সংস্কৃতি ও বিনোদন

শেষে সবই মাকোন্দো

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড দীর্ঘদিন ধরেই ‘চলচ্চিত্রায়ণের অযোগ্য’ উপন্যাস হিসেবে পরিচিত।
  • একই নামের পুনরাবৃত্তি, সাত প্রজন্মে ছড়িয়ে থাকা বুয়েন্দিয়া পরিবারের গোলকধাঁধার মতো বংশলতিকা, আর ইতিহাসের সঙ্গে জাদুবাস্তবতার এমন মিশেল—পর্দায় তাকে ধরতে গেলেই বিপদ।
  • নেটফ্লিক্সের ধারাবাহিকটির দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব সেই বিপজ্জনক পথেই হেঁটে প্রায় অবিশ্বাস্য দক্ষতায় পৌঁছে যায় সমাপ্তির দরজায়।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড দীর্ঘদিন ধরেই ‘চলচ্চিত্রায়ণের অযোগ্য’ উপন্যাস হিসেবে পরিচিত। একই নামের পুনরাবৃত্তি, সাত প্রজন্মে ছড়িয়ে থাকা বুয়েন্দিয়া পরিবারের গোলকধাঁধার মতো বংশলতিকা, আর ইতিহাসের সঙ্গে জাদুবাস্তবতার এমন মিশেল—পর্দায় তাকে ধরতে গেলেই বিপদ। নেটফ্লিক্সের ধারাবাহিকটির দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব সেই বিপজ্জনক পথেই হেঁটে প্রায় অবিশ্বাস্য দক্ষতায় পৌঁছে যায় সমাপ্তির দরজায়।

প্রথম পর্বে ছিল মাকোন্দোর জন্ম, বিস্ময় আর বুয়েন্দিয়া পরিবারের শিকড় ছড়িয়ে পড়ার গল্প। দ্বিতীয় পর্বে সেই শিকড়েই ধরে পচন। আসে অবক্ষয়, যুদ্ধ, বিস্মৃতি এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংস।

কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার বিপ্লবও ধীরে ধীরে তার আদর্শ হারিয়ে ফেলে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে মানুষটি অস্ত্র ধরেছিলেন, অন্তহীন যুদ্ধের চক্রে তিনিই একসময় ক্ষমতার নিষ্ঠুর খেলায় আটকে পড়েন। বিপ্লব তাঁকে জয় এনে দেয় না, বরং আরও গভীর নিঃসঙ্গতার দিকে ঠেলে দেয়। ক্লদিও কাতানিও চরিত্রটির ক্লান্তি, শূন্যতা এবং নিজের কাছ থেকেই দূরে সরে যাওয়ার অনুভূতিটুকু অসাধারণ সংযমে ফুটিয়ে তুলেছেন।

এদিকে মাকোন্দো আর আগের সেই বিচ্ছিন্ন, বিস্ময়ভরা জনপদ নেই। রেলগাড়ির সঙ্গে ঢুকে পড়ে আধুনিকতা, বিদেশি পুঁজি এবং কলা-সংস্থা। সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতির আড়ালে শুরু হয় শ্রমিকশোষণ। তারপর ধর্মঘটরত শ্রমিকদের হত্যাকাণ্ড—এবং তার পরেই আরও ভয়ঙ্কর ঘটনা: রাষ্ট্র বলে, কিছুই ঘটেনি।

এখানেই ধারাবাহিকটি মার্কেসের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বক্তব্যগুলির একটিকে অসাধারণভাবে দৃশ্যমান করে। মানুষকে হত্যা করা ভয়াবহ; কিন্তু তার থেকেও ভয়ঙ্কর হল হত্যার স্মৃতিটুকু মুছে ফেলা। হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো সত্যের সাক্ষী হয়ে থাকেন, অথচ এমন এক সমাজে আটকে পড়েন, যে সমাজ সত্য শুনতে চায় না। ইতিহাস তখন শুধু নিহতদের নয়, জীবিতদেরও পরিত্যাগ করে।

