এমন একটি ছবি, যার সম্ভাবনা তার চূড়ান্ত ফলাফলের চেয়ে বড়। সম্পর্ক, মানসিক নিরাময় এবং জীবনে দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়ার ধারণাকে ছবিটি আন্তরিকভাবে ছুঁতে চেয়েছে। প্রথমার্ধে সেই চেষ্টার ফলও দারুণ। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের চেনা নাটকীয়তা ছবিটির সূক্ষ্মতাকে অনেকটাই ভোঁতা করে দেয়।
তবু অর্জুন দাস ও অদিতি শঙ্করের অভিনয়, তাঁদের স্বাভাবিক রসায়ন এবং প্রেমকে খুব মানবিকভাবে দেখার চেষ্টা ওয়ান্স মোর-কে পুরোপুরি খারাপ ছবি হতে দেয় না।
প্রেমে দ্বিতীয় সুযোগ মিলতে পারে। ওয়ান্স মোর-এরও হয়তো তাই প্রাপ্য—একবার দেখার সুযোগ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



