জামিনযোগের মহাগুরু, এবার জেলযোগে প্রত্যাবর্তন

যা জানা জরুরি
- হাইলাইটস গত দু’বছরে অন্তত পনেরোবার অন্তর্বর্তী জামিন পেয়েছেন আশারাম বাপু।
- রাজস্থান হাইকোর্ট এবার সেই ধারাবাহিকতায় ব্রেক কষেছে।
- আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, চিকিৎসার প্রয়োজন মানেই জেলমুক্তি নয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
হাইলাইটস
- গত দু’বছরে অন্তত পনেরোবার অন্তর্বর্তী জামিন পেয়েছেন আশারাম বাপু।
- প্রায় প্রতিবারই কারণ ছিল স্বাস্থ্যগত সমস্যা।
- রাজস্থান হাইকোর্ট এবার সেই ধারাবাহিকতায় ব্রেক কষেছে।
- আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, চিকিৎসার প্রয়োজন মানেই জেলমুক্তি নয়।
- স্বঘোষিত ধর্মগুরুর ‘জামিনযোগ’ আপাতত থেমে গিয়ে শুরু হয়েছে ‘জেলযোগ’।
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের বিচারব্যবস্থায় নানা ধরনের যোগ আছে। কেউ আইনের ফাঁকফোকর যোগ জানেন, কেউ তারিখের পর তারিখ যোগ। কিন্তু গত কয়েক বছরে এক নতুন সাধনার জন্ম দিয়েছেন আশারাম বাপু। তার নাম দেওয়া যেতে পারে — ‘জামিনযোগ’।
এই যোগের মূল মন্ত্র খুব সরল। জেলে থাকবেন, অসুস্থ হবেন, জামিন চাইবেন, বাইরে আসবেন, কিছুদিন কাটাবেন, আবার অসুস্থ হবেন, আবার জামিন চাইবেন। এভাবে চলতে থাকবে মুক্তি ও বন্দিত্বের এক আধ্যাত্মিক চক্র। কিন্তু সব যোগেরই শেষ আছে। রাজস্থান হাইকোর্ট বুধবার সেই শেষ ঘণ্টাটি বাজিয়ে দিল।
আদালত আশারামের অন্তর্বর্তী জামিনের মেয়াদ বাড়াতে অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ যিনি গত দু’বছরে অন্তত পনেরোবার স্বাস্থ্যজনিত কারণে জেল থেকে বেরিয়েছেন, তাঁকে আবার জেলের দরজার ওপারে ফিরে যেতে হবে। এবং এই ঘটনাটি কেবল একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়, এটি এক দীর্ঘ নাটকের নতুন অধ্যায়।
ভগ্নস্বাস্থ্যের অলৌকিক পুনর্জন্ম
আশারাম বাপুর স্বাস্থ্য নিয়ে ভারতের চিকিৎসাবিজ্ঞান একদিন আলাদা গবেষণাপত্র লিখতে পারে। জেলের ভেতরে থাকলে শরীর ভেঙে পড়ে, জামিন পেলেই আশ্চর্যজনকভাবে কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠে, আবার জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় এলেই নতুন কোনও অসুখের আবির্ভাব ঘটে। কখনও হৃদরোগ, কখনও বয়সজনিত জটিলতা, কখনও অন্য শারীরিক সমস্যা। মনে হতে পারে, মানবদেহ নয়, যেন একটি রাজনৈতিক জোট সরকার — প্রতি কয়েক মাসে নতুন সংকট দেখা দেয়।
আইনজীবীরা বারবার যুক্তি দিয়েছেন, ৮০-ঊর্ধ্ব আশারামের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে, তাই তাঁকে আরও সময় দেওয়া প্রয়োজন। সমস্যা হল, এই যুক্তি এতবার ব্যবহার করা হয়েছে যে সেটি এখন পুরনো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মতো শোনায় — শুনলেই মানুষ জানে পরের লাইন কী হবে।
আদালতের ধৈর্যেরও সীমা আছে
ভারতীয় আদালত সাধারণত অত্যন্ত ধৈর্যশীল প্রতিষ্ঠান, কখনও কখনও এতটাই ধৈর্যশীল যে কোনও মামলা শেষ হতে একটি প্রজন্ম পেরিয়ে যায়। কিন্তু ধৈর্যেরও একটি সীমারেখা থাকে। রাজস্থান হাইকোর্টের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট, বিচারপতিরা মনে করছেন চিকিৎসার প্রয়োজনকে স্থায়ী জামিনের শর্টকাট বানানো যায় না। যদি অসুস্থতা থাকে, চিকিৎসা হবে, যদি হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন হয়, সেই ব্যবস্থাও হবে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি অনির্দিষ্টকাল জেলের বাইরে থাকবেন।
আদালতের এই অবস্থান আসলে একটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে — স্বাস্থ্য কি শাস্তি থেকে অব্যাহতির লাইসেন্স? নাকি স্বাস্থ্যগত সুবিধা ও বিচারিক শাস্তি, দুটিকে একসঙ্গে সামঞ্জস্য করা সম্ভব? হাইকোর্ট দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছে।
গুরু না জামিন-পর্যটক?