জাদুবাস্তবতার ব্যবহারেও নির্মাতারা সংযম দেখিয়েছেন। আকাশ থেকে ফুল ঝরা, মৃত মানুষের ফিরে আসা কিংবা বছরের পর বছর বৃষ্টি—কোনও ঘটনাকেই আলাদা করে ‘বিস্ময়কর’ করে তোলা হয়নি। মাকোন্দোয় এগুলো যেন জীবনেরই স্বাভাবিক নিয়ম। বরং বদলে যাওয়া বাড়িঘর, পোশাক, আলো আর আবহসংগীতের মধ্যে সময়ের ক্ষয়টাকেই বেশি অনুভব করা যায়।

এই অভিযোজনের আরেকটি বড় শক্তি তার সাংস্কৃতিক শিকড়। কলম্বিয়ায় নির্মিত স্পেনীয় ভাষার এই সিরিজটি মার্কেসের জগতকে কোনও চকচকে আন্তর্জাতিক ফ্যান্টাসিতে বদলে দেয় না। মাকোন্দো দেখতে যেমন কলম্বিয়ার, তার ইতিহাস, রাজনীতি এবং ক্ষতও তেমনই স্থানীয়—আর সেই কারণেই গল্পটি আরও সার্বজনীন হয়ে ওঠে।

শেষ প্রজন্মে প্রেম আবার আশার মতো ফিরে আসে। কিন্তু বুয়েন্দিয়াদের জীবনে প্রেমও যেন নিঃসঙ্গতার আরেক নাম। নিষিদ্ধ সম্পর্কের পর শূকরের লেজওয়ালা শিশুর জন্ম উরসুলার বহু পুরনো আশঙ্কাকে সত্যি করে। ঘটনাটি একই সঙ্গে ভয়াবহ, বিষণ্ণ এবং অদ্ভুতভাবে মজার—অর্থাৎ একেবারে মার্কেসীয়।

তারপর আসে মেলকিয়াদেসের পাণ্ডুলিপি। শেষ বুয়েন্দিয়া যখন তা পড়তে শুরু করে, তখন আবিষ্কার করে—তার পরিবারের জীবন আসলে লেখা হয়ে গিয়েছিল বহু আগেই। সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার, সে শুধু অতীত পড়ছে না; পড়তে পড়তেই সেই অতীতকে আবার ঘটতে দেখছে। পাঠ আর সময় এক হয়ে যায়। ইতিহাস যেন নিজেই নিজের কাহিনি পড়ে শোনায়।

তাই মাকোন্দোর শেষ কোনও আকস্মিক বিপর্যয় নয়। এটি বহু প্রজন্মের ভুল, অহংকার, যুদ্ধ, ভালোবাসার ব্যর্থতা, বিস্মৃতি এবং নিঃসঙ্গতার জমে ওঠা পরিণতি। যে পরিবার নিজের ইতিহাস মনে রাখতে পারেনি, তার পক্ষে ভবিষ্যৎ তৈরি করাও সম্ভব ছিল না।

অবশ্য নতুন দর্শকের জন্য সমস্যা থাকবেই। চরিত্ররা কখনও দ্রুত এসে মিলিয়ে যায়, একই নাম বারবার ফিরে আসে, আর বুয়েন্দিয়াদের পারিবারিক সম্পর্ক বুঝতে মাঝেমধ্যে বংশতালিকা খুলে বসতে ইচ্ছে করতে পারে। কিন্তু সেই গোলকধাঁধা একবার পেরোতে পারলে পুরস্কারটাও কম নয়।

ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড-এর শেষ পর্ব শেষ পর্যন্ত শুধু একটি পরিবারের পতনের গল্প হয়ে থাকে না। প্রেম, বিপ্লব, ঔপনিবেশিকতা, ক্ষমতা, স্মৃতি এবং নিঃসঙ্গতার মধ্য দিয়ে এটি হয়ে ওঠে এক সভ্যতার আয়না। মাকোন্দো মুছে যায়, বুয়েন্দিয়ারা শেষ হয়ে যায়—কিন্তু তাদের গল্প থেকে যায়।

আর হয়তো সেটাই মার্কেসের সবচেয়ে বড় জাদু: সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও গল্পটি শেষ হয় না।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles