লেকের নামেই যুদ্ধ!

যা জানা জরুরি
- ‘লেক অন্টারিও’ না ‘লেক আমেরিকা’—নাম নিয়েই এ বার সরাসরি টানাপোড়েন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার।
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জলাশয়টির নাম বদলে ‘লেক আমেরিকা’ করার নির্দেশ দেওয়ার পর পাল্টা জবাব দিয়েছে কানাডার অন্টারিও প্রদেশ।
- গ্রিমসবির কাছে বসানো হয়েছে প্রায় দোতলা বাড়ির সমান বিশাল একটি ফলক।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
‘লেক অন্টারিও’ না ‘লেক আমেরিকা’—নাম নিয়েই এ বার সরাসরি টানাপোড়েন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জলাশয়টির নাম বদলে ‘লেক আমেরিকা’ করার নির্দেশ দেওয়ার পর পাল্টা জবাব দিয়েছে কানাডার অন্টারিও প্রদেশ। গ্রিমসবির কাছে বসানো হয়েছে প্রায় দোতলা বাড়ির সমান বিশাল একটি ফলক। তাতে স্পষ্ট ঘোষণা—‘লেক অন্টারিও। এখন এবং চিরকাল।’
তবে তাতেই শেষ নয়। ট্রাম্পও ছেড়ে কথা বলেননি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করেছেন তিনি। সেখানে তাঁকে ‘লেক অন্টারিও’ লেখা ফলকটি লাথি মেরে ফেলে দিয়ে তার জায়গায় ‘লেক আমেরিকা’ লেখা ফলক বসাতে দেখা যাচ্ছে। পটভূমিতে বাজছে ‘ওয়াইএমসিএ’ গান, আর ট্রাম্প নাচছেনও। কূটনৈতিক সংঘাত যেন আচমকাই পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক মিমে!
অবশ্য এই নামবদলের লড়াইয়ের পিছনে রয়েছে আরও গুরুতর কারণ—যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠা বাণিজ্য সংঘাত। কানাডার ইস্পাতের উপর ওয়াশিংটন ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক চাপিয়েছে। পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে অটোয়াও। বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা যখন কার্যত থমকে, তখন বৃহস্পতিবার একটি নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প মার্কিন সরকারি সংস্থাগুলিকে লেক অন্টারিওকে ‘লেক আমেরিকা’ নামে উল্লেখ করার নির্দেশ দেন।
এর পরেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীদের জন্য গুগল মানচিত্রে বদলে যায় জলাশয়টির নাম। সেখানে দেখা যায় ‘লেক আমেরিকা’। গুগলের যুক্তি, সরকারি ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থায় স্বীকৃত নামই তাদের মানচিত্রে প্রতিফলিত হয়। তবে কানাডায় এখনও নামটি ‘লেক অন্টারিও’। আর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাইরের ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে দুই নামই দেখানো হচ্ছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অবশ্য নাম বদলের প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘অন্টারিও’ নামটির শিকড় ওয়েনড্যাট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষায়। শব্দটির অর্থ—‘হ্রদটি সুন্দর’ বা ‘হ্রদটি মহান’। অর্থাৎ নামটির পিছনে রয়েছে চার শতাব্দীরও বেশি পুরনো ইতিহাস।
অন্টারিওর মুখ্যমন্ত্রী ডগ ফোর্ডও ট্রাম্পকে পাল্টা বার্তা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কানাডা ও অন্টারিও নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নেওয়াতেই ট্রাম্প এমন ‘প্ররোচনামূলক’ পদক্ষেপ করছেন। গ্রিমসবির কাছে বিশাল ফলক উন্মোচনের সময় তাঁর সাফ কথা, “ট্রাম্প চলে যাওয়ার বহু পরেও এর নাম লেক অন্টারিওই থাকবে।” এবিসি নিউজকে ফোর্ড এমনকি গোটা ঘটনাটিকে ব্যঙ্গাত্মক টেলিভিশন অনুষ্ঠানের দৃশ্যের সঙ্গেও তুলনা করেছেন।
ম্যানিটোবার মুখ্যমন্ত্রী ওয়াব কিনিউও পিছিয়ে থাকেননি। ট্রাম্পের এই উদ্যোগকে তিনি এমন এক প্রবীণ গানের দলের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যারা পুরনো জনপ্রিয় গান বারবার গেয়ে নতুন করে সাফল্য পাওয়ার চেষ্টা করে। তাঁর ইঙ্গিত, মেক্সিকো উপসাগরের নাম বদলে ‘গালফ অব আমেরিকা’ করার কৌশলকেই ট্রাম্প এ বার নতুন মঞ্চে ফিরিয়ে এনেছেন।
ওয়েনড্যাট নেশনের প্রধান পিয়ের পিকার্ডের আপত্তি আরও গভীর। তাঁর মতে, এই নাম বদলের উদ্যোগ আদিবাসী ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং পরিচয় মুছে দেওয়ার চেষ্টা। ট্রাম্প অবশ্য পাল্টা আক্রমণ করে কানাডাকে ‘সবচেয়ে খারাপ’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন, দেশটি কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠকিয়েছে।
ফলে উত্তর আমেরিকার পাঁচটি বৃহৎ হ্রদের মধ্যে আয়তনে সবচেয়ে ছোট লেক অন্টারিও এখন আর শুধু মানচিত্রের একটি জলাশয় নয়। বাণিজ্যযুদ্ধ, জাতীয় পরিচয়, আদিবাসী ইতিহাস এবং রাজনৈতিক প্রচারের টানাপোড়েনে একটি হ্রদের নামই হয়ে উঠেছে দুই দেশের অহংকারের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