আশারাম বাপুর জীবনকাহিনি এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে তাঁর আধ্যাত্মিক পরিচয়ের চেয়ে আইনি পরিচয়ই বেশি আলোচিত। একসময় তিনি নিজেকে লক্ষ লক্ষ ভক্তের গুরু বলে দাবি করতেন। আজ তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই মানুষের মনে প্রথমে আসে ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কথা, তারপর আসে জেল, তারপর আসে জামিন, এবং তারপর আবার নতুন জামিনের আবেদন। এ যেন ধর্মীয় সফর নয়, বরং আইনি পর্যটন — শুধু গন্তব্য দুটি, জেল এবং হাসপাতাল।
‘বাপু’ ব্র্যান্ডের অবক্ষয়
ভারতীয় সমাজে ‘বাপু’ শব্দটির একটি ঐতিহাসিক মর্যাদা আছে। একসময় এই শব্দ শুনলে মানুষের মনে ভেসে উঠত মহাত্মা গান্ধীর ছবি। আজকের ভারতে ‘বাপু’ শব্দটির সঙ্গে নানা ধরনের বিতর্ক, অপরাধ এবং আদালতের রায় জুড়ে গেছে, এবং আশারাম সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রতীক। যে মানুষ একসময় ধর্মীয় শিবিরে হাজার হাজার অনুসারী টানতেন, তিনি আজ আদালতের নির্দেশে জেলে ফেরত যাচ্ছেন। এটি কেবল একজন ব্যক্তির পতনের গল্প নয়, এটি অন্ধ ভক্তিরও পতনের গল্প।
ভক্তদের জন্য কঠিন সময়
আশারামের অনুগামীরা অবশ্য এখনও বিশ্বাস করেন, তাঁদের গুরু নির্দোষ। ভারতের প্রায় সব বিতর্কিত ধর্মগুরুর ক্ষেত্রেই এই দৃশ্য দেখা যায় — আদালত দোষী বলে, প্রমাণ দোষী বলে, রায় দোষী বলে, কিন্তু ভক্তরা বলেন ষড়যন্ত্র। এ যেন এক বিশেষ ধরনের ধর্মতত্ত্ব, যেখানে বাস্তবতার সঙ্গে যুক্তির সম্পর্ক ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে। হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত তাঁদের কাছে নিশ্চয়ই হতাশাজনক, কারণ তাঁরা হয়তো আশা করেছিলেন, আরও কয়েক মাসের জন্য অন্তর্বর্তী জামিনের দরজা খুলে যাবে। সেটি হয়নি।
জামিনের লিফট এবার নিচের তলায়
গত দুই বছরে আশারামের জীবন অনেকটা হোটেলের লিফটের মতো ছিল — কখনও জেল, কখনও হাসপাতাল, কখনও জামিন, কখনও ফের জেল। লিফটটি অবিরাম ওঠানামা করেছে। কিন্তু এবার আদালত যেন লিফটের জরুরি ব্রেক টেনে ধরেছে। বার্তা পরিষ্কার — অন্তর্বর্তী জামিন কোনও স্থায়ী ব্যবস্থা নয়, এটি ব্যতিক্রম। এবং ব্যতিক্রমকে নিয়মে পরিণত করার চেষ্টা আদালত আর মেনে নিতে রাজি নয়।
আশারাম বাপুর জীবনের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ সম্ভবত এটাই। যে ব্যক্তি একসময় মানুষকে মোক্ষের পথ দেখানোর দাবি করতেন, তিনি এখন বছরের পর বছর ধরে আদালত, হাসপাতাল এবং জেলের মধ্যে মুক্তির পথ খুঁজছেন। একসময় তাঁর শিষ্যরা বিশ্বাস করতেন, তিনি অলৌকিক শক্তির অধিকারী। কিন্তু ভারতীয় বিচারব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত অলৌকিকতায় নয়, নথিপত্রে বিশ্বাস করে। আর সেই নথিপত্রের পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে রাজস্থান হাইকোর্ট এবার যেন স্পষ্ট ভাষায় বলেছে — “বাপু, যথেষ্ট হয়েছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পালা শেষ। এবার জেলযাত্রার সময়।”
জামিনযোগের দীর্ঘ সাধনা আপাতত ভঙ্গ হয়েছে। গুরু আবার গেছেন গুমঘরে। আর আদালত যেন নীরবে বলে দিয়েছে — মোক্ষ পরে হবে, আগে সাজা ভোগ করুন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



